কেরিয়ার
© গণেশ ঢোল, ১৯৮৭ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
কনুইতে ব্যান্ড-এড লাগিয়েছিস কেন?
– কেটে গেছে।
– কাটল কী করে?
– হস্টেলে একজনকে তাড়া করতে গিয়ে, পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম।
– তাড়া করছিলি কেন?
– আমার বালিশের তলা থেকে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে পালাচ্ছিল বলে।
– এখনও এসব করে যাচ্ছিস; পরীক্ষার আর ক’টা দিন বাকি?
– পরীক্ষার সঙ্গে সিগারেট প্যাকেট কি ইনভার্সলি প্রোপোর্সোনেট?
– থিওরি অফ মেশিনের প্রিপারেশন কেমন হয়েছে?
– ফেল করব ওটাতে।
– আর মেশিন ডিজাইন?
– ডাহা ফেল।
– বলতে একটুও লজ্জা করছে না?
– আমার মতন খারাপ ছাত্র কিছু না থাকলে বি ই কলেজ যে লাটে উঠবে। বছর বছর একজামিনেশন ফিজ দিয়ে টিকিয়ে রেখেছি তো আমরাই।
– ক’ঘন্টা পড়ছিস দিনে?
– সারা রাত। সকালে প্রথম ফিফটি ফাইভ বাসটাকে রওনা করে দিয়ে তবেই ঘুমাতে যাই।।
– সারা রাত পড়ছিস?
– সারা রাত জাগছি অন্তত।
– কী করিস, সারা রাত জেগে?
– ঘুমিয়ে পড়লে কলেজ ক্যাম্পাসটাকে জীবনানন্দের ‘শ্রাবস্তী, বিদিশার’ মতো লাগে। ল্যাম্পপোস্টগুলো হাই তোলে, কুকুরগুলো হঠাৎ হঠাৎ ডেকে ওঠে। আমার পড়ার টেবিলের সামনে যে জানলাটা, ওটার ঠিক উল্টোদিকেই স্টাফ কোয়ার্টার। আমাদের হস্টেল সুপারের বাড়ি। গতকাল দেখলাম উনিও রাত জাগছেন। স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ড্রয়িং রুমে পায়চারি করছেন। আমি টর্চ জ্বেলে ওঁনাকে সিগন্যাল দিলাম। কে জানে বুঝতে পারলেন কি না। ওঁনার স্ত্রী মারা গেছেন অল্প বয়সে। ছোট ছোট দু’টি বাচ্চা, একটা ক্লাস ফাইভ, আরেকটা থ্রী। আমি ওদের পড়াই। সন্ধেবেলায় যখন যাই তখন কেউ থাকে না। রান্নার মাসী রান্না করে, বাচ্চাদু’টো কেমন মনখারাপ ক’রে বসে থাকে। আমি গেলে ওদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
– তোর মতো অপোগণ্ডকে স্যার প্রাইভেট টিউটর রেখেছেন?
– আমার সম্বন্ধে তোর যত ভুল ধারণা আছে তার মধ্যে এটা একটা। জহুরী জহর চেনে। স্যার নিজেই আমাকে বলেছিলেন। পড়ানোর থেকে গল্পই বেশি হয়। মানে বেবিসিটিংও করে দিই। সন্ধের আড্ডা বন্ধ হয়ে গেছে বলে রাত জেগে ওটাকে পুষিয়ে দিই।
– অন্যরাও রাত জাগে তোর সঙ্গে? বারোটা-একটা পর্যন্ত জাগে, তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। আমি তখন রাত্রির সৌন্দর্য দেখি, গোলপোস্টের সঙ্গে গল্প করি। ভোরবেলা অভিযাত্রী সঙ্ঘের ছেলেরা প্র্যাকটিস করতে এলে, ওদের হাতে মাঠটাকে সঁপে দিয়ে তবে শুতে যাই।
– সারা রাত এভাবে সময় নষ্ট করিস?
– নষ্ট কেন হবে, প্রপার ইউটিলাইজেশন অফ টাইম। এ ছাড়াও পরীক্ষায় পাস করার জন্য কত কসরত করি। কাল রাতেই খাতা ভর্তি করে তাঁদের নাম লিখেছি, প্রতি পাতায় একশো আট বার।
– কেন?
– কারণ তাঁদের মতন ভাল ছাত্রীর নাম জপ করে যদি কোনোমতে উতরে যাই।
– তাই?
– না, এছাড়াও আছে। তাঁদের নামটা লিখলে বেশ লাগে দেখতে — ‘সমর্পিতা সমদর্শিনী
একটা টিপ, দু’টো বিনুনি।’
তোর নামটা এরকম অদ্ভুত কেন? সমদর্শিনী কোনো টাইটেল হয়? কেমন সব উড়িয়া, উড়িয়া।
– আমি তো উড়িয়াই। কেন উড়িয়াতে তোর অ্যালার্জি আছে?
– ঢপ দিস না তো। আমি তোর ফর্ম ফীল আপ করেছি। সেখানে লিখেছি মাতৃভাষা, বাংলা।
– মাধ্যমিকের সময় আমি ইচ্ছে করে টাইটেল বাদ দিয়ে ওই ‘সমদর্শিনী’-টা বসিয়ে দিয়েছি নামের পরে।
– কেন?
– আমার ইচ্ছে।
– পরীক্ষার পরে কী করবি?
– ইচ্ছে আছে দিল্লি আইআইটিতে পড়ার। তুই কিছু ভেবেছিস?
– ভাবার কিছু নেই। পরের বার পরীক্ষা দেবার জন্য আবার তৈরি হব। তুই সত্যি দিল্লি চলে যাবি?
– যদি সুযোগ পাই, যাব।
– পারবিই না যেতে। তোর মা কিছুতেই তোর মতন একটা কেবলি মেয়েকে দিল্লিতে একা ছেড়ে দেবে না।
– আমি তোর মতো বারফট্টাই দেখাই না। তোর থেকে অনেক বেশি স্মার্ট আমি। আর দিল্লিতে একা থাকব কেন? মাসির বাড়ি আছে।
– কেন, মাসি দিল্লিতে থাকে কেন? আর জায়গা পেল না থাকার!
– মাসির দিল্লিতে থাকার কারণটা খুব সহজ। মেসোমশাই থাকেন ওইখানে তাই। কিন্তু তোর এত রাগ কেন দিল্লির উপরে?
– তুই দিল্লিতে যেতে চাইছিস কেন?
-পড়াশুনা করবার জন্য।
– পড়াশুনা করার জন্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ছেড়ে চলে যেতে হবে?
– হ্যাঁ যাব।
– তুই জানিস, তুই চলে গেলে কলেজের ক্লক টাওয়ারটা বন্ধ হয়ে যাবে, পান্ডিয়া হলের সামনের সেমেট্রিতে সাহেব ভূতগুলো কবর থেকে জেগে উঠবে, নেতাজী ভবনের ফোনদাদু টেলিফোন বুথ বন্ধ করে দেবে, হরেনদা ক্যান্টিনে আর ফোকটের চা খাওয়াবে না।
– আর তুই কী করবি?
– তার সঙ্গে আমার কী? আমি কিছুই করব না। করব নাই বা কেন? সুপারের ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলব, রোজ বিকেলে শ্রাবণীতে নিজাম চপ আর কফি খাব, সারা রাত্তির নেতাজী ভবনের গ্যালারিতে বসে আকাশের তারা গুনব। আমার যা খুশি করব, তোর তাতে কী? তোর মতো কেরিয়ারের পেছনে ছুটব না।
– তুই বাচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলবি, সারা রাত তারা গুনবি, বছর বছর পরীক্ষা দিবি, যা ইচ্ছে তাই করবি। আর আমি যদি পড়াশোনা ক’রে চাকরি না করি, রোজ বিকেলে শ্রাবণীর নিজাম চপ আর কফির পয়সা তোকে যোগাবে কে?

******






Add comment