ডাউনিংয়ের ভূত
© দীপক চক্রবর্তী, ১৯৭৬ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
সালটা ১৯৭৪ কি ৭৫ হবে, ঠিক মনে নেই। বিক্কলেজে সেদিন উৎসব, “আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে”। আজ কলেজের হস্টেলে সব নতুন আনকোরা ভূতেদের আগমন হবে। পুরানো ভূতেদের মধ্যে তাই সাজোসাজো রব। সবার মধ্যে বলাটা ভুল হবে, কারণ যারা ভৌতিক জীবন শেষ হয়ে পুনরায় মনুষ্যজন্মে প্রবেশ করবে, তারা খুব একটা এইসব ছোটখাট ব্যাপারে মাথা ঘামাত না। কোনরকম গণ্ডগোল হলে পরেই তাদের দেখা পাওয়া যেত, এই ঘল্পে (৮৫% ঘটনা + আমাদের বিক্কলেজের মিশেল বা গল্প = ঘল্প) আমি তাদের বিষাদী ভূত বলব। আর তাদের পরেই যারা আধিভৌতিক স্তরে রয়েছে, তারা ব্যস্ত থাকত কোনরকম বেহিসেবী ব্যাপার যাতে না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে। উৎসাহটা সেইসব ভুতেদেরই বেশী থাকত, যারা সেইবছর “নবীন” তক্মাটা মুছে ফেলতে যাচ্ছে, তাদের।
অভ্যার্থনা সমিতি তৈরী, কে কোন হোস্টেলে যাবে এবং কোথায় কতক্ষণ থাকবে সব ডিটেলসে পরিকল্পনা হয়েছে। কলেজের আবাসিক যেইসব নব্য ভূতেদের আজ প্রাক্তন ভূত হিসাবে নতুন পরিচয় লাভের কথা তাই তারাই বেশী উৎসাহী। এই সময়টাকে বলা হয় “র্যাগিং পিরিয়ড”। ব্যক্তিগতভাবে আমি এইটির প্রয়োজনীয়তা আছে বলেই মনে করি। এখন কি ধরণের “র্যাগিং” হয় তা আমি জানিনা, কিন্তু আমাদের সময় অর্থাৎ আমাদের থাকাকালীন ১৯৭১ থেকে ১৯৭৬, আমরা মজাই পেতাম আর আমাদের যারা র্যাগ করতে আসত, পরবর্ত্তীকালে তাঁদের অনেকেই আমাদের পরম উপকারী দাদা এবং হিতৈষী বলেই আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের কলেজের “দাদা-ভাই” ব্যাপারটাকে এই সময়টাই বাঁচিয়ে রেখেছিল। আমি আরও মনে করি, যে শিক্ষিত ছেলেরা মারধোরের খুব একটা পক্ষপাতী হয়না এবং সেই কারণেই আমাদের কলেজে র্যাগিংটা খুবই বুদ্ধিদীপ্ত এবং মজার হত, যার উল্লেখ আমি এখানে আর করব না, কারণ সেটা মা’র কাছে মাসির গল্প হয়ে যাবে।
যাই হোক, যেই ঘল্পটা বলতে যাচ্ছি তার থেকে একটু সরে গেছিলাম। তা সেই র্যাগিং-এর সূত্র ধরেই আমার এই ঘল্প।
সেইসময়ের একটি ঘটনা’র কথা বলছি। ডাউনিং-এ সদ্য মনুষ্য সমাজ থেকে আসা একজন বলেই ফেলল যে তার ভূতে ভীষণ ভয়। ব্যাস! তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেল যে তাকে ডাউনিং সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। সাহেব নিজের বাড়ীর বাইরে বিশেষ বেরোন-টেরোন না, তবে ধারণা এই যে সেই মুহুর্তে ওনাকে ছাদেই পাওয়া যেতে পারে। নব্য-সদ্যপ্রাক্তন ভূতেরা মহা উৎসাহে ও মহাসমারোহে ছেলেটিকে ছাদে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। ছেলেটি অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে দারুণ ভয় পেয়ে এই কলেজে সে আর পড়বে না বলে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। সে কিছুতেই ছাদে উঠবে না, এবং সকলের হাত ছাড়িয়ে তক্ষুণি সে বাড়ীতে তার মা’র কাছে ফিরে যাবে বলে প্রচণ্ড কান্নাকাটি করতে করতে হস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট কামদাবাবুর ঘরের দিকে দৌড় দিলো (আজকের দিন হলে কি হত বলা যায় না)। তার ঘরের অন্য বাসিন্দারাও খুবই ভীত হয়ে কি করবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন নব্য-প্রাক্তন ভূত তাকে প্রায় চ্যাংদোলা করে ছাদের সিঁড়ির দিকে রওয়ানা হয়ে পড়লো। তার হাত-পা ছোঁড়ায় কয়েকজন অল্পবিস্তর আঘাতপ্রাপ্ত হলেও তারা সেটাকে গ্রাহ্যের মধ্যে আনল না। কোনরকমে ছাদের দরজার কাছে পৌঁছেই তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ছাদে ঠেলে দিয়েই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো এবং বলা হলো এক ঘণ্টা পরে দরজা খোলা হবে। ছেলেটির প্রবল কান্নাকাটি সত্ত্বেও তাকে ছাদেই রেখে চলে আসা হলো।
ভূতের উপদ্রবটা হল তার পরে। ঘণ্টা দেড়েক পরে যখন সবাই যখন তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ছাদে গেল, তখন ছড়িয়ে পরে থাকা একজোড়া চটি আর একটা হাতকাটা গেঞ্জী ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেলনা। কলেজের বাসিন্দা নব্য-সদ্যপ্রাক্তন ভূতেরা এবার নিজেদের মধ্যেই আলোচনা শুরু করে দিল শেষ কখন তার আর্তনাদ শোনা গেছে। তারপর যা হয়ে থাকে, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া এবং শেষ পর্য্যন্ত ফার্স্ট গেটে অধিষ্ঠাণকারী বিষাদী ভূতেদের, যারা সেই বছর পুনরায় মনুষ্য সমাজে প্রবেশ করিবেন বলে বিষাদগ্রস্ত, তাদের কাছে যাওয়া হল।
বিষাদী ভুতেরা তখনও অবধি আকাশমার্গ ও জলমার্গ থেকে স্থলে আসেননি, তাঁরা প্রথমে ব্যাপারটার কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু যখন বুঝল, তখন শুরু হল তাদের প্রশ্নবাণ। কি হয়েছিল? সব শুনে তারাও প্রায় দিশাহারা এবং যথোচিত বাক্যপ্রয়োগ দ্বারা তিরস্কার করে নানারকম নির্দেশ দিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করতে বললেন। তাদের মধ্যে একজন প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে একটি ছেলেকে খালি পায়ে অনুকুলদার দোকান থেকে বড়কার দোকান ছুঁয়ে মাঝে মাঝে তাদের কাছে এসেও দাড়াতে দেখে থাকলেও তা নিয়ে বিশেষ কিছু না ভাবলেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কি মনে করে ছেলেটিকে নিজস্ব ভঙ্গীতে হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলের দ্বারা ঈশারায় ডাকলেন।
ছেলেটি এলে পরে নানা প্রশ্ন করে জানা গেল সে সেইদিনই বিক্কলেজে এসেছে এবং ডাউনিং হলের পশ্চিমদিকের দোতলায় তার বাসস্থান। খলি পায়ে গেটে আসার কারণ হিসাবে তার কাছ থেকে যা জানা গেল তা হল – ‘তাকে দাদারা ভূতের ভয় দেখিয়ে ছাদে নিয়ে গেলে, সেও সিদ্ধান্ত নেয় যে দাদাদের সাথে মেশার এই সুযোগ সে ফস্কাতে দেবেনা এবং সে যে আরও বড় ভূত তা প্রমাণ করে দেবে। সেইমতন সে ছাদে উঠে কিছুক্ষণ চেঁচামাচি করে চটি দুটো দুদিকে ছড়িয়ে, গেঞ্জীটাকে খুলে পাইপ বেয়ে নেমে সেকেণ্ড গেটে এসে লিপিতে যায়। কিন্তু শো শুরু হয়ে যাওয়ায় হেঁটে হেঁটে ফার্স্ট গেটে চলে আসে। খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস নেই বলে আর কোথাও যায়নি। অনুকুলদার দোকানে বসে দু প্লেট আলুর দম আর চা খেয়ে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বড়কা’র দোকান থেকে সিগারেট খেয়ে গেটের দিকে লক্ষ্য রাখছিল তাকে কেউ খুঁজতে আসে কিনা।‘

*******






“ডাউনিংয়ের ভূত ” পড়ে ভাল লাগল। ওই হস্টেল থাকার সুবাদে, ভালো ভাবে connect করতে পারলাম। যেমন মজা আছে তেমনই raging র কুফলের দিকটা তুলে ধরা হয়েছে।
আরো নতুন নতুন লেখা দেখতে চাই। 🙂
বাহ!! ভুতের গল্প, ভাল লাগল!!
The ambience of Downing Hall had a sitable environment for presence of ghost.I was in Downing during 1961-1962. Kamadababu was our superintendant. My pronam to this great teacher Kamadababu.