সাহিত্যিকা

উৎকোচ দেয়ার হাতেখড়ি

উৎকোচ দেয়ার হাতেখড়ি
@বিমলেন্দু সোম, ১৯৬৭ আর্কিটেকচার ও প্ল্যানিং

“জোড়া হাতেখড়ি” স্মৃতিচারণ পর্বে আমার জীবনে উৎকোচ দেয়ার হাতেখড়ির গল্প!

আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগের ঘটনা! সদ্য কলেজের ফাইনাল পরীক্ষার পর বাড়িতে ফিরে এসেছি। রেজাল্ট বেরোতে আরও মাসখানেকের মত দেরি আছে। যাযাবর জীবন আমার, না আছে পাড়া, না পাড়ার বন্ধু-বান্ধব বলে কিছু! চিন্তা করে দেখলাম যে কলকাতার চেনা হোক কিংবা অচেনা, প্রাইভেট ফার্মগুলোতে একটু ঘোরাঘুরি করে কলকাতায় চাকরির বাজারটা একটু যাচাই করে নিলে হয়!

… যেমন ভাবা, তেমনই কাজ, … শুরু হ’ল আমার যাচাই পরিক্রমা! ফার্মগুলোতে মোটামুটি একই ধরণের জবাব শুনতে হ’ল: “কাজ! আর্কিটেকচার? … আরে কলকাতার বাজারে এখন আর্কিটেক্টদের ডিমান্ড খু্বই প্যাথেটিক। আর তা’ছাড়াও এখনও আপনার রেজাল্ট বেরোয় নি বলছেন। পরে আসবেন ভ্যাকেন্সি থাকলে দেখা যাবে”! …

ইতিমধ্যে এক বহু পরিচিত শুভাকাঙ্খী কলেজেরই প্রাক্তনী দাদা আমার বাড়িতে আসেন। বর্তমানে উনি একটি সরকারি কারিগরি দফতরে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের নানান আলোচনায় উঠে এল পরীক্ষার ফলাফলের প্রসঙ্গ। রেজাল্ট আউট হতে আরও মাসখানেক দেরি আছে শুনেই আমাকে প্রস্তাব দিলেন: “ভালোই হ’ল! আমাদের ডিপার্টমেন্ট একটা নতুন প্রজেক্ট শুরু করবে। ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল-কাম-রেসিডেন্সিয়াল’ টাউনশিপ প্রজেক্ট। মফস্বলের এক শিল্প শহরে হেড-কোয়ার্টার্স। আমাদের একজন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট আর্কিটেক্ট প্রয়োজন। আর্কিটেক্চারেল লাইনে কাজের ভালো স্কোপ রয়েছে, পরিবেশও ভালো। প্রজেক্টের দায়িত্বে থাকা সিংহভাগ ইঞ্জিনিয়ার আমাদেরই কলেজের, নিজেদের মধ্যে স্যার বলে কেউ নেই, সবই দাদা-ভাই সম্পর্ক! অস্থায়ী পোস্টের ডেজিগনেশন হ’বে আর্কিটেক্ট। মান্থলি স্যালারি অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদের সমতুল্য। এই প্রজেক্টটির সর্বোচ্চ পদে আছেন সুপারিন্টেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার (সিভিল)! আমার কাছেই তোমার সম্বন্ধে সব শোনার পর, তোমাকে অ্যাপ্রোচ করার দায়িত্ব আমাকেই দিয়েছেন। উনার নির্দেশ মতই আর দেরি না করে আমি নিজেই কলকাতা এসেছি। এই প্রপোজালে তুমি রাজি থাকলে এক্ষুণি একটা অ্যাপ্লিকেশন লিখে আমার হাতে দিয়ে দাও।” …
আমার মনে হ’ল সুযোগটা হাতছাড়া করা উচিত হবেনা। প্র্যাক্টিক্যাল অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে! আমি নির্দ্বিধায় প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে একটি অ্যাপ্লিকেশন লিখে দাদার হাতে দিয়ে দিলাম। …

দিন পাঁচেকের মধ্যেই আমার কাছে প্রজেক্ট-ইন-চার্জ অফিস থেকে চিঠি এসে গেলো। চিঠির নির্দেশ অনুসারে আমাকে মফস্বলের কোন এক বিশেষ হাসপাতালে ইউরিন টেস্ট করিয়ে নিতে বলা হয়েছে। … কথায় আছে – শুভস্য শীঘ্রম! পরদিনই আমি ভোরের ট্রেন ধরে দুগ্গা, দুগ্গা বলে আমি বেরিয়ে পড়লাম।

হাসপাতালের প্যাথলজি সংক্রান্ত আউটডোর দপ্তরটি প্রমাণ সাইজের একটা হল। সামনের বারান্দা থেকে হল-এর মাঝামাঝি এর প্রবেশ দ্বার। দু’পাশে চোখে পড়ে চার-পাঁচটা জং-ধরা স্টীল টেবিল, সঙ্গে স্টীল ফ্রেমে বেতের বোনা চেয়ার। দূরে, দেয়ালের কাছে বড় একটা স্টীল টেবিল, খুব পুরোনো মনে হ’ল না! অন্যান্য স্টাফদের থেকে কিছুটা আড়াল তৈরি করা হয়েছে জং-ধরা দু’টো স্টীল আলমারি দাঁড় করিয়ে। আলমারি পাল্লাগুলো হল-এর দিকে খোলে। ঘেরাটোপ দেয়া কেবিনের মত জায়গাটা যে কর্তা ব্যক্তির হবে, তাতে আমার কোনো সন্দেহই নেই! আপাতত তিনি রুমে নেই বলেই মনে হ’ল। …
একজন বর্ষীয়ান কর্মী, আয়েশ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পরম তৃপ্তি সহকারে জ্বলন্ত বিড়ি ফুঁকছেন! সম্ভবত হাতে বিশেষ কাজ নেই, তাই হল-এর সবাই আড্ডায় মত্ত। …

“আসতে পারি”? রুমে ঢোকার সৌজন্য মূলক প্রশ্ন আমার। …বর্ষীয়ান ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে অনুমতি দেন: “হ্যাঁ আসুন, কী দরকার বলুন”!
প্রশ্নের জবাবে বলি, “ইউরিন টেস্ট করাবার জন্য এসেছি”
এবার হাতের চিঠিটা এগিয়ে দিই। ভদ্রলোক চিঠি পড়ে আমায় ফেরত দিয়ে ইঙ্গিতে বড় টেবিলটা দেখিয়ে বললেন: “বসুন, বড়বাবু বাইরে আছেন, এসে যাবেন এক্ষুণি”।

এবার বড়বাবু এসেছেন, আমি দাঁড়ানোর চেষ্টা করায় আমাকে বসতে বললেন। টেবিলের ওপর রাখা কাগজপত্র অপ্রয়োজনে কিংবা অভ্যেসবশত একটু নাড়াচাড়া করে, অতঃপর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু প্রশ্ন: “হ্যাঁ, আপনি”!
আমি নিজের পরিচয় দিয়ে হাতের চিঠিটা দেখাই। বড়বাবু এক পলক চোখ বুলিয়ে নিয়ে জনৈক স্টাফকে ইউরিন টেস্ট সংক্রান্ত ফাইল এবং তার সঙ্গে একটা টেস্ট টিউব নিয়ে আসার জন্য বলেন। অতপর কর্মচারী ভদ্রলোক পাশে রাখা স্টীল আলমারি খুলে ফাইল ও টেস্ট টিউব বের করে নিয়ে এসে টেবিলের উপর রেখে নিঃশব্দে কাজের জায়গায় ফিরে যান। বড়বাবু আমার অরিজিন্যাল চিঠি এবং ফাইলের কপি মিলিয়ে দেখছিলেন। আর তক্ষুণি ল্যান্ডফোন বেজে ওঠায় হাত বাড়িয়ে ক্রেডল্ থেকে রিসিভারটা তোলেন।

কথাবার্তার পর তিনি উঠে দাঁড়ালেন, টেবিলের ডান দিকের মধ্যের ড্রয়ারটা খোলেন। আমার দিকে টেস্ট টিউব এগিয়ে দিয়ে বলেন: “এইটা নিন, এর মধ্যেই ইউরিন স্যাম্পল কলেক্ট করতে হবে। ওই যে পর্দাঢাকা জায়গাটা দেখছেন – ওখানে চলে যান, দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকবেন। দেয়ালের কুলুঙ্গিতে একটা স্ট্যান্ড আছে, তাতে ইউরিন স্যাম্পলের টেস্ট টিউব রেখে দেবেন”।
আমি মাথা হেলিয়ে ইতি বাচক ইঙ্গিত করি! …
“ও হ্যাঁ, জরুরী একটা কাজে এক্ষুণি আমাকে বেরিয়ে যেতে হচ্ছে। আপনি এই ড্রয়ারের মধ্যে একটি দু’ টাকার নোট রেখে দিয়ে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দেবেন। ভুলবেন না যেন। এতে কত টাকা, তা’ আমার গোনা আছে, টাকার হিসেবে কোন গরমিল বেরোলে চাকরির আশা কিন্তু ছাড়তে হবে”!
খুব মৃদুস্বরে উপদেশ দিয়ে বড়বাবু বেরিয়ে গেলেন।

আশ্চর্য হলেও আমার কাছে অন্য কোন উপায় ছিল না। তাই বড়বাবুর নির্দেশ মতই দু’ টাকার একটা নোট ভেতরে রেখে ড্রয়ার বন্ধ করি!

পর্দা সরিয়ে দেখতে পেলাম ডান দিকে একটা দরজা। ঠেলা দিয়ে খুলতেই আমার দু’চোখ তো ছানা বড়া! … সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে বালির ঢিপি – সম্পূর্ণ ভেজা! ইউরিনের উগ্র গন্ধে টেকা দায়! বালির ঢিপি পেরিয়ে সরু একটা সিঁড়ি দেয়াল ঘেঁষে উপরে কোথাও যেন উঠে গেছে! এদিকে তেরো ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইউরিনেশন বন্ধ, চেপে রেখেছি। তাই প্রেশারটা রিলিজ করতেই হবে! আমি এক লাফে বালির ঢিপি এড়িয়ে সিঁড়ির প্রথম ধাপে পৌঁছোই! আরও কয়েকটা স্টেপ ওপরে ওঠে তবেই দাঁড়ালাম। …

অতঃপর শুরু হ’ল টেস্ট টিউবের মধ্যে আমার অপারেশন ইউরিন কালেকশন! …
“আআহ্, হোয়াট আ রিলিফ! … কিন্তু এ কী মুশকিল! … সেই অপ্রতিরোধ্য ইউরিন মুক্তধারাকে আমি ঠেকাবো কী করে! টেস্ট টিউব ভরে গিয়ে ইউরিন উপছে পড়ছে! তাই বাধ্য হয়েই টার্গেট করতে হ’ল নোনা ধরা দেয়ালকে! ইউরিন স্রোত দেয়াল থেকে গড়িয়ে সিঁড়ি, সিঁড়ির ধাপগুলো ছাপিয়ে বালির ঢিপিতে আছড়ে পড়ছে”! …

হাসপাতাল পরিসর থেকে বেরিয়ে রিকশ ধরে রেলওয়ে স্টেশন। প্ল্যাটফর্মে ফুড কিয়স্ক থেকে কিছু খাবার খেয়ে বাড়ি ফেরার ট্রেন ধরি। …

ট্রেন ছুটে চলেছে নিশ্চিত লক্ষ্যে। … আমি স্বপ্ন ভাবনায় ডুব দিই: “জোড়া হাতেখড়ির প্রথমটি হ’ল উৎকোচ দিতে শেখা, যা’ আজ হয়ে গেল!
দ্বিতীয় – চাকরি জীবনের হাতেখড়ি এখনও অধরা! … স্বপ্নপূরণের মুহূর্তের জন্য আমাকে অপেক্ষা তো করতেই হবে”! …

******

স্মৃতিচারণ @”উৎকোচ দেয়ার হাতেখড়ি”
বিমলেন্দু সোম, কলকাতা – ৭০০ ০৬১
৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

Sahityika Admin

1 comment

Leave a Reply to অলোক কুমার কুন্ডু Cancel reply

  • হিসু করতেও ঘুষ দিতে হলো??