পুস্তক পরিচয় – দুরন্ত ঘুর্ণি
© তাপস মৌলিক, ১৯৮৯ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

সলিল চৌধুরী… কীভাবে গড়ে উঠলেন এই কিংবদন্তি সংগীতস্রষ্টা? তাঁর শৈশব, কৈশোর আর তরুণ বয়সের দিনগুলি… জীবনের প্রথম কুড়ি বছর… এ বইয়ে গল্পের মতো করে বলা হয়েছে সেই দিনগুলির কথা। তরুণ প্রজন্মের কথা ভেবে লেখা হলেও ভালো লাগবে সব বয়সি পাঠক এবং সলিল-অনুরাগীদের।
বইটির মূল লেখা ‘দুরন্ত ঘূর্ণি’-তে সলিল চৌধুরীর ছেলেবেলা থেকে তরুণ বয়সে তাঁর গণসংগীত রচনার সূচনা অবধি জীবনের প্রথম কুড়ি বছরের কথা রয়েছে। অন্য একটি লেখা ‘সলিল-সংগীত: কান তৈরির গান’ – সলিলের গান নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ। এছাড়া এতে রয়েছে সলিল-কন্যা শ্রীমতী অন্তরা চৌধুরীর লেখা প্রস্তাবনা। একটি দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন সলিল চৌধুরীর অন্যতম সহকারী, ভারতীয় গণনাট্য সংঘের বিশিষ্ট সংগীতকার ও শিল্পী শ্রী কঙ্কণ ভট্টাচার্য। রয়েছে কয়েকটি অতি দুর্লভ ফটোগ্রাফ।
জয়ঢাক প্রকাশন
হার্ড বাউন্ড, ১২৮ পাতা, দাম: ২৫০ টাকা
জয়ঢাক প্রকাশনের ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে অর্ডার করার লিংক:
https://joydhakbooks.in/product/durantaghurni/
eBook হিসেবে রয়েছে Google Books-এ, ডাউনলোড করা যাবে নীচের লিংক থেকে:
https://play.google.com/store/books/details?id=eNKqEQAAQBAJ
তাপস মৌলিক-এর ‘দুরন্ত ঘূর্ণি’ – দু’চার কথা
শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়
আশির দশকের দ্বিতীয় অর্ধে আমরা তখন কলেজের ফার্স্ট ইয়ার, আমাদের স্কুলের এক সহপাঠী খড়গপুর আইআইটিতে পড়ে। তো মাস ছয়েক বাদে ছুটিতে সে বাড়ি এলে তার মুখে এক আশ্চর্য গল্প শুনেছিলাম। সেসময় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অল্পবিস্তর র্যাগিং চলত, কিন্তু আমার বন্ধুটিকে তার সম্মুখীন হতেই হয়নি, কেন-না সিনিয়ররা আবিষ্কার করে ফেলেছিল গোড়াতেই, যে সে চমৎকার গান গায় এবং বিশেষ করে সলিল চৌধুরীর গান। ফলে তাকে মাঝে মাঝেই পাকড়াও করা হত এবং অবিশ্রান্ত সলিল সংগীত গাইতে হত তাকে। সিনিয়ররা কড়া নজরে রাখত সে যেন আইসক্রিম খেয়ে হঠাৎ গলায় ঠান্ডা না লাগিয়ে ফেলে।
তাপসের ‘দুরন্ত ঘূর্ণি’ হাতে পেয়ে চল্লিশ বছর আগেকার সেই কথাটা আমার মনে পড়ে গেল। কী আছে এই বইতে! এককথায় আপাদমস্তক সলিল সংগীতে ডুবে ও মজে থাকা এক কিশোর মনের বয়ান রয়েছে। সলিলের জীবন, বেড়ে ওঠার দিনগুলি, গণনাট্য সংঘে যুক্ত থাকার সময়, প্রত্যক্ষ বামপন্থী আন্দোলনে জড়িয়ে থাকা এক শিল্পীর একের পর এক অনবদ্য সংগীতসৃষ্টির কাহিনি। টুকরো টুকরো গল্পে তাপস এমনভাবে সাজিয়ে তুলেছেন সলিলের জীবন ও গান যে একের থেকে অন্যকে আলাদা করে দেখা যায় না, আর যাবেই বা কেন! সলিল চৌধুরীর কোমল মরমী হৃদয়টাকে যেন এভাবেই আমরা ছুঁতে পারি অনায়াসেই।
রবীন্দ্রপ্রয়াণের দিনের কথা তাপস লিখছেন, “…একটা বাড়ির রকে বসে দেখতে দেখতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল সলিল, পরমাত্মীয় বিয়োগের বেদনায় কাউকে কিছু না জানিয়ে এক মাসের অশৌচ পালন করবে বলে মনে মনে ঠিক করল। …দিদিমা বা মামারা সলিলকে কেউ কিছু বলেননি, শুধু অবাক হয়ে বোঝার চেষ্টা করতেন কী এমন দুঃখের ঘটনা ঘটল তার জীবনে। তাঁদের বোঝাবার সাধ্য সলিলের ছিল না।”
কোদালিয়ার গ্রামের মেথরপল্লির মানুষদের সমাজের মানুষেরা অস্পৃশ্য মনে করত। সে প্রসঙ্গ টেনে তাপস লিখছেন, “…বহুদিন ধরে সমাজ তাদের অচ্ছুৎ করে রেখেছিল, তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়তে দেওয়া হত না। এলাকার ছাত্রদের নিয়ে দল তৈরি করে এই ছুঁৎমার্গের বিরুদ্ধে সলিল আন্দোলন গড়ে তুলল। …মেথরপল্লির বাসিন্দাদের সেই তেলুগু লোকসংগীতের সুর পরে সলিল নিজের গানে ব্যবহার করেছে। মেথরদের সন্তানরা পড়াশুনোর প্রথম স্বাদ পেল সলিলদের প্রচেষ্টায়।”
আমাদের সময়ের এক বিখ্যাত সংগীতশিল্পীর সলিল চৌধুরীর গানের ইন্টারল্যুড প্রিল্যুড সম্পর্কে বলা কথার প্রতিধ্বনি শুনি তাপসের কথায়, “…আর তারপর যন্ত্রানুসঙ্গ – গানের সঙ্গে এমনই সংপৃক্ত যে গাইতে গেলে মুখে বাজনাটাও গাইতে হচ্ছে, নইলে জমছে না।”
অতিকথন নয়, খুব অল্পকথায় সহমর্মী হয়ে গল্পগুলো শুনিয়েছেন তাপস আমাদের। কেমন করে? তার উত্তর পাওয়া যাবে “সলিল সংগীত – কান তৈরির গান” অংশে। একটি কিশোরমনে সলিল চৌধুরীর কথা ও সুর কতটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে, পাঠক হিসেবে তা সহজেই টের পেতে থাকি আমরা।
এ বইয়ের বহু তথ্যই হয়তো জানা, হয়তো অজানা, এমনকি গানের যে তালিকা করে দেওয়া রয়েছে ইন্টারনেটের দৌলতে তাও আমাদের হাতের মুঠোয়, সেকথা তাপস অস্বীকারও করেননি। তাও কেন এই বই? কেন-না নিজের আনমনা অবসরে, কিংবা এতোল বেতোল বেড়ানোর সময়ে ঠিক যেভাবে আমরা আমাদের প্রিয় হারমনিকা কিংবা ছোটো বাঁশিটি হাতে তুলে নাড়াচাড়া করি, কিংবা ঝোলায় সঙ্গী করে নিয়ে যাই, সুর তুলি খেয়ালে বেখেয়ালে, ঠিক তেমনিই মনের প্রিয় তালিকায় সংযুক্ত করি এই বইটিকে, হাতের কাছে রাখি কিংবা ঝোলায় পুরে রাখি, যাতে ছুঁয়ে থাকা যায়, মাঝে মাঝে পাতা উলটে স্পর্শ করে নেওয়া যায় একঝলক সলিল সংগীত।
********






Add comment