সাহিত্যিকা

আমাদের প্রাক্তনীদের লেখা বই

আমাদের প্রাক্তনীদের লেখা বই
শিকড়ের খোঁজে বাংলাদেশে
লেখক: প্রদীপ ভৌমিক, ১৯৭৪ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
ম্যাপেল পাতার দেশে
লেখক: দীপঙ্কর রায়, ১৯৮০ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

পুস্তক আলোচনা
শিকড়ের খোঁজে বাংলাদেশে
প্রদীপ ভৌমিক, ১৯৭৪ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

ভূমিকা
আমার যখন বছর সাতেক বয়স, ‘৫০ দশকের শেষ দিকে বাবা আমায় নিয়ে গেলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্থানে (অধুনা বাংলাদেশ), উনাদের পৈতৃক বাড়িতে। সেই সাত বছর বয়সের সময়ে দেখা পূর্ববঙ্গের গ্রামের প্রকৃতি, সবুজ মাঠ, খালবিল, নদী দেখে চমৎকৃত হয়েছিলাম। এছাড়াও ঠাকুর্দা – ঠাকুমা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের ভালবাসা আমার শৈশব মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। মা-বাবার কথাবার্তার সঙ্গে ওখানকার মানুষের কথাবার্তার মিল থাকায় আমার আকর্ষন আরো বৃদ্ধি পায়। দেশভাগের কারণে মা-বাবার কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমি বড় হয়েছি। স্কুল কলেজের পড়াশোনা শেষ করে যখন চাকরী জীবনে ঢুকছি, ততদিনে মা-বাবা সংসারে একটু থিতু হয়ে বসতে পেরেছেন। মুম্বাইয়ে সারাজীবন চাকরী করেছি।

মাঝে মাঝেই মা-বাবার গল্পের কথা মনে হতো। গল্পের মধ্যে ছিল ফেলে আসা দেশবাড়ির স্বপ্নে জড়ানো কথা। গল্প শুনতাম প্রায় একশো বছর আগে গ্রামে পিতামহের হাইস্কুল করে দেওয়া। চারিপাশের অনেকগুলো গ্রামের মধ্যে সেই প্রথম হাইস্কুল।

গল্প শুনতে শুনতে মনে এক কল্পনা তৈরি হলো। প্রায়ই মনে হতো বাবার পৈতৃক বাড়ি আবার দেখে আসতে হবে। ইতিমধ্যে বাবা মারা গেছেন। চাকরী জীবনের শেষের দিকে একটা সুযোগ এসে গেল। আমার স্ত্রীর বড়দার ছেলে ঢাকায় চাকরী সুত্রে কোম্পানী থেকে বড় ফ্ল্যাট পেলো। এই সুযোগ আমরা আর হাত ছাড়া করলাম না। দেখতে গেলাম আমার সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান বাবার পৈতৃক বাড়ি। এছাড়াও দেখে এলাম ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সেস বাজার, শিলায়দহে রবিঠাকুরের বাড়ি, লালন ফকিরের মাজার, ইত্যাদি। সেই ভ্রমনের উপরই লেখা এই বই – “শিকড়ের খোঁজে বাংলাদেশে …..”। প্রায় ৩৫০ পাতার বই।

Publisher – Asian Press Books, Kolkata
Telephone – 033- 40445027, Mobile – 7001813717
Website – www.asianpress.in
Price of the Book – Rs 600
Available also through Amazon

এছাড়াও আমার অনেক প্রবন্ধ আছে। যেমন কলেজ জীবনের স্মৃতিচারণ (ঝরাপাতার দিনগুলি), ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রযোজনার ইতিহাসে বাঙ্গালীর অবদান – নিউ থিয়েটার্স ও বম্বে টকিজ স্টুডিয়ো, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিস্ট নেতাদের অন্তিম পরিনতি, দেশে বিদেশে চাকরী জীবনের কিছু ঘটনা কিছু স্মৃতি, সত্যজিৎ রায়ের জীবনে ও চলচ্চিত্রে নারী, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব, এরকম, মুলত সবই তথ্য নির্ভর প্রবন্ধ।

পুস্তক পর্যালোচনা
শিকড়ের খোঁজে বাংলাদেশে………’

শ্রী প্রদীপ ভৌমিকের “শিকড়ের খোঁজে বাংলাদেশে” শীর্ষক গ্রন্থটি মূলত উক্ত শিরোনাম বিশিষ্ট রচনাটি ছাড়াও আরো প্রায় আটটি রচনার সংকলন।
সম্ভবত ২০১৬ থেকে ১৭ সালের কোনও সময়ে তিনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। তারই কথা তিনি বলেন প্রথম রচনাটিতে। সেটির প্রথম থেকে সপ্তম পর্বে আছে পারিবারিক শিকড়ের খোঁজ, যেখানে আছে সেই দেশ ভাগের সময়ে পরিবারের সবাই-কে ভারতে পাঠিয়ে দিয়ে তাঁর ঠাকুর্দা শ্রী পীতাম্বর ভৌমিকের পূর্ব পাকিস্তানেই থেকে গিয়ে দেশের মাটিকে ভালোবাসার এক ছোট্ট কিন্তু মর্মস্পর্শী ছবি; আছে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত বাঁশকাইট স্কুলের কথা, যেটি ততদিনে প্রায় নব্বই বছর পেরিয়ে পরবর্তীকালের বাংলাদেশে তাঁরই পরিচয় নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে, তার সমানে দাঁড়িয়ে লেখকের সেই দুর্লভ অনুভূতি। এখানেই শেষ নয়। পরবর্তী সাত পর্বে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যাকে বলা যায় “বাংলাদেশের হৃদয়” সন্ধানে, যেখানে আছে ঢাকার সাভার থেকে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার দা সূর্য সেনের ফাঁসির মঞ্চের বিবরণ। বস্তুত এই অধ্যায়টি যে কোন পাঠকের হৃদয়কে আর্দ্র করে তুলবে।
অবশিষ্ট আটটি রচনায় অবশ্য লেখকের বিভিন্ন সময়ে লেখা নানা বিষয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহের পরিচয়ই পরিস্ফুট, যা ব্যক্তিগত স্মৃতি কথা থেকে সত্যজিতের সিনেমা ও জীবনের কিছু ছবি, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অথবা বাঙ্গালীর দুর্গোৎসব, এমনি নানা বিষয়ের আলোচনায় সমৃদ্ধ। এক কথায়, গ্রন্থটি বিভিন্ন স্বাদের লেখায় পরিপূর্ণ। পাঠকের কাছে এই বিষয় বৈচিত্র্য বিশেষ সমাদর লাভ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।

ডঃ সুখময় ঘোষ।
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক।
দর্শন ও সাহিত্যের কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত।
নবতিপর বর্ষেও অল্প বিস্তর লেখালেখি করেন।

********

পুস্তক আলোচনা
ম্যাপেল পাতার দেশে
লেখক: দীপঙ্কর রায়, ১৯৮০ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

ভূমিকা
প্রথম বিশ্বের দেশ কানাডা। পূর্বে আটলান্টিক থেকে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর। পৃর্ব থেকে পশ্চিম, ছ’টি টাইম জোন। জনপ্রিয় পর্যটক রুটে কানাডা চিরকালই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের অঙ্গ। সে যাত্রায় নায়াগ্রা পর্যন্ত দেখা যায়। তবে কানাডার ব্যাপ্তি নায়াগ্রা ছাড়িয়েও বহুদূর।

সম্প্রতি পারিবারিক সূত্রে কিছুদিন কানাডায় থাকার সুযোগ হয়েছিল। দেখেছি টরন্টো থেকে ক্যালগেরি। ভৌগলিক বৈচিত্রের সাথে একটা দেশ ছড়িয়ে থাকে তার মানবিক বৈচিত্রে, অনুভব করতে পেরছিলাম তার কিছু পরিচয়। সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়েই এই বই, “ম্যাপেল পাতার দেশে”, পরম্পরা প্রকাশনা থেকে এই ২০২৬ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে। স্বল্প পরিসরের বই, পাঠ সময় এক ঘন্টার মত। চেষ্টা করেছি পাঠকের হাত ধরে ঐ এক ঘন্টায় টরন্টো থেকে সাসকাটুন হয়ে ক্যালগেরি আর রকি মাউন্টেন ঘুরে আসার। আশা করি ভাল লাগবে।

দীপঙ্কর রায়
বিসি ৬৯ সল্ট লেক সিটি
কলকাতা ৭০০০৬৪
দূরভাষ ৯০৫১০১২১২১

বই এর প্রাপ্তিস্থান
পরম্পরা প্রকাশনা
২০এ বেনিয়াটোলা লেন
কলকাতা ৭০০০০৯
পাঠকের ভালবাসায় বইমেলা চলাকালীনই প্রথম মুদ্রণ নিঃশেষিত হয়ে যায়। পুনমুদ্রিত হয়ে, বইটি পাওয়া যাচ্ছে,

পুস্তক পর্যালোচনা
২০২৬ এর কলকাতা বই মেলায় এক সন্ধ্যায় অলস ভাবে এ স্টল থেকে ওই স্টল এ ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ এক ছোট্ট স্টলে প্রদর্শিত বইগুচ্ছের মধ্যে একটা পাতলা রংচংয়ে প্রচ্ছদযুক্ত বই এর উপর চোখ আটকে গেল – নাম “ম্যাপেল পাতার দেশে”, লেখক দীপঙ্কর রায়। সংগ্রহ করে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম লেখকের কানাডা ভ্রমণের এই ভ্রমণকাহিনী। যে কোন ভ্রমণকাহিনীর মূল উদ্দেশ্য আমার মনে হয় দুটো – এক, পাঠকের মানস ভ্রমণের রস আস্বাদন, আর দুই , পাঠককে বর্ণিত জায়গায় ঘুরে আসার তাগিদ অনুভব করানো। দুটি ক্ষেত্রেই আমার কাছে লেখক দারুণভাবে সফল। গোটা পঞ্চাশ পাতার পরিসরে বইটি লেখা, আর তরতরে ভাষায় ছোট ছোট দুই তিন পাতার অধ্যায়ে বিভক্ত এই বই এর এই অঙ্গ বিভক্তি পাঠকের মনোযোগ টানটান ধরে রাখে। অথচ এই ছোট্ট পরিসরে টুকিটাকি গল্পচ্ছলে লেখা বিষয়ের বৈচিত্র্যতা বইটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কানাডার দর্শনীয় স্থানগুলি যেমন নায়াগ্রা, রকি মাউন্টেন, ক্যালগেরি, অণ্টারিও হ্রদ লেখায় স্থান পেয়েছে, তেমনিই উল্লেখ আছে সে দেশের কৃষিফসল এবং কৃষিপদ্ধতি, যানবাহন ব্যবস্থা, অভিবাসী বনাম আদিবাসী সমস্যা, ডাইনোসর জীবশ্ম সংগ্রহালয়ের কথা। ইতিহাস , ভূগোল, বিজ্ঞান, শিল্প, জীবনচর্যা কোন কিছুই বাদ যায়নি লেখকের দৃষ্টি এবং লেখনী থেকে। মানবতা লঙ্ঘনের ব্যথা যেমন লেখকের বর্ণণায় অনুরণিত, তেমনই তীব্র জীবনবোধ ও সভ্যতার সংগ্রাম প্রতিধ্বনিত তাঁর আশাবাদী কলমে। তাই ফার্স্ট নেশনের প্রতিনিধি শিল্পীর অঙ্কন লেখকের চোখে সভ্যতার বিবর্তনের রূপভেদ। অনবদ্য স্টাইলে গল্পের গতিময়তার বাধা না ঘটিয়ে বিভিন্ন বিষয়গুলির অবতারণা করেছেন লেখক। বিদেশের মাটিতে গিয়েও লেখকের দেশের প্রতি টান এক চিত্তাকর্ষক আঙ্গিকে কিছু অধ্যায়ের নামকরণেও উজ্জ্বল। লেখক যেন এক ঘণ্টার এক হাওয়াই জাহাজ ভ্রমণে ভ্রমণপিপাসু পাঠকবর্গকে কানাডায় ঘুরিয়ে নিয়ে এলেন। ভ্রমণেচ্ছু উৎসাহী পাঠকদের সংগ্রহে এই বই একটি ছোট্ট হীরকখণ্ডসম হয়ে থাকবে। অত্যন্ত প্রশংসনীয় এই বইটির কিছু মুদ্রণ ত্রুটি আশা করি পরবর্তী সংস্করণে সংশোধিত হবে। অনেক শুভেচ্ছা রইলো লেখক দীপঙ্কর রায়ের প্রতি লেখকের ভূমিকায় আরো এগিয়ে যাওয়ার।

সৌমিত্র পালধী
সুগম পার্ক, নরেন্দ্রপুর

*******

Sahityika Admin

Add comment