বিদায় স্যার গ্যারি
আমাদের দু’জন পাঠক লিখিতভাবে, এবং কয়েকজন কথায় কথায় জানিয়েছেন যে সাহিত্যিকা যদিও মূলত সাহিত্য পত্রিকা, তাহলেও বাঙালিদের কিছু কিছু বিশেষ চাহিদা থাকে। যেমন ফুটবল, ক্রিকেট, গান, সিনেমা, সাহিত্য, যেগুলিতে আমাদের চিরকালের আবেগ। এবং এগুলো নিয়ে যদি একটি নিয়মিত বিভাগ চালু করা যায়।
আমরা পাঠকের চাহিদাকে সন্মান জানাই। পত্রিকা তো পাঠকদের জন্যই, তাঁদের ভালো লাগাতেই আমাদের প্রকাশনার সার্থকতা। কিন্তু অন্যদিকে দেখতে গেলে আমরা যে গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, ইত্যাদি লেখাগুলি পাই, সেগুলি প্রধানত অন্যান্য বিষয়ে। সুতরাং পাঠকের চাহিদা মেনে নিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, গান, সিনেমা, সাহিত্য, ইত্যাদি বিষয়ে প্রাক্তনীদের লেখা যদি না পাই, তহলে অন্য কোনো উৎস (source) থেকে লেখা নিয়ে আমরা এখানে নিয়মিত প্রকাশ করবো এবং অবিকৃতভাবে, সুচিপত্রে সেটিই হবে একমাত্র ব্যাতিক্রমী প্রকাশ, যা আমাদের প্রাক্তনীদের কলম থেকে নয়।
আমাদের প্রথম নিবেদন, সদ্য প্রয়াত স্যার গ্যারি সোবার্সের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।
********

বিদায় স্যার গ্যারি!
১৯৬৬ সাল। বয়সটা তখন ৩০। কিন্তু ওই বয়সেই মানুষটা ক্রিকেট দুনিয়ার এমন এক এভারেস্টে চড়ে বসেছিলেন, যেখানে তাঁর পাশে কেবল স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের নামটাই উচ্চারণ করা যেত। জনপ্রিয়তা আর কীর্তির দাঁড়িপাল্লায় সোবার্স আসলে ব্র্যাডম্যানকেও টপকে গেছেন! ব্র্যাডম্যান যদি হন ব্যাটিংয়ের শেষ কথা, সোবার্স তবে গোটা ক্রিকেট সাম্রাজ্যেরই একচ্ছত্র অধিপতি।
ব্যাট হাতে তিনি যখন ক্রিজে দাঁড়াতেন, ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ রূপ নিত এক জীবন্ত কবিতায়। আর বল হাতে? তিনি ছিলেন বাইশ গজের এক রূপান্তরকামী জাদুকর! নতুন চকচকে চামড়ার বলে তিনি যেমন ব্যাটসম্যানের বুকে কাঁপন ধরানো সুইং বোলার, বলটা একটু পুরোনো হতেই আঙুলের কারসাজিতে তিনিই আবার মায়াজাল বোনা চতুর স্পিনার। স্লিপ বেষ্টনীতে ফিল্ডিং করার সময় মনে হতো ওটা কোনো মানুষ নয়, একটা ক্ষিপ্র বাজপাখি ওত পেতে আছে—চোখের পলক ফেলার আগেই বিদ্যুতের গতিতে বল বন্দি হতো তাঁর তালুর স্তব্ধতায়। আর অধিনায়ক হিসেবে তাঁর মগজটা ছিল দাবার গ্র্যান্ডমাস্টারদের মতো ক্ষুরধার।
পরিসংখ্যান? সে তো কেবল খাতার পাতায় কিছু শুষ্ক সংখ্যার ভিড়, কিন্তু সোবার্সের বেলায় ওই সংখ্যাগুলোই যেন একেকটা মহাকাব্য! হাজার হাজার টেস্ট রান, শত শত উইকেটের পাহাড় আর ঝুলিতে একগাদা ম্যাচ জেতানো রূপকথা। এক মরসুমে ১,০০০ রান আর ৫০ উইকেটের অলৌকিক ডাবল—সেটা কি স্রেফ ফ্লুক ছিল? পরের মরসুমেই পরম অবহেলায় সেই একই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করে বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। একই টেস্টে সেঞ্চুরি আর ৫ উইকেট শিকারের সেই অতিমানবীয় কীর্তিও তাঁর বাঁহাতের খেল!
কিন্তু সংখ্যা দিয়ে কি আর এই রাজপুত্রকে মাপা যায়? ১৯৬৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ইংল্যান্ড সফরটার কথাই ধরুন না, ওটা কি কোনো ক্রিকেট সিরিজ ছিল? না, ওটা ছিল স্যার গারফিল্ড সোবার্সের একক এক মহাকাব্য! ৫ টেস্টে ৭২২ রান, ব্যাটিং গড় ১০৩.১৪! সঙ্গে ২০টি উইকেট আর ১০টি অবিশ্বাস্য ক্যাচ। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং—মাঠের যেখানেই চোখ যায়, শুধুই সোবার্স আর সোবার্স!
লর্ডসের সেই হার-না-মানা ১৬৩* রানের ইনিংসটার কথা মনে হলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন পরাজয়ের খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে, ম্যাচ বাঁচানোর কোনো আশাই নেই। কিন্তু সোবার্স যে অন্য ধাতুতে গড়া! বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন ধ্বংসস্তূপের মাঝে। চারপাশের তীব্র চাপকে স্রেফ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন, প্রতিপক্ষের বোলারদের ক্লান্ত-বিধ্বস্ত করে ছাড়লেন আর দিনশেষে ম্যাচের গল্পটাই পুরো বদলে দিলেন।
খোদ ব্র্যাডম্যান একবার স্বীকার করেছিলেন, সোবার্সের মতো এত প্রচণ্ড গতি আর শক্তিতে বলকে সীমানাছাড়া করতে খুব কম ব্যাটসম্যানকেই দেখেছেন তিনি। অথচ সেই ব্যাটিংয়ে কোনো পাশবিক জোর ছিল না, ছিল নিখাদ নান্দনিকতার প্রদর্শনী। একটা কভার ড্রাইভ যখন খেলতেন, মনে হতো কত অলস, কত আলতো সেই শট! কিন্তু ক্যামেরার লেন্স ঘোরার আগেই দেখা যেত বল বাউন্ডারির দেয়ালে আছড়ে পড়ছে, আর ফিল্ডাররা ব্যথায় হাত ডলছেন। তিনি আসলে খেলতেন না, ২২ গজের সবুজ ক্যানভাসে দিতেন তুলির আঁচড়।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্বাডোসের হয়ে প্রথম বড় ম্যাচ খেলতে নামা। ১৭ বছরেই গায়ে জড়ালেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ক্যাপ। শুরুতে দুনিয়া তাঁকে চিনেছিল স্রেফ এক বাঁহাতি বোলার হিসেবে। কিন্তু বিধাতার মনে তো অন্য পরিকল্পনা ছিল! ধীরে ধীরে বিশ্ব আবিষ্কার করল এক খুনে ব্যাটসম্যানকে। এরপর একে একে যুক্ত হলো পেস, স্পিন, অতিমানবিক ফিল্ডিং আর অনন্য নেতৃত্ব। এভাবেই ক্রিকেটের ইতিহাসে জন্ম নিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত, সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডার।
কাল গড়িয়েছে, সময় বদলেছে। ক্রিকেটের আঙিনায় অনেক চকমকে নক্ষত্র এসেছেন, আবার চলেও গেছেন। কিন্তু স্যার গারফিল্ড সোবার্সের মতো এমন বহুমাত্রিক, অলৌকিক প্রতিভা আর দ্বিতীয়টি আসেনি। তিনি শুধু ম্যাচ জেতাননি, ক্রিকেট খেলাটা যে কতটা সুন্দর হতে পারে, তা প্রতি মুহূর্তে চোখ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রকৃত প্রতিভা কখনো জোর করে বা কসরত করে জাহির করতে হয় না। আপন সহজাত ছন্দেই বিশ্বকে করে মোহিত।
তিনিই কি সর্বকালের সেরা? এই তর্কের অবসান হয়তো কোনোদিনও হবে না। কিন্তু একটা ধ্রুব সত্য অস্বীকার করার ক্ষমতা খোদ মহাকালেরও নেই—
সোবার্স ক্রিকেটের। বোলিংয়ের। ব্যাটিংয়ের। গণমানুষের।
বিদায় স্যার গ্যারি!

সংগৃহীত ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
ফেসবুক: Sabit Haque
Disclaimer:
লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত, এবং সাহিত্যিকা পত্রিকা এর তথ্য যাচাই করেনি। লেখার বক্তব্য সম্পূর্নভাবে লেখকের।
*********






Add comment