সাহিত্যিকা

ধোনির কোচ

ধোনির কোচ
© গণেশ ঢোল, ১৯৮৭ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

সামনে রাধাচূড়া, দূরে কৃষ্ণচূড়া, মধ্যেখানে আমার বাড়ি ‘মন্দবাসা’।
আগে বলতাম ‘ভালোবাসা’। এখন ওটাই মন্দবাসা হয়ে গেছে। এই বাসায় আমি ছাড়া আর কেউ নেই। যারা ছিল, চলে গেছে। বাজারে দেনা, শরীর ব্যাধিমন্দির, মনেও সুখ নেই। ব্যাঙ্ক প্রায়ই লোক পাঠায়, সেদিন ম্যানেজার নিজে এসে নরমে গরমে অনেক বুঝিয়ে, ভয় দেখিয়ে, শাসিয়ে গেল। ওগুলো আজকাল আর আমায় স্পর্শ করে না। না টেনশন, না ভয়, রাগও নয়। সারা রাত ঘুম হয়নি, সকাল বেলায় আর বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করে না। ক্লান্ত লাগে খুব।

গত দু’দিন ধরে শ্যামলী আসছে না, আমারও উঠে আর চা করতে ইচ্ছে করে না। সেদিন পুরনো সিন্দুক থেকে একটা বড় কাঁসার থালা, গ্লাস, আর একটা জামবাটি বার করে ওকে দিয়ে বললাম, “এখন ক্যাশ নেই, তুমি এগুলো নিয়ে নাও, আমার মা’র বিয়েতে পাওয়া।”
ও বলল, “এ তো অনেক দাম।”
আমি বললাম, “হোক্, নাও তুমি। তবে রোজ সকালে এসে দু’টো রান্না করে দিও।”
সে বলে, “রান্না করব কী? তোমার ফ্রীজে বা চুবড়িতে কোনো সবজিই থাকে না। বেশির ভাগ দিনই নিজের পয়সা দিয়ে আলু, কুমড়ো, পটল কিনে নিয়ে আসি বাজার থেকে। সেগুলোই রান্না করি। এরকম করে কতদিন চালাব আর বলো? এখন তো চাল, ডাল, তেল, নুন কিচ্ছু নেই। রান্নাটা করব কী দিয়ে? আমারও পেটে যে টান পড়ছে।”
শ্যামলীর কথাগুলো আমার মাথায় ঠিক ঢোকে না, তার মানে আমি ওর পয়সায় খাই!

আজকাল রোজ সকাল হলেই একটা কালো লম্বা লেজের, পিঠের কাছটায় খয়েরি রঙের পাখি ব্যালকনির কাচ ঠোকরায়। নাম জানি না পাখিটার, আমি খুব কম পাখি বা ফুলের নাম জানি। বিস্কুটের কৌটয় চারটে বিস্কুট পড়ে ছিল। দু’টো খেয়ে জল খেলাম। নরম হয়ে গেছে বিস্কুটগুলো। কবেকার কে জানে! বাকি দু’টো বিস্কুট পাখিটাকে দিলাম, খেল না। বরং লম্বা ঠোঁট উঁচিয়ে আমাকেই তেড়ে এল। আজকাল যে পারে সেই ঠোকরাতে চায়।

চা খেতে ইচ্ছে করছে। নাইডু না রাওয়ের দোকান – নামটাও আজকাল মনে পড়ে না। সবাই বলে ধোনির চায়ের দোকান। ধোনি যখন খড়্গপুর স্টেশনে টিটি ছিল তখন এই সেরাস স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলত। প্র্যাক্টিসের পরে ওই দোকানে চা খেত। তখন ধোনিকে কেউ চিনত না। আমি রেলের টিমের কোচ ছিলাম। সেসময় ওকে অনেক হেল্প করেছি। যাতে স্পেয়ারিং পায়, মানে ডিউটি না করে প্র্যাকটিস করতে পারে, অন্য ডিভিসনের এগেনস্টে ম্যাচ খেলতে যেতে পারে। কিন্তু ধোনিটা খুব বদমাস ছিল, পয়সা কামাবার জন্যে খালি টেনিস বলের টুর্নামেন্টের খেপ খেলতে চলে যেত এখান, সেখান। প্র্যাক্টিসে আসত না। ভাগ্যিস যেত, তখন থেকেই তো ওই তাড়ু মারের হেলিকপ্টার শটের জন্য বিখ্যাত। প্র্যাক্টিসে এলে তো সেই কপিবুক ক্রিকেট – ভি-এর মধ্যে খেলো, স্ট্রেট ব্যাটে খেলো, ক্রস ব্যাট চালাবে না, ক্রিজে সেট হওয়ার আগে হুক শট মারবে না, হাজারটা বায়ানাক্কা। নিজেকে ইম্প্রোভাইজ না করতে পারলে, রিস্ক না নিলে বড় ক্রিকেটার হওয়া যায় না। যেমন আমি হইনি। বাঁশবনে শিয়াল রাজা হয়েই রয়ে গেলাম সারা জীবন। লোকে খালি ‘বাঘাদা’, ‘বাঘাদা’ করেই বারে চড়িয়ে গেল।

আমার বাড়ি থেকে কিছুটা হাঁটলেই ধোনির চায়ের দোকান। ওই নাইডু লোকটার যখন অসুখ হয়েছিল তখন ধোনি ওর চিকিৎসার আর দোকানটাকে ভালোভাবে বানাবার জন্যে অনেক টাকা দিয়েছিল। সেই থেকেই ধোনির নাম দোকানে সেঁটে গেছে। এখনও লোকটা কথা বলতে পারে না, হাত কাঁপে, লোকটার সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছিল। আমায় দেখে গতকাল কাঁপা কাঁপা হাতের দশ আঙুল দেখিয়েছে। তার মানে, দশটা চায়ের দাম বাকি আছে। ওসবে আমল দিই না। নাইডু জানে আমি ধোনির কোচ ছিলাম। ধোনির টাকায় যে দোকান হয়েছে তাতে আমারও হক আছে।

আমার বড় একটা হোন্ডা সিটি ছিল। লোন নিয়ে কেনা। ইএমআই বাকি পড়ে ছিল, সেদিন ব্যাঙ্ক বাউন্সার পাঠিয়ে গাড়িটা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। একটা পালসার বাইক ছিল, আইআইটির এক রিসার্চ স্কলারকে দিয়েছিলাম চালাবার জন্যে। ছেলেটাকে আমার খুব ভালো লাগত, আমার বাড়িতেই পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকত। সে ছেলেটাও গত এক বছর হল বাইকসুদ্ধ হাওয়া হয়ে গেছে। একটি পয়সাও ঠেকায়নি। খালি মিষ্টি মিষ্টি কথা বলত, আর ‘বাঘাদা, বাঘাদা’ করত।

সাইকেলের চাকাতেও পাম্প নেই। হাঁটতে শুরু করি। আমার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ধোনির দোকান। ইয়াং ছেলে, আধবুড়ো লোকেরা সাত সকালেই আড্ডা জমিয়েছে। মোদি-মমতা নিয়ে গুলজার করছে। আমাকে দেখেই সব ‘বাঘাদা, বাঘাদা’ করে উঠল। এরা কেউ আমার পকেটের অবস্থা জানে না, তাই এত খাতির। যাই হোক সকালের চা-বিস্কুটটা পরের পয়সায় হয়ে যাবে। কেউ জিজ্ঞেস করে, ধোনি ফোন টোন করে কি না। আমি বলি, “খুব ব্যস্ত, গত মাসে আমার জন্মদিনে করেছিল।” এটা নির্জলা মিথ্যে কথা, বলতে হয় লোকের কাছে পাত্তা পাওয়ার জন্যে। হঠাৎ কানে আসে, একটা গানের লাইন – ‘তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা, কে জানে কি আবেশে দিশাহারা’।

একটা ছেলে মোটর সাইকেলে বসে গানটা গাইছে, আর সঙ্গের মেয়েটা ঢলে পড়ে খুব ন্যাকামি করছে, “তোর খালি গায়ে হাত দেওয়ার ইচ্ছা না।” আমার চোখ চলে যায় ওদের দিকে। দেখি আমার সেই লাল পালসারের মতোই একটা বাইক। নাম্বার প্লেটের দিকে তাকাই, আরে এতো আমারই বাইক। সেই নাম্বার – WB35AF1415.
জিজ্ঞেস করি ছেলেটাকে, “এই মোটর সাইকেলটা কার?”
ছেলেটা খুব তেড়িয়া হয়ে উত্তর দেয়, “আমার।”
– ” আর সি বুক আছে তোমার কাছে?”
– ” হ্যাঁ আছে।”
– ” দেখাও।”
– ” আপনাকে দেখাব কেন?”
– “দেখাও, নাহলে তুমিই বিপদে পড়বে।”
ততক্ষণে আমার চেনা লোকেরা সব এসে গেছে, ‘কী হয়েছে বাঘাদা বলে?’
ছেলেটা আর সি বুক বার করে, সেখানে দেখি লেখা আছে আমারই নাম, সুব্রত সেনগুপ্ত। জিজ্ঞেস করি, “তোমার নাম কী?”
ছেলেটা এবার ভয় পেয়ে তোতলাতে শুরু করে। আমি বাইকের চাবিটা খুলে পকেটে রেখে দিই। মেয়েটি ধীরে ধীরে হাঁটা দেয়। একটু দূরে একটা রাধাচূড়া গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়ায়, যাতে যে কোনো মুহূর্তে ছুটে পালাতে পারে। মেয়েটার দিকে কেউ নজর দেয় না। ছেলেটাকে দেখে ভদ্রলোকের ছেলে বলেই মনে হয়। জিজ্ঞেস করি, “এই বাইক তোমার কাছে এল কোথা থেকে?”
কেঁদে ককিয়ে ছেলেটা যা বলে তার সারমর্ম এই, ওর বাড়ি বেহালায়, রিসেন্টলি চাকরি পেয়েছে রেলে, থাকে সাউথ ডেভেলপমেন্টের এক নম্বর কোয়ার্টারে। ওদের পাড়ার একটি ছেলে আইআইটিতে পিএইচডি করত, তার কাছ থেকে কুড়ি হাজার টাকা দিয়ে কিনেছে এই বাইক। সেই ছেলেটির নাম অসিত ঘোষ। সে ওকে বলেছিল, কেনার পরেই এই বাইকের মালিক মারা গেছে। তাই আরসি বুকে নাম বদলানো হয়নি। অসিতের এখানে কাজ শেষ হয়ে গেছে ও এখন পোস্ট ডক করতে আমেরিকার কোনো ইউনিভার্সিটিতে আছে।
আমি ওকে বলি অসিতকে হোয়াটসঅ্যাপ কল করতে, ছেলেটি ফোন করে, ফোন ওঠায় অসিত। ছেলেটির হাত থেকে ফোন নিয়ে আমি কথা বলতে শুরু করি।
– কী অসিত কেমন আছো?
ও আমার গলা চিনতে পারে, একটুও অবাক না হয়ে অমায়িক গলায় বলে, “আরে বাঘাদা যে! ভালো আছি দাদা। আপনি কেমন? আর আপনার কোচিং কেমন চলছে?”
– “ভালোই চলছে। তুমি কোন্ ইউনিভার্সিটিতে আছো?”
ও আর কোনো উত্তর দেয় না, কিংবা পুওর কানেক্টিভিটির দরুন ফোন কেটে যায়।

ছেলেটির মুখ দেখে আমার খুব মায়া লাগে। অন্যরা ওকে মারতে যায়, পুলিশে দেওয়ার কথা বলে। আমি ছেলেটিকে আড়াল করে বলি, “কেউ গায়ে হাত দেবে না। তুমি বাইক রেখে, আরসি বুক আমায় দিয়ে চলে যাও।”

তাই করে ছেলেটা, চারদিকে মেয়েটাকে খোঁজে। তারপর ধীরে ধীরে হেরে যাওয়া মানুষের মতো দূরে রাধাচূড়া গাছের দিকে হেঁটে যায়। লাস্ট বলে চার রান করলে জিতে যাবে, এই অবস্থায় ইয়র্কার বলে বোল্ড হয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যান যেভাবে প্যাভিলিয়নের দিকে হেঁটে যায় ঠিক সেইরকম লাগছিল ছেলেটাকে দেখে। আমি দূর থেকে দেখি মেয়েটা খুব রেগে ছেলেটাকে কিছু বলছে। ছেলেটা বোঝাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই মানছে না। অবশেষে ওরা দুজনেই মাটিতে বসে পড়ে। হলুদ রাধাচূড়া ঝরে পড়ে ওদের মাথার ওপর।

কে যেন আমার ভেতর থেকে বলে ওঠে, “ঠিক হল না। এটা তোমায় মানায় না। তুমি ধোনির কোচ, তোমায় সবাই ‘বাঘাদা’ বলে। তুমি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। বাঘ অন্যের এঁটো মাংস খায় না। যাও ফেরত দিয়ে এসো ওই পুরনো বাইক। তোমার জন্যে ওদের প্রেম ভেঙে যাবে। যাও শিগগিরই যাও।”

বাইকে স্টার্ট দিই, ওদের কাছে পৌঁছে দেখি, চুপ করে বসে আছে দুজনে। মেয়েটার গালে কান্নার দাগ, ছেলেটারও চোখ লাল, জিনস্ প্যান্টে ধুলো। আমি ছেলেটার হাতে বাইকের চাবি ও আরসি বুক দিয়ে বলি, “নাও এই বাইক এখন তোমার, এটা আর আমায় মানায় না। এটা তোমারই।”

মেয়েটাকে বলি, “জড়িয়ে ধরো তোমার প্রেমিককে। শুরু হোক তোমাদের ছুঁয়ে থাকার মুহূর্ত।”

© গণেশ ঢোল
২২-০৫-২২

*********

Sahityika Admin

Add comment