ইতিহাস যেখানে নীরব (ধারাবাহিক পঞ্চম পর্ব)
© দেবাশীষ তেওয়ারী, ১৯৬৯ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
আগের পর্বের লিংক
পর্ব (৭)
সুতনুকার এখন কোন কিছুতেই মন লাগেনা। এক দানবের হাত থেকে বাঁচতে সে কায়মনোবাক্যে ডেকেছিল বংশীধারীকে। সেই ডাকে সাড়া দিয়েতো সত্যিই এসেছিল এক তরুন যুবা, তাকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল সেই দানবের ছড়িয়ে রাখা জাল কেটে, কিন্তু হায় তার এই সৌভাগ্য ছিল ক্ষণস্থায়ী, মাত্র তিনদিন, দু রাত তাদের ঘটনাচক্রে একই ঘোড়ার সওয়ারী হতে হয়েছিল, তার পর সে কোথায় যে গেল, আর তার সঙ্গে কোনদিন দেখা হয়নি। সখীদের তার কথা জিজ্ঞাসা করলেও কোন সদুত্তর মেলেনা। এরমধ্যে আবার নতুন উপসর্গ হচ্ছেন সম্রাট মহারাজ অধিরাজ রামগুপ্ত নিজেই। তিনিই নাকি তার স্বামী, তাঁর জন্যেই নাকি তাকে হরণ করে আনা হয়েছে, কিন্তু কি এক অজানা কারণে তাদের শাস্ত্রমতে বিয়েটা কিছুতেই হয়ে উঠছে না।
এরইমধ্যে সুতনুকা দেখল বিশাল সেনা নিয়ে মহারাজ চললেন যুদ্ধে, লোক লস্কর, দাস দাসী, সখা সখী বয়স্য ইত্যাদি পরিবৃত হয়ে, এমনকি তাকেও সঙ্গে নিলেন। সুতনুকাকে তিনি বললেন রুদ্রসিংহকে খতম করবো, তোমার বাবাকে ধরে আনব, আর হাঁ, সেই সাথে তোমার সঙ্গে বিয়েটাও এবার সেরে ফেলব।
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কদিন ধরেই তারা এগিয়ে চলেছিল, সামনে তার পিতার রাজ্যের রাজধানী পার্বতীপুর, যেখানে তার ছেলেবেলা কেটেছে। সে উদগ্রীব, কবে সেখানে যাবে, কবে তার পুরোনো সখীদের সাথে দেখা হবে। হঠাৎ একদিন সুতনুকার খেয়াল হল গত দুদিন ধরে তারা আর যেন এগোচ্ছে না, একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। লোকজনের চোখমুখও কেমন যেন, ভীত, সন্ত্রস্ত, গম্ভীর। সখীরা খবর আনল শকসেনারা তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে।
আরও খারাপ খবর আনলো নিপুণিকা। নিপুণিকা নামেই তার সখী, আসলে সে সম্রাটের শয্যাসঙ্গিনী। রাতের বেলায় সম্রাট নাকি তাকে বলেছেন রুদ্রসিংহের কাছে রাণীকে পাঠিয়ে দেওয়াই উচিত কাজ হবে, হাজার হোক তার সঙ্গেই তো রাণীর বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল। এটা কি ধরণের কথা, এই গল্প তো সবারই জানা, আর তা জানা থাকা সত্ত্বেও তো মহারাজ তাকে হরণ করে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাহলে হঠাৎ কি এমন ঘটল যে তাকে শত্রু হাতে তুলে দিতে হবে? সুতনুকা ঠিক করল সে নিজে সম্রাটের সঙ্গে কথা বলবে। এইভেবে সে সম্রাটের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করল।
‘বল রাণী, হঠাৎ কি মনে করে। এখন যুদ্ধ চলছে, হাতে একদম সময় নেই, যা বলার তাড়াতাড়ি বল।’ রামগুপ্ত বললেন।
সুতনুকা কোন রকম ভণিতা না করে সোজাসুজি প্রশ্ন করল,’মহারাজ, ক্ষমা করবেন বিরক্ত করার জন্য, আসলে সখীরা বলাবলি করছিল আপনি নাকি নিজ রাণীকে শকদের উপঢৌকন দিচ্ছেন। এটা নিশ্চয় সত্যি নয়।’
‘উপঢৌকন? কে বললো এমন কথা? না, এ খবর মোটেই সত্যি নয়। তবে কৌশলগত কারণে তোমাকে কিছুদিন শক শিবিরে থাকতে হতে পারে।’
‘তার মানে? নিজ রাণীকে শকদের উপহার দেবেন অথচ তাকেই বললেন না।’
‘এটা যুদ্ধের একটা চাল, খুবই গোপন, তাই তোমায় এখনও বলিনি, তবে শকদের কাছে পাঠাবার আগে নিশ্চয় বলতাম। তাছাড়া একেবারে তো তোমায় দিয়ে দিচ্ছি না, আজ পাঠাতে হচ্ছে বটে, কিন্তু কাল আবার তোমায় জিতে নেব। এটা যুদ্ধ পরিকল্পনার অঙ্গ মাত্র।’
‘মহারাজ, আমি উপহার সামগ্রী নই। আমি গুপ্ত সম্রাজ্ঞী। আমাকে দাবার চাল হিসেবে ব্যবহার করলে, শত্রুদের হাতে আমায় তুলে দিলে মগধের গৌরব বাড়বে না। তার চেয়ে আমার মতে যুদ্ধ করাই তো ভাল।’
‘তোমার সঙ্গে যুদ্ধ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই না। তুমি যুদ্ধের কতটুকু জান? অার কিছু বলার না থাকলে তুমি এখন আসতে পার।’ সম্রাট রেগে গেছেন বোঝা গেল।
সুতনুকা আর কিছু না বলে রাজার কাছ থেকে চলে এল। এই ভীরু, কাপুরুষ, নির্লজ্জ লোকটির সঙ্গে আরও বাক্যালাপে তার আর রুচি ছিল না।
পরের দিন সকালেই সুতনুকাকে নিয়ে দুশো সৈন্যের একটা ছোট দল পার্বতীপুর রওয়ানা হয়ে গেল। সবাই পদাতিক, কেবল রাণী এবং সেনানায়ক দুর্জয় ঘোড়ায়। দুর্জয় বয়সে তরুন, বাহিনীতে সেনাপতি দেবদত্তর পরই তার স্থান, দেবদত্ত এখানে নেই, শকদের কাছে সম্রাজ্ঞীকে তাই সমর্পণ করতে হবে এই দুর্জয়কেই, সে আরও সমর্পণ করবে সন্রাটের তরবারী। সারাদিন চলার পর বাহিনী অবশেষে শিবির ফেলল অপেক্ষাকৃত হালকা বন দেখে। এখান থেকে পার্বতীপুর মাত্রই কয়েক ক্রোশ।কিছুটা দূরে ফাঁকা জায়গা দেখে রাণীর শিবির পড়ল। আজ শেষবারের মত সেখানে উড়ছে মগধ সম্রাজ্ঞীর পতাকা।
সমস্ত সৈনিক ঝর্ণা পেরিয়ে সুড়ঙ্গ পথে জড়ো হতে হতেই অনেক সময় চলে গেল। বাইরে তখন রাত শেষ হচ্ছে, ভিতরে কিন্তু নিকষ কালো অন্ধকার। এই প্রশস্ত স্থান থেকে অনেকগুলো সুড়ঙ্গমুখ বেরিয়েছে। কোন সুড়ঙ্গ পথে যেতে হবে কিভাবে ঠিক করবে চন্দ্র বুঝতে পারছে না। হঠাৎ তার নজর পড়ল কিছু দূরে একটা নেকড়ের মত জন্তু, তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে, অন্ধকারে তার চোখ দুটো জ্বলছে। চোখাচোখি হতেই জন্তুটা ঘুরে গিয়ে চলতে সুরু করল। চন্দ্র তাকেই অনুসরণ করে একটা সরু ফালির মত সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ল। কিছুটা যাবার পরেই সুড়ঙ্গটা আর সরু থাকল না, দুটো মানুষ পাশাপাশি যেতে পারে এমন চওড়া হয়ে গেল। নেকড়েটা এগিয়ে যায়, আর মাঝে মাঝে ঘুরে তাকায়, যেন দেখছে তার অনুসরণকারীরা পিছনে ঠিকমতো আসছে কিনা। কিন্তু কত বড় সুড়ঙ্গ, চলছে তো চলছেই, বেশ কয়েক ঘণ্টা হয়ে গেল, সুড়ঙ্গ আর শেষ হয় না, বরং তার থেকে এদিকে ওদিকে আরও অনেক ফ্যাকড়া বেরিয়েছে দেখা গেল। কোনটা দিয়ে যাবে, কোন পথের শেষে রয়েছে মুক্তি? আচ্ছা মুক্তি কি আদৌ আছে? শেষে কি এই ভুলভুলাইয়াতেই তাদের ঘুরে মরতে হবে, এই হবে তাদের অন্তিম আশ্রয়? চন্দ্র ঠিক করল ভাগ্যে যাই থাক না কেন, তারা ঐ জন্তুটিকেই অনুসরণ করে যাবে। কতক্ষণ তারা হেঁটে চলেছে তার আর হিসেব নেই, কিন্তু এক সময় পথের শেষ হল। হঠাৎই পথটা একটা বাঁক নিতে দূরে আলো দেখা গেল। সুড়ঙ্গের মুখ! অবশেষে মুক্তি এল। চন্দ্র এতক্ষণ ধরে সমানে সামনে চলা জন্তুটাকে দিনের আলোয় ভাল করে দেখার চেষ্টা করলো । কিন্তু কোথায় সেই রহস্যময় সঙ্গী? অন্ধকারের পথপ্রদর্শক দিনের আলোয় কখন উধাও হয়ে গেছে, অনেক খুঁজেও তাকে আর কোথাও দেখা গেল না।
দূর আকাশে লাল আলো ছড়িয়ে গোধূলির সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে, আর ঠিক তারই নীচে দেখা যাচ্ছে পার্বতীপুর নগরীকে। পার্বতীপুর? সুড়ঙ্গ তাহলে তাদের জঙ্গল পার করে দিয়েছে, তিনদিনের রাস্তা মাত্র এক দিনেই? নীচে একটা ছোট সেনা ছাউনি দেখা যায় না? ভাল করে দেখতে যেতেই চন্দ্র দারুণ চমক খেল। ছাউনি থেকে একটেরে একটা শিবির ফেলা হয়েছে, তাতে উড়ছে মগধ সম্রাজ্ঞীর পতাকা।
রাত্রি দুই প্রহর। সুতনুকা জেগে বসে আছে,যে দুজন অনুচরী তাকে সঙ্গ দিতে এসেছে তারা কখন নিজেদের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু সুতনুকার চোখে ঘুম নেই। আজই তার শেষ স্বাধীন রাত। যে রুদ্রসিংহকে সে রাক্ষস বলেই মনে মনে জানে, অবশেষে তার হাতেই তাকে পড়তে হবে? এই কি ছিল তার বিধিলিপি? হঠাৎ বুকে কিসের খোঁচা লাগায় তার চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটলো। কাঁচুলির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সে বের করে আনল খোঁচার কারণকে। একটা দারুণ ধারাল ছোট্ট ছুরিকা, গবাক্ষপথে আসা চাঁদের আলোয় সেটা জ্বলজ্বল করছে। সোনার হাতল দেওয়া এই ছুরিকা সেই যুবক তাকে দিয়েছিল নিজেকে বাঁচানোর জন্য যখন তারা শত্রু কবলিত কুষাণ রাজ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই থেকে এই ছুরিকা তার নিত্য দিনের সঙ্গী। হায় কোথায়,কোন দূর দেশে রয়েছে সেই নবীন যুবা, সেই দুঃসাহসী যে তাকে পিতার প্রাসাদ থেকে তুলে এনেছিল সমস্ত বিপদ অগ্রাহ্য করে? সেকি এখনও তার কথা ভাবে? সেকি তাকে এরকম ভাবে শত্রুহাতে তুলে দিত? সুতনুকা নিজেই উত্তর দিল, না, কিছুতেই না, সে প্রাণ দিয়ে তাকে রক্ষা করতো। কাল সকালে চলে যেতে হবে। আজ রাতে সেই যুবকের কথা ভেবেই তার হৃদয়ের সমস্ত ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা বিগলিত অশ্রুধারা হয়ে নেমে এল।
‘রাজকুমারী, রাজকুমারী, আর ভয় নেই, আামি এসে গেছি।’ সুতনুকা দারুণ চমকে ওঠায় ছুরির ডগা তার আঙুলে বিঁধে গেল। সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই, সে দেখছে যেন কোন মায়ামন্ত্রবলে তার সামনে উদয় হয়েছে সেই নবযুবার, মুখে তার মৃদু হাসি।
আশা আর হতাশার এই দোদুল্যমান অবস্থা সুতনুকার আর সহ্য হল না। জ্ঞান হারিয়ে সে ঢলে পড়ল নবযুবার বুকে।
পর্ব (৮)
সেই সময় পার্বতীপুর থেকে কিছুটা দূরে শক ছাউনিতে রুদ্রসিংহের শিবিরে তিনজন গভীর আলোচনারত ছিল, এদের দুজনের নাম আমরা আগেই জেনেছি, মহাক্ষত্রপ রুদ্রসিংহ স্বয়ং ও পূর্ব দিকের সেনাপতি নাহাপণ। এছাড়াও রয়েছে শকদের প্রধান সেনাপতি অরিদমণ।
রুদ্রসিংহের আজ তুরীয় অবস্থা। তার প্রধান সঙ্গিনী সুনয়নার বুকে তার মাথা, হাতে মদিরার পাত্র। ‘হতচ্ছাড়া রামগুপ্তটার স্পর্ধা দেখ্, আমার বাগদত্তাকে চুরি করেছিল । এখন বিপদে পড়ে ব্যাটা সেই বৌকে আমায় ভেট দিয়ে নিজে প্রাণে বাঁচতে চাইছে। কাপুরুষ! আচ্ছা, ওকে কি ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে?’ রুদ্রসিংহ লালচোখ আরও লাল করে তার সহকারীদের দিকে চাইল।
নাহাপণের বেশ নেশা হয়ে গেছে। মদিরার প্রভাবে সে লাফিয়ে উঠল, ‘মোটেই না, মোটেই না প্রভু। কথায় আছে না, যেমন কর্ম তেমনি ফল। শয়তানটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে শিয়ালদের খাবার জন্যে ফেলে রাখা উচিত, যেমন আমরা অন্য হেরে যাওয়া রাজাদের সঙ্গে করি।’
‘চোপ, বেয়াদব! সম্রাটের সামনে চেঁচানো! বেশী বাড়াবাড়ি করলে ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে দেব একেবারে।’ মহারাজের নেশাও কিছু কম হয় নি।
নাহাপণের নেশা কিন্তু ছুটে গেল। নাকের ডগা দিয়ে চন্দ্রগুপ্ত সুতনুকাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার পর থেকে মহারাজ তার ওপর খুব একটা খুশি নন।
‘এই, তুই কিছু বলছিস না কেন?’ রুদ্রসিংহর নজর এবার তার প্রধান সেনাপতির ওপর।
‘মহারাজ, আমার মতে রামগুপ্তকে ছেড়ে দেওয়াই উচিত।’
‘সে কী রে, কেন়? তোর আবার কবে থেকে এমন দয়ার শরীর হলো?’
অরিদমণ বললো, ‘মহারাজ, আমরা এখনও মগধ জয় করিনি। রামগুপ্ত তার নির্বুদ্ধিতার জন্যে আমাদের জালে এসে নিজেই ধরা দিয়েছে। তাদের রাজ্যসীমা, সৈন্যবল এখনও অটুট আছে। রামগুপ্তর কিছু হয়ে গেলে রাজা হবে যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত, এবং তা আমাদের পক্ষে মোটেই শুভ হবে না।’
‘প্রিয়ে সুনয়নে, তুমি সুদেহিকাও বটে। যেমন তোমার নিটোল বুক, গুরু নিতম্ব, তেমনি তোমার টানাটানা চোখ আর তার দৃষ্টি। আহা, মরে যাই, কেমন তিরছি নজর! আমি তোমার দাস, তুমি আমার রাণী। মুঝে মার ডালো জানেমন্! তুম্হে বিনা মৈ জী নহি সকতা।’ রামগুপ্তকে কি করা উচিত সেই আলোচনা আপাততঃ মুলতুবী রেখে রুদ্রসিংহ তখন তার নর্ম সহচরীর সঙ্গে রহস্যালাপে মত্ত।
‘কাল তো সুতনুকা আসছে। তাকে পেয়ে কী এই সেবিকার কথা আর মহারাজের মনে থাকবে?’ সুনয়না কপট অভিমানে বললো।
সুনয়নাকে নিজের কোলে বসিয়ে তার কাঁচুলি খুলতে খুলতে দুই সেনাপতির উপস্থিতি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে রুদ্রসিংহ বলে চললো, ‘প্রিয়ে, সুতনুকা হল যমুনার জল, আর তুমি হলে পরশু দেশের মদিরা। সে দেবে জীবন, আর তুমি? তুমি আমায় মৃত্যু দাও প্রিয়ে। দেবে না?’ সুনয়না চোখের ইশারায় নাহাপণদের চলে যেতে বলল। রুদ্রসিংহ তখন তার ঘাগরা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পার্বতীপুরের প্রধান তোরণের কিছুটা বাইরেই মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। এখানেই হচ্ছে মগধ সম্রাজ্ঞীর সমর্পণ অনুষ্ঠান। চার স্তর বিশিষ্ট সুউচ্চ মঞ্চ। তিন হাত উঁচু প্রথম ধাপে অভ্যাগত রাজারা বসে আছেন, এদের মধ্যে আছেন সুতনুকার পিতা বুধাজিৎ ও। তিনি কিছুটা হতচকিত, অসহায়ও। মেয়ের ভাল হচ্ছে না খারাপ, তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। বুঝলেও অবশ্য তাঁর কিছু করার নেই, তিনি রুদ্রসিংহের আজ্ঞাধীন।
প্রথম ধাপের মাঝখান দিয়ে ওপরে ওঠার রাস্তা, দ্বিতীয় ধাপ আরও তিন হাত ওপরে। চার হাত লম্বা দুই হাত চওড়া কোমর সমান উঁচু কাঠের বেদীতে সেখানে রাখা আছে রুদ্রসিংহের পাদুকা, দুদিকে দুই সেনাপতি অরিদমণ ও নাহাপণ সেই বেদীকে পাহারা দিচ্ছে। এই পাদুকার সামনে মগধ সেনাপতি তাদের সম্রাটের তরবারি সমর্পণ করবে, তারপরে সম্রাজ্ঞীকে নিয়ে যাবে মহারাজ সমীপে। বেদী থেকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় ধাপের শেষ। তার থেকে হাত দুয়েক উঁচুতে তৃতীয় ধাপ। ওখানে কেউ নেই, খালি মহারাজের চার দৈত্যাকৃতি দেহরক্ষী। এই স্তরেই মহারাজের কাছে রাণীকে সমর্পণ করা হবে এবং তিনি সামান্য ওপরে চতুর্থ ধাপে এগিয়ে যাবেন। সেখানে একাকী সিংহাসনাসীন মহারাজ রুদ্রসিংহ, পাশে আরেকটি খালি সিংহাসন। সেখানে রাণী এসে বসবেন। দুই সেবিকা দুদিক থেকে তাকে চামর দুলিয়ে হাওয়া করছে। মাথার ওপরে চন্দ্রাতপ, মোটা পশমের বনাত দিয়ে মঞ্চের দুই ধার ও পিছন দিক ঢাকা। মঞ্চে উপস্থিত কারও কাছেই কোন অস্ত্র নেই। এমনকী নিজের সেনাপতিদেরও মহারাজ সমীপে নিরস্ত্র থাকাই নিয়ম। একমাত্র সশস্ত্র মহারাজ রুদ্রসিংহ নিজে। শক রাজবংশের প্রতিভূ তরবারিটিকে তিনি আজ নিয়ে এসেছেন। হাজার হোক শত্রু সাম্রাজ্যের মহারাণী আজ থেকে তাঁর অঙ্কশায়িনী হতে চলেছে। স্বীয় বুদ্ধি ও শক্তিবলে তিনি তাকে জয় করেছেন, তাই তিনি আজ এসেছেন যোদ্ধার বেশে। সারা দেহ লৌহ বর্মে ঢাকা, মাথা ঢাকা শিরস্ত্রাণে। জানাশোনা কোন অস্ত্রেই এই বর্ম ভেদ করা সম্ভব নয়।
মগধের সেনাপতি তার দুশো সৈনিককে নিয়ে আগেই এসে গেছে। কয়েকটি ঘেরা জায়গায় তাদের সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে দেখে নেওয়া হয়েছে নিজেদের তরোয়াল ছাড়া অন্য কিছু তারা লুকিয়ে সঙ্গে নিয়ে এসেছে কিনা। মূলমঞ্চ থেকে দুশো হাত দূরে অস্ত্র সমর্পণ বেদী, সেখানে একে একে তাদের অস্ত্র অর্পণ করে তারা কিছু দূরে তাদের জন্য নির্ধারিত স্থানে হাঁটু মুড়ে অবনত শিরে বসল। আসল সমর্পণ অনুষ্ঠান হবে মহারাণী এলে।
হঠাৎ চারদিকে একটা গুঞ্জন উঠল, ‘মহারাণী আসছেন, মহারাণী আসছেন।’ অভ্যাগত রাজারাও নড়েচড়ে বসলেন। সুতনুকার সৌন্দর্যের কথা ভারত বিদিত। শিবিকা থেকে সুতনুকা নামল, কিন্তু তার মুখের ওপর একটা পাতলা আবরণ জড়ানো। উপস্থিত সবাই হতাশ হলেন রাণীর মুখ দেখতে না পেয়ে।
শিবিকা থেকে নামার পর সুতনুকার সঙ্গিনী হল সুনয়না, মগধের অনুচরীরা আর এগোলো না। সুনয়না দেখল রাণী প্রচুর সেজে এসেছে, বিশেষ করে গা ভর্তি সোনার গয়নার জন্যে বুকের কাঁচুলি পর্যন্ত ঢাকা পড়ে গেছে। সে মনেমনে হাসল। মহারাজকে বলতে হবে, গয়নার লোভ শুধু সুনয়নারই নয়, তোমার রাণীরও আছে।
মঞ্চ পর্যন্ত রাণীকে পৌঁছে দিয়ে সুনয়না বিদায় নিল। মঞ্চে তাকে নিয়ে যাবে মগধের সেনাপতি।
রাণী দৃপ্ত পদক্ষেপে মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়াল, কোন দিকে ফিরেও চাইল না। সেনাপতি সামনে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে অভিবাদন করল, তারপর মৃদুস্বরে কিছু বলে মঞ্চের ওপর উঠতে লাগল, রাণী তাকে অনুসরণ করল।
দ্বিতীয় ধাপে পরিকল্পনা মত অস্ত্র সমর্পণ করে সেনাপতি তাকে নিয়ে তৃতীয় স্তরে উঠে এল। মহারাজের সামনে নতজানু হয়ে সেনাপতি তার মাথার উষ্ণীষ খুলে দিল। এরপর মহারাজের অনুমতি নিয়ে সে বলতে শুরু করল, ‘পশ্চিম সাম্রাজ্যের সম্রাট, আপনার সামনে উপস্থাপন করছি মগধের সম্রাজ্ঞীকে। আপনি – – -‘ এইটুকু বলামাত্র সুতনুকা এগিয়ে এসে একটানে তার অবগুণ্ঠন সরিয়ে সরাসরি মহারাজের দিকে তাকাল।
আর সবার মত নাহাপণও এতক্ষণ রাণীর দিকেই চেয়ে চেয়ে তার দেহ সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। এখন সেনাপতি তার উষ্ণীষ খুলে হাতে নিতেই সে চমকে উঠল। একী, এ তো ছোটখাটো কোন সেনাপতি নয়, এ যে যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত স্বয়ং। সে তো এতদিন পাটলিপুত্রে ছিল। গুপ্তচর ‘অতিশয়’ খবর দিয়েছে বটে যে সে মথুরায় ফিরে এসেছে, কিন্তু পাহাড় পেরিয়ে সে এদিকে আসবে কি করে? একটা মাছি গলারও উপায় নেই সেখানে, তার সৈন্যেরা প্রতি বিঘৎ কড়া পাহারায় রেখেছে। নাহাপণ একবার ভাবল মহারাজকে সাবধান করে দেয়, কিন্তু মহারাজ এখন রাণীর সৌন্দর্যে এমন বুঁদ হয়ে আছে, এই সময় বিরক্ত করলে তাকে মুণ্ডুই না খোয়াতে হয়। অনেক ভেবে সে চুপ করে থাকায় শ্রেয় মনে করল। আগে তো সবকিছু ভালই ভালই কাটুক, তারপর চন্দ্রগুপ্তকে দেখা যাবে। শক ঘাঁটি থেকে তার বেঁচে ফেরা অসম্ভব।
রুদ্রসিংহ এতক্ষণ তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করছিল। এখন সুতনুকার পূর্ণ রূপ হঠাৎ প্রকাশ পেতে সে হতবাক হয়ে গেল। সেই কোন কালে বালিকা সুতনুকাকে তার পিতার সঙ্গে দেখেছিল, এখন প্রায় যুবতী রাণীকে দেখে সে বিমুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে রইল। যেমন চেহারা, তেমন রূপ, মানুষ এত সুন্দর হয়! এ মানবী, না গন্ধর্বী না দেবী। হাঁ করে রাজা তার দিকে চেয়ে আছে দেখে সুতনুকা ভ্রূকুটি করে তার দিকে অপাঙ্গে চাইল।
রুদ্রসিংহ যেমন এক দৃষ্টিতে রাণীকে দেখছিল, তার অন্য কিছুর খেয়াল ছিল না, চন্দ্রও কিন্তু গভীর মনোযোগ দিয়ে কেবল মহারাজকেই দেখছিল। লৌহবর্মে মহারাজের বুক, পিঠ, হাত পা সব ঢাকা, মাথায় শিরস্ত্রাণ, তার থেকে লৌহ জালিকা পর্দার মত গলা পর্যন্ত ঝুলে আছে। এক কথায় দুর্ভেদ্য কবজ। ‘হে ভগবান, সুযোগ দাও পাপীর বিনাশ করতে, চন্দ্র মনে মনে প্রার্থনা করল।
শিরস্ত্রাণের দুই কোটর দিয়ে মহারাজের দুটি লাল চোখ খালি দেখা যায়, অতি কর্কশ তার দৃষ্টি। হঠাৎ চন্দ্র লক্ষ্য করল রাজার সেই কর্কশ চাউনি পাল্টে গেছে কামার্ত আবেশে। কারণ জানতে চন্দ্র ঘুরে তাকাল ।
সুতনুকা তখন রাজার দিকে চেয়ে আছে বঙ্কিম ভ্রূভঙ্গে। হায়, যে কটাক্ষে ত্রিভুবন পদানত হয়, রুদ্রসিংহের সাধ্য কি তা প্রতিহত করে। তার তখন একটায় চিন্তা, কখন রাণীকে গভীর আলিঙ্গনে চেপে ধরে নিষ্পেষিত করা যায়। এই সব অতিথি অভ্যাগত, এই সমর্পণ অনুষ্ঠান, এসবের কি দরকার? সব অপ্রয়োজনীয়, অসার, এরা খালি তার আর রাণীর মধ্যে বাধার সৃষ্টি করছে। দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে সে আহ্বান করল, ‘এসো রাণী, আমার পাশে আসন গ্রহণ কর।’
চন্দ্র মহারাজের বেপথু অবস্থা লক্ষ্য করে রাণীকে নীচু স্বরে কিছু বলল।
দুই পা এগিয়ে পরের ধাপে উঠতে গিয়েই সুতনুকা হোঁচট খেয়ে সামনে পড়ল। মহারাজ ঝুঁকে পড়ে তাকে ধরতে যেতেই মুহূর্তের জন্য শিরস্ত্রাণ থেকে ঝোলা জালিকা সরে গিয়ে মহারাজের গলদেশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ল।
চোখের পলক পড়ার ও আগে সেনাপতিবেশী চন্দ্র ঝাঁপিয়ে পড়ে রাণীর বাড়ানো হাতে ধরা ছোট্ট ছুরিকাটি নিয়ে নিপুণহাতে রুদ্রসিংহের গলনালী ছিন্ন করে দিল। মহারাজ মুখ থুবড়ে পড়ার আগেই সে রুদ্রসিংহের তরবারি টেনে নিয়ে এক টানে মঞ্চের পিছনের কাপড় কেটে দিল। দেখা গেল নীচে বেঁধে রাখা আছে রুদ্রসিংহের প্রিয় ঘোড়া রোহিত। চন্দ্র সুতনুকাকে নিয়ে তার ওপর লাফিয়ে পড়ে বাঁধন কেটে দিতেই ঘোড়া দুই পা তুলে হ্রেষাধ্বনি করে উল্কার গতিতে ছুটে পার্বতীপুরে ঢুকে পড়ল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে কেউ নড়ার সময় পর্যন্ত পেল না।
রাজার কাছে দাঁড়ানো চার দেহরক্ষী ও সেনাপতিরা যখন বুঝতে পারল কি ভয়ানক অনর্থ ঘটে গেছে, তখন মহারাজ মাটিতে পড়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।
(ক্রমশ)






Add comment