সাহিত্যিকা

লাদাখ – অন্য রকম সুন্দর (পর্ব ১)

লাদাখ – অন্য রকম সুন্দর (পর্ব ১)
© বন্দনা মিত্র, ১৯৮৬ মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

এবার লাদাখ ভ্রমণ। কলকাতা সমুদ্রতল থেকে হুস করে উড়ে আসা ১১,৫০০ ফিট ওপরে, লেহ এয়ারপোর্টে। মাঝখানে কয়েক ঘণ্টার দিল্লিতে অবস্থান। লেহ’তে নেমে চড়াই পথে ট্রলিগুলো টানতে টানতে হাঁফাতে হাঁফাতে আমাদের দলটা হাজির হল দুটো অপেক্ষমান টেম্পো ট্র্যাভেলারের কাছে। চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল রোদ ঝলমল নীল আকাশ, চারদিক ঘিরে সুউচ্চ পাথুরে কঠিন পাহাড়ের পাহারা, অবাধ দৃষ্টিকে গন্ডী টেনে আটকে দেয়। সবুজ শ্যামলের ছিটে ফোঁটা নেই। আমরা সমতলের লোক, সবুজ দেখে অভ্যস্ত চোখ আমাদের, এই রুক্ষতায় কেমন যেন বিব্রত হয় প্রথম দর্শনেই। এখনকার পর্যটন বিভাগের নিয়মে লেহ’তে অন্তত দুদিন কাটিয়ে তারপরই আরও উঁচুতে ওঠার অনুমতি পাওয়া যাবে।

আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল গারকোনে, আর্যদের গ্রাম। যাওয়ার পথে সারাপথ সঙ্গে চলল সিন্ধু নদ। যে জায়গায় লাদাখের আরেকটি প্রধান নদী জান্সকার এসে মিশেছে সিন্ধুর সঙ্গে, সেই সঙ্গম স্থলে নেমে ছবি তোলা হল। সদ্য বর্ষা শেষ হয়েছে তাই নদের স্রোত তীব্র, আর ভয়ংকর মূর্তি। সিন্ধু নদের উৎস, সবাই জানে, মানস সরোবরের কাছে। তিব্বত ও চীনের মধ্যে দিয়ে উত্তর পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে লাদাখে ঢুকেছে, তারপর আরো পশ্চিমে গিলগিট বালটিস্তান হয়ে পাকিস্তানে ঢুকে দক্ষিণ বাহিনী হয়ে সব শেষে আরব সাগরে গিয়ে পড়েছে। সিন্ধু নদ সম্বন্ধে ইস্কুলে ইতিহাস বইতে এত পড়তে হয়েছে, যে এই নদের সঙ্গে ছোটবেলার পরীক্ষা সংক্রান্ত অনেক সুখ দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো ও আশেপাশের অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সিন্ধু সভ্যতা, সিন্ধু থেকেই সম্ভবত হিন্দু নামের উৎপত্তি, হিন্দুস্তান ও এখানের অধিবাসীদের পরিচিতি “হিন্দু”। প্রাচীনকালে যখন পারসিকরা এই অঞ্চলে আসে, যেহেতু তাঁরা “স” উচ্চারণ করতে পারত না, “হ” বলত, তাদের মুখের ভাষায় সিন্ধু সম্পর্কিত সবই হিন্দুতে বদলে যায়। ভারতের খুব সামান্য অংশের ওপর দিয়ে বয়ে গেলেও সিন্ধু নদের ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক গুরুত্ব অপরিসীম।

আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে বেলা পড়ে গেল, তবে এদেশে সাড়ে সাতটা অবধি দিনের আলো, তাই তখনও অন্ধকার হয় নি। সিন্ধু ঘাটের কাছে আমাদের ক্যাম্প, তাঁবুর মধ্যে বাস‌, এই দুই রাত। অবশ্য সর্বসুবিধাযুক্ত তাঁবু, বেশ আরামদায়ক। অনেকটা জায়গা নিয়ে ছড়ানো আস্তানা, পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সিন্ধু নদ। তার গর্জনে কান যেন ফেটে যায়।

ক্যাম্পের ভেতর গাছ আলো করে থরে থরে অজস্র এ্যাপ্রিকট ফলে আছে। টপাটপ পেড়ে মুখে পুরে ফেলার মজাই আলাদা। কেউ কিছু বলার নেই। ওখানে স্টাফদের মধ্যে একজন ছিল ধূপগুড়ির ছেলে, বাঙালি দেখে আমাদের খুব যত্ন করল, বাঙলায় কথা বলতে পেরে যেন বেঁচে গেল বেচারি।

গারকোনের আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। রাতে খাওয়ার পর অন্ধকার মাঠে দাঁড়িয়ে নক্ষত্র চিনতে গেলাম। সত্যিই কালো নক্সি কাঁথায় কে যেন যত্নে ছুঁচ ফুটিয়ে সোনালী রূপালী ফুল তুলেছে। মাথার ওপর ঘন সাদা ফেনায় উত্তাল স্রোতে বয়ে যাচ্ছে আকাশগঙ্গা।

আর্যদের গ্রাম বলা হলেও আসলে গারকোনে ও আশেপাশের কয়েকটি গ্রাম নিয়ে এই অঞ্চল আর্য ভ্যালি বা আর্য উপত্যকার অংশ। এখানে বাস করে Brokpa উপজাতি, যারা নিজেদেরকে গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের সাক্ষাৎ বংশধর বলে দাবি করে। এবং দাবি করে যে তাঁরাই শুদ্ধতম আর্য রক্তের ধারক ও বাহক। উইকিপিডিয়া এক আশ্চর্য তথ্য জানালো – আগে অনেক বিদেশিনী এই আর্য উপত্যকায় আসতেন, এই ব্রোকপা উপজাতির সন্তান ধারণ করার জন্য – তাঁদের বিশ্বাস ছিল এই মিলনের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানটি হবে প্রকৃত আর্য। ২০১৫ সালে এই প্রথা সরকার থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।

ব্রোকপা’দের শারীরিক গঠন, নিজস্ব সাজ পোশাক, উৎসব, আচার সবই লাদাখের অন্য বাসিন্দাদের চেয়ে আলাদা। এরা প্রকৃতি পূজক, এদের উৎসব কৃষিভিত্তিক। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে এরা নিজেদের মধ্যেই বিয়ে করে। সবমিলিয়ে ব্রোকপারা কিছু কাহিনী, কিছু মিথ, কিছু রোম্যান্টিজিম মেশানো এক আশ্চর্য উপজাতি। এদের গ্রাম ঘুরে এদের গল্প সংগ্রহ করে বলবো, তবে পরের পর্বে।

*******

লাদাখ যাওয়ার আগে হঠাৎ খেয়াল হল যে লাদাখ সম্বন্ধে আমার জ্ঞান ও ধারণা একেবারেই শূণ্য। ইস্কুলে লাদাখ কথাটা শুনেছি বলেই মনে করতে পারলাম না। কাশ্মীর নিয়ে যদি বা কিছু তথ্য ছিল, লাদাখ কিন্তু একেবারেই অজানা। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার আগে জায়গাটা সম্পর্কে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করা আমার অভ্যেস, এতে ভ্রমণে সুবিধা হয়। আসলে আমার মনে হয় যে যেকোনো স্থানেরই এক নিজস্ব আত্মা থাকে, যা তৈরি হয় বহুকাল থেকে গড়ে ওঠা প্রকৃতি, জনপদ, রীতি নীতি, সংস্কৃতি সব মিলে মিশে। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার উদ্দেশ্য সেই আত্মার সঙ্গে পরিচয় করা। একটু পূর্ব আলাপচারিতা থাকলে অন্তরঙ্গ হওয়া সহজ হয়। ম্যাপে দেখলাম কাশ্মীরের উত্তর পূর্ব অংশ জুড়ে লাদাখ, সীমান্তের ওপারে চিন ও তিব্বত। নেট ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম লাদাখের আদি অধিবাসী অধুনা হিমাচল প্রদেশ থেকে আসা মোনস এবং গিলগিট অঞ্চলে থেকে আসা ব্রোকপা। সেই ব্রোকপা, যাদের কথা একটু আগেই লিখেছি।

প্রথম শতাব্দীতে লাদাখ কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন থেকেই কাশ্মীর হয়ে লাদাখে বৌদ্ধ ধর্মের সম্প্রসারণ শুরু হয়। প্রথম শাসক হিসেবে নাম পাওয়া যায় মোন সাম্রাজ্যের রাজা গিয়াপাচো। ‌এরপর তিব্বত থেকে মোঙ্গলরা এসে লাদাখে বসবাস করতে শুরু করে। সপ্তম শতাব্দীতে দুই শক্তিশালী পক্ষ, তিব্বত ও চিনের দীর্ঘ দ্বন্দ শুরু হয় ঐ অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য। সম্ভবত লাদাখের শাসকেরা তখন তিব্বতের পক্ষ নেয়। চিনকে পিছু হটতে হয়। দশম‌‌ শতাব্দীতে তিব্বতের এক রাজ্যচ্যুত রাজকুমার পশ্চিম তিব্বতে পালিয়ে এসে নিজের চেষ্টায় আশেপাশের অঞ্চলে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। লাদাখে লা চেন সাম্রাজ্য পত্তন হয়। তিব্বতের ধর্ম সংস্কৃতি রীতি নীতি জাঁকিয়ে বসে। বৌদ্ধ ধর্ম এই সময় ভারত থেকে কাশ্মীর ও লাদাখ হয়ে তিব্বতে দ্বিতীয়বার বিস্তারিত হয়।

একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও লিখি, আমাদের অতীশ দীপঙ্কর, তাঁর জন্ম দশম শতকে (৯৮২-১০৫৪ খৃঃ) এবং যিনি তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও সংস্কারের জন্য স্মরণীয় , তিনি নিশ্চয়ই এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ বিষয়ে অবশ্যই অনেক পড়াশোনার প্রয়োজন আছে, আমার এই লেখা কোনভাবেই ইতিহাস নয়, লাদাখকে একটু নাড়াচাড়া করার ফসলমাত্র। যাইহোক এরপর তিব্বতে প্রচলিত বৌদ্ধ ধর্ম লাদাখের প্রধান ধর্ম হয়ে ওঠে।‌

চতুর্দশ শতাব্দীতে লাদাখে ইসলাম ধর্মের প্রসার শুরু হয়। দেখতে পাই, পার্শ্ববর্তী মুসলিম রাজ্য থেকে মুসলিম শাসকদের বার বার আক্রমণ, লাদাখের রাজবংশে মুসলিম রাজকন্যার বিবাহ, সুফী কবিদের লাদাখে আনাগোনা – যদিও এও দেখছি যে মুঘল আমলে ষোড়শ শতাব্দীতে লাদাখ তার স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল। তবে ষোড়শ শতাব্দী থেকেই ইসলাম ধর্মের প্রভাব লাদাখে বাড়তে থাকে এবং লাদাখের দ্বিতীয় প্রধান ধর্ম হয়ে ওঠে ইসলাম।

১৮৩৪ সালে শিখ জরোয়ার সিং, জম্মুর রাজা গুলাব সিংহের সেনাপতি লাদাখ আক্রমণ করে জম্মুর শিখ সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে। পরে ব্রিটিশরা এসে শিখদের পরাজিত করলে লাদাখ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর লাদাখ কিভাবে ভারতের অংশ হয়ে ওঠে তা, আমার মত যাঁরা ছোটবেলায় যাযাবরের লেখা “ঝিলম নদীর তীরে” নামের অপূর্ব বইটি পড়েছেন তাঁরা সবাই জানেন।

আমরা ঘুরে ফিরে দেখলাম আর্য উপত্যকার দু চারটে গ্রাম, আলাপ করলাম সেখানের বাসিন্দাদের সঙ্গে। লাদাখে বাড়ি তৈরির মূল উপাদান কাঠ, যদিও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইঁট লোহা সিমেন্টের ব্যবহার হচ্ছে, কিন্তু কাঠের মোটা বিম পুরোন বাড়িতে এখনও নজরে পড়ে। বাড়ির ছাদ কিন্তু সমতল, সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চলে বরফ পিছলে পড়ার জন্য যেমন শম্বুকাকৃতি ছাদ হয়, এখানে তেমন নয়। গ্রামগুলির আধুনিকীকরণ হলেও কিছু কিছু প্রাচীন তার ছাপ এখনও দেখা যায়। ছিল আদিবাসীদের নিজস্ব পোশাকে নিজস্ব পরম্পরায় নাচ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুমতি নিয়ে (এটা খুব জরুরী) ছবি তুললাম কিছু।

গেলাম ভারত পাকিস্তান প্রান্তে, জওয়ানদের সঙ্গে আলাপ হল।‌ শীত পড়লে তারা যে বাঙ্কার গুলোতে আটক থাকে বরফ বন্দী, সেই খোপ খোপ বাঙ্কার গুলো দেখালো তারা। জনমানব থাকে না সে সময়। বয়স বেশি নয়, বাচ্চা ছেলেগুলো। আমাদের সুরক্ষার দায়িত্ব এদের হাতে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকি।

সিন্ধু নদের ধারে পাথরের ওপর বসে দুপুরের খাওয়া। তীব্র স্রোত পাথরে আছড়ে পড়ে জলের কণায় ভরে যাচ্ছে চারদিক, জলের আদরে ভিজে যাচ্ছি আমরা। নদের বরফ ঠান্ডা জলে নিজের জলের বোতল ভরে নিলাম। আমার শরীরে মিশে গেল সিন্ধু নদের স্রোত, সারা জীবন সঙ্গে রয়ে যাবে অল্প একটু সিন্ধু নদ, অল্প একটু লাদাখ।
সব মিলিয়ে দ্বিতীয় দিনেই লাদাখের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

(ক্রমশঃ)

*********

Sahityika Admin

Add comment