এ্যান্টারটিকা অভিযানে দুই বিক্কলেজিয়ান (তৃতীয় পর্ব)
© দীপ্ত প্রতিম মল্লিক, ১৯৮০ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
আগের পর্বের লিংক
২৬ ডিসেম্বর ২০২৩- এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড
ভোরবেলায় ঘুম ভাঙ্গল। কেবিনের পর্দাটা পুরোটা টানা হয় নি সেই ফাঁক দিয়ে আলো আসছে। দীপা উঠে পর্দা টানতে গিয়ে বলল, আরে, দেখে যাও, সামনে গাদা গাদা বরফের পাহাড়। তবে কি এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড চলে এল? তড়াক করে উঠে পড়লাম। অনেক ঘুম হয়েছে ক দিন-এবার ওঠ যাক। এ জিনিষ তো আর কোনোদিন পাব না। ঘড়ি দেখলাম- তখন বাজে রাত সাড়ে তিনটে। মাঝরাতেই তাহলে সূর্য উঠেছে! তা উঠুক- দেখলাম এখনও ঐ বরফ মন্ডিত পর্বতশ্রেণী থেকে বেশ খানিক দূরে আছি। জাহাজ ধীর গতিতে এগুচ্ছে। দেখতে পাচ্ছি সমুদ্রর জলের মাঝে অজস্র ছোট ছোট বরফ কুচি ভাসছে- আর সূর্যর আলো পড়ে তা রূপোর মত ঝকঝক করছে। পাহাড়ের গ্লেসিয়ার থেকে বরফ মাঝে মাঝেই ভেঙ্গে পড়ছে আর জোরালো ঢেউতে তার অনেকটাই টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।

এই Elephant Island নামকরণের কারণ উইকিপিডিয়াতে পেলাম, attributed to both its elephant head-like appearance and the sighting of elephant seals by Captain George Powell in 1821, one of the earliest sightings.
Chinstrap Penguins and Antarctic Fur Seals at Point Wild Elephant
ভাবলাম, এই তালে চান টান করে তৈরী হওয়া যাক, পরে আর যদি সময় না পাই? ভোর পাঁচটায় দু’জনে বেরুলাম। ইতিমধ্যে ঘন্টাদারাও উঠে পড়েছে। বলল, তোরা যা, ডেক ষোলোতে থাকিস, আমরা জলদি জলদি বেরুচ্ছি।
জাহাজে ওঠার পর কদিন ধরে আমরা একটা মিনি রিসার্চ চালিয়েছি যে কোথা থেকে এ্যান্টারটিকা দেখা সবচেয়ে সুবিধাজনক। ডেক সেভেনে চলবে না কেননা এখানে দুটো দিক বা সামনেটা একসাথে পাওয়া যাবে না। একমাত্র ডেক ষোলো বা পনেরো আমাদের মতে শ্রেষ্ঠ। ডেক ষোলো মানে একদম ওপরে- চারপাশ খোলা- সামনে পিছনে সব জায়গায় দেখা যাবে। কিন্তু এটা জাহাজের অর্ধেক অংশে আছে মাত্র। বাকি অর্ধেকে ডেক ষোলো নেই। তার চেয়ে ডেক পনেরো অনেকাংশে ভালো। এটার অধিকাংশ খোলা- সামনে পিছনে ও দু ধারের অনেকটাই একসাথে পাওয়া যায়। ঠান্ডা লাগলে চট করে দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে যাওয়া যায়। পুরো জাহাজটা হীটেড, ফলে তাপে শরীরের আরাম পাওয়া যায়।
আমরা লিফটে করে চলে এলাম ডেক পনেরো, ওখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে টপ ডেক মানে ডেক ষোলোতে। দেখি তখনই অনেকে দাঁড়িয়ে। অধিকাংশই চীনা, এরা কি ঘুমায় না, না কি? দূরে এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড দেখা যাচ্ছে, জাহাজ ধীরে ধীরে ওদিকেই যাচ্ছে। প্রবল ঠান্ডা হাওয়া, তাপমাত্রা এক ডিগ্রী হলেও হাওয়ার তেজে তা মাইনাস ছয় সাতের মতো লাগছে।
আমরা এখন এ্যান্টারটিক পেনিনসুলাতে ঢুকছি। বলা যায় বরফের রাজ্যে ঢুকলাম। এখানে প্রকৃতি বড়ো কঠোর। এই পেনিনসুলায় আছে বিভিন্ন দ্বীপ আর এই পেনিনসুলা দিয়ে আরো তিনশো নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে গেলে আমরা দেখতে পাব মূল ভূখন্ড। মানুষের যা কিছু কাজ কারবার সবই এই পেনিনসুলার দ্বীপগুলির থেকে। মূল ভূখন্ডে যাওয়া বেশ শক্ত ও বিপদজনক কেননা সমুদ্রর ধার থেকেই হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড় একদম সমুদ্রর ধার ঘেঁসে উঠে গেছে। ফলে ঐ ভূখন্ডে পা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তা ছাড়া তাপমাত্রা হিমাঙ্কের বহু নীচে। আছে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আর গ্লেসিয়ার থেকে প্রতিনিয়ত খসে পড়া বরফের ভয়। তাই প্রায় সবার যাত্রা পথ সীমাবদ্ধ থাকে এই দ্বীপপুঞ্জেই। আমদের জাহাজ এই সব দ্বীপগুলোকেই প্রদক্ষিণ করবে যাতে সবাই ভালোভাবে দেখতে পায়।

ভাবছিলাম এই দ্বীপের কথা। ১৮২০ সালে প্রথম এই দ্বীপ মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়, তখনও ম্যাপে বা চার্টে ছিলো না এর কোনো অস্তিত্ব। পরের বছর, ১৮২১ সালে রাশিয়ানরা একে চার্টে আনে।

এখনও পর্যন্ত এই দ্বীপে দুখানি ঐতিহাসিক মনুমেন্ট বানানো হয়েছে। প্রথমটি হল স্যাকলটনের সহযোগী লুইস পারদোর (Luis Pardo) আবক্ষ মূর্তি যেটাকে এনডুয়রেন্স মেমোরিয়াল সাইট বলে একটি জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অপরটি গড়ে উঠেছে এস এস হ্যাম্পটন বলে এক বিরাট কাঠের জাহাজের ধবংসাবশেষের ওপর। এখানে ১৯৭০/৭১ সালে ছ মাস ধরে একসপিডিশন হয়েছিল, তখন এই দ্বীপের অনেকগুলি চূড়াতে মানুষ ওঠে।
সকাল সাতটা বাজে, জাহাজ এখন এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডের একদম কাছে। মাঝে মাঝেই আইসবার্গ দেখা যাচ্ছে।


জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলো। চারদিক নিশ্চুপ, চোখের সামনে তুষারে মোড়া পাহাড় আর পাহাড়। শুধু ক্যামেরার শাটার পড়ার ক্লিক ক্লিক শব্দ ভেসে আসছে। প্রবল হাওয়া –ডেক ষোলোতে ঠকঠক করে কাঁপছি। আবার এই সৌন্দর্য ছেড়ে যেতেও পারছি না। চারদিকে শুধু বরফের রাজ্য। অজস্র গ্লেসিয়ার চারপাশে- নীল বরফে মোড়া। মাঝে মাঝে তার চূড়ো থেকে এক এক চাঁই বরফের টুকরো ভেঙ্গে পড়ছে বিকট শব্দে। সাড়ে আটটায়, শরীর যখন প্রায় অসাড়- গ্লাভস, টুপি দিয়ে আর ঠান্ডা আটকানো যাচ্ছে না, ভাবছি নীচে নামি, এমন সময় ঘোষণা- জাহাজ আবার চালু হচ্ছে। আমরা দ্বীপটা এবার ঘুরব, এপাশ থেকে অন্য ধারে যাবো আর ফিরব উল্টোমুখে- যাতে জাহাজের দুটো দিকের লোকেরাই দ্বীপ দেখতে পায়।
জাহাজ চলতে শুরু করল, ওপরের ডেকে লোক আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে, এই ঠান্ডা একটানা সহ্য করা বেশ শক্ত। আমরা নেমে এলাম ডেক পনেরোতে। একটু ভিতরে গিয়ে গা গরম করে আবার বাইরে এলাম। এখন স্টারবোর্ডের দিক থেকে আইল্যান্ড পুরো দৃশ্যমান। দেখছি অজস্র বরফ সমুদ্রর জলে ভেসে আসছে। গাদ গাদা আইসবার্গও দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। এর মধ্যে কয়েকটা আইসবার্গে পেঙ্গুইন বসে আছে। এই পেঙ্গুইনগুলো চিন স্ট্রাপ মানে সবার গায়ে সাদা দাগ আছে।
বেলা দশটা বাজল। আবার ঘোষণা- জাহাজ এবাব ফিরবে আর এবার পোর্ট সাইড থেকে এলিফ্যান্ট আইল্যন্ড দেখা যাবে। শুনে ঘন্টাদা বলল, এই ফাঁকে জলখাবারটা খেয়ে নিই। অনিবৌদি বলল, তার চেয়ে এক কাজ করি। জলখাবার নিয়ে আমরা ঘরে চলে যাই, ব্যালকনিতে বসে খাওয়া যাবে আবার আইল্যান্ডও দেখা যাবে।
আমরা তড়িঘড়ি ওয়ার্ল্ড ফুডে গিয়ে কিছু ভেজানো মুসেলি, কেক ও ডিম নিয়ে এলাম আমাদের দশতলার কেবিনে। ব্যালকনিতে চিয়ার টেবিল লাগানোই থাকে। দেখি আকাশ এখন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে, নীল আকাশ উঁকি মারছে, ভাবতে পারি নি, এখানে নীল আকাশ আর পরিষ্কার আবহাওয়া পাবো।
জমিয়ে বসে খাচ্ছি আর দু চোখ ভরে প্রকৃতি দেখছি। এবার মনে হচ্ছে পাহাড়গুলো যেন আমাদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, যেন হাত বাড়ালে ছুঁতে পারি। মাঝে মাঝে দু তিনটে তিমি মাছে ফোয়ারা উড়িয়ে চলে যাচ্ছে, পেঙ্গুইন তো আছেই, যেন ওরা আইসবার্গের পাহারাদার। দশটা থেকে এগারোটা চলল এই বরফের রাজ্যের পাশ দিয়ে যাওয়া। যেতে যেতে কখন যে দ্বীপ শেষ হল, জানতেই পারলাম না। খেয়াল যখন হল, দেখি দ্বীপ নেই, শুধুই চারদিকে আইসবার্গ।

এগুলো আইল্যান্ডের গ্লেসিয়ার থেকে ঝরে জলে পড়েছে। ছোটগুলো ভেসে যাচ্ছে আর বড়োগুলো যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে।

বেলা সাড়ে এগারোটায় এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড দেখা শেষ। আবার এসে পড়েছি খোলা সমুদ্রে। ঘোষণা হল, আমরা যে এই দ্বীপটি দেখলাম, আশা করি সবাই ভালোভাবে দেখেছেন। এবার আমরা যাব ১০০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে, যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো আইসবার্গ, যার এরিয়া ৩৯০০ বর্গ কিলোমিটার, আকারে বলা যায় ২ খানা লন্ডন বা ২০ খানা কলকাতা শহরের জায়গা নিয়ে আছে। এই আইসবার্গ ১৯৮৬ সাল থেকে এক জায়গায় স্থির হয়ে ছিল, কিন্তু আজ এত বছর পর এটা আবার নড়েছে আর সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে। এই চলমান হওয়ার প্রধান কারণ- গ্লোবাল ওয়ারমিংতে কিছু বরফ গলেছে, ফলে আইসবার্গ একদিকে যেমন কিছুটা হালকা হয়েছে, অপরদিকে খানিকটা বন্ধন মুক্ত হয়েছে।
জাহাজ এগিয়ে চলেছে। অজস্র আইসবার্গ আনাচে, কানাচে, অজস্র কুচো বরফ ভাসছে এদিক ওদিক। এই ফাঁকে লাঞ্চ খেয়ে এলাম। দুপুরে অলসভাবে কেবিনের ব্যালকনিতে বসে থাকা। কিন্তু এখন এত ঠান্ডা যে বেশীক্ষণ একটানা থাকা যাচ্ছে না। আধ ঘন্টা বসছি তো পরের আধ ঘন্টা ঘরে বসে গা গরম করছি। এই করে ক্রমে বিকাল হল।
বিকাল পাঁচটা নাগাদ ঘোষণা হল – বিশাল আইসবার্গ, যার পোষাকি নাম A23a, তার কাছাকাছি আমরা চলে এসেছি। অতএব আবার জাব্বা জোব্বা পরে বেরুলাম বাইরে। বাইরে প্রবল হাওয়া, কাজেই ডেক ষোলোতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না- ডেক পনেরোতে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে বিশাল আইসবার্গ এগিয়ে আসছে- যেন কেউ সমুদ্রতে পাঁচিল তুলে দিয়েছে। এ যেন এক বরফের দেওয়াল, উচ্চতা ১৩০০ ফুট কিন্তু অনেকটাই জলের তলায়। জাহাজ এর পাশ দিয়ে চলেছে – বরফের পাঁচিল-ও চলেছে তো চলেছেই- তা হবে কেননা এর দৈর্ঘ চল্লিশ পঞ্চাশ মাইল তো হবেই। আমরা খানিকক্ষণ এই বিশাল বরফের চাঁই দেখলাম- সৌন্দর্য নেই, বিশালতা আছে শুধু। জাহাজ দু ঘন্টা ধরে এর পাশাপাশি চলল, এর থেকে অনুমান করা যায় এর বিশালতা। সাতটা বাজলে নীচে গেলাম, তখনও আইসবার্গ চলছে। আটটায় খেতে গেলাম, তখন ঘোষণা হল, আমরা এডমিরাল বে দিয়ে কিং জর্জ আইল্যান্ডের দিকে চলেছি। কাল সকালে কিং জর্জ আইল্যান্ডে পৌছে যাব।

২৭ ডিসেম্বর ২০২৩- কিং জর্জ আইল্যান্ড

আবার ভোরবেলায় ওঠা। কাল প্রায় সারারাতই দিনের আলো ছিল। কাজেই আলাদা করে দিন রাতের ফারাক বুঝতে গেলে সম্বল ঘড়ি। তবে আজ আর কালকের মত মাঝরাতে উঠিনি। তার বদলে ভোর ছ টায় উঠলাম। দেখি জাহাজ চলছে তখনও। আমাদের পোর্ট সাইডের দিকে দেখছি দূরে সাদা বরফওলা আইসবার্গ। আর দূরে আবছা মত দেখা যাচ্ছে অজস্র ছোট ছোট দ্বীপ। আমরা চলেছি এ্যাডমিরাল বে-র দিকে –ওখান দিয়ে জাহাজ ঢুকবে কিং জর্জ আইল্যান্ডের পথে।
কিং জর্জ আইল্যান্ড বিরাট বড়ো- আয়তনে ১৩০০ বর্গ কিলোমিটার, এ্যান্টারটিকায় যতোগুলো এরকম দ্বীপ আছে, তার মধ্যে কিং জর্জ আইল্যান্ড সবচেয়ে বাসযোগ্য। ২০২৩ সালের গণনা অনুয়াযী এখানে ১৬৫০ জন মানুষ বাস করেন। এখানে বিভিন্ন দেশের রিসার্চ বেস ক্যাম্প আছে- যেগুলি প্রায় সারা বছরই খোলা থাকে ও কাজ হয়। এগুলি হলো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলে, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, পেরু, পোল্যান্ড, রাশিয়া, উরুগুয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এঁদের বিভিন্ন বেস ক্যাম্পের মধ্যে যোগাযোগের জন্য রাস্তাও বানানো আছে।

কিং জর্জ আইল্যান্ড চিনস্ট্রাপ পেঙ্গুইনের কলোনী। এখানে হাজার হাজার পেঙ্গুইনের বাস। মোদ্দা কথা, আমরা জানলাম যে কিং জর্জ আইল্যান্ড বাকি সব দ্বীপের থেকে সুযোগ সুবিধাতেও এক কদম এগিয়ে।
ঘন্টাদারাও ইতিমধ্যে উঠে গেছে। চারজনে জলখাবার খাচ্ছি- দেখছি একের পর এক আইসবার্গ যাচ্ছে। কাল এত আইসবার্গ দেখিনি। আটটা বাজলে আমরা খাওয়া সাঙ্গ করে ওপরে পনেরো তলার ডেকে এলাম। দেখি ডেকের ধারে ধারে অজস্র বরফ। কাল রাতে তার মানে স্নো ফল হয়েছে। জাহাজের কর্মীরা ডেকের ওপর থেকে তখনও বরফ সরাচ্ছে। বরফ জমে পিচ্ছিল পথে যাতে কেউ পড়ে না যায়। একজন ক্লিনারের সাথে কথা বললাম। সে বলল, এই এ্যান্টারটিকা ট্রিপে এটাই স্বাভাবিক। অনেক সময় এত বরফ পড়ে, যে সরাতে বহুক্ষণ লেগে যায়।
ততক্ষণে জাহাজ অনেকটা কাছে এসে গেছে। এটাও এক ধপধপে সাদা দ্বীপ, Admirality Bay। এখানে কিছু বাড়ি ঘরদোর দেখা যাচ্ছে। ততক্ষণে ট্যুর ম্যানেজার ক্যারলের ঘোষণা শুরু হয়েছে। জানলাম যে সামনে যেটা দেখছি সেটা হচ্ছে পোলিশ রিসার্চ ক্যাম্প, নাম The Henryk Arctowski Polish Antarctic Station, জানলাম এখানে গবেষণা হয় প্রধানত glaciology, geology, meteorology, biology, আর সম্প্রতি sustainable research in the demanding Antarctic environment.


তারপর যেটা বিরাট বাড়িটি দেখছি, তা হল রাশিয়ান। ১৯৬৮ সালে Bellingshausen Station নির্মান হয়। উনবিংশ শতাব্দীর রাশিয়ান ভৌগোলিক অভিযাত্রী (explorer) Fabion von Bellingshausen এর নামে এটির প্রতিষ্ঠা হয়। উদ্দ্যেশ্য biology, glaciology, and meteorology বিষয়ে গবেষণা। এরপর ২০০৪ সালে একটি রাশিয়ান Orthodox Church (Trinity Church) এর প্রতিষ্ঠা হয়। পৃথিবীর দক্ষিণভাগের প্রান্তে আন্টার্কটিকা অঞ্চলে এটি একটি অন্যতম স্থায়ী নির্মান (permanent structure) এবং সারা বছর এখানে একজন পাদ্রী ধর্ম যাজক থাকেন।
আচমকা পকেটের মোবাইলে টিং টিং আওয়াজ- অজস্র মেসেজ ঢোকার আওয়াজ। কি হল? আমরা এই পথে, বিশেষ করে বড়ো বড়ো শহরেও ইন্টারনেট পাই নি, এখানে এই সুদূর এ্যান্টারটিকায় কি করে ইন্টারনেট আসে? মোবাইল খুলে দেখি সত্যই তাই। ইন্টারনেট আছে আর ফোর জি, মানে ভালো কানেকশন। পরে জেনেছিলাম এখানে অনেক রিসার্চ সেন্টার থাকায় তাদের স্যাটেলাইট ডিস্কের মাধ্যমে এখানে ইন্টারনেট পাওয়া যায়। অতএব ঝটাঝট যার যা ফোনের করার করে নেওয়া যাক। অনেকদিন যোগযোগ বিহীন চলেছি। সুদূর ইংল্যান্ডের কলে আমি মেয়েকে ধরে ফেললাম। অনিবৌদি দিব্যি কলকাতায় ওনার মা-র সাথে কথা বলল। এইসব করতে করতে জাহাজ যে কখন দ্বীপের সামনে এসে গেছে জানি না।
দ্বীপের সামনের দিকে সব রিসার্চ ক্যাম্পগুলো দেখতে পাচ্ছি, জাহাজ সেগুলোর পাশ দিয়ে এগিয়ে চলল। এখন সামনে দেখতে পাচ্ছি বিরাট এক গ্লেসিয়ার। জাহাজ যতোদূর যেতে পারলো, সামনে এগুলো, তারপর গ্লেসিয়ারের একদম সামনে দাঁড় করালো, ইঞ্জিন বন্ধ করে। সামনে গ্লেসিয়ারের বিশালত্বময় রূপ, কোথো কোনো শব্দ নেই, শুধু নীল জল আর নীলাভ বরফ। সব মিলে কেমন যেন এক গা ছমছম অনুভূতি। দূরে আচমকা জলের মধ্যে কিছু নড়ছে দেখা গেলো, ভালো করে চেয়ে দেখি ওমা, এ তো এলিফ্যান্ট সীল। বেশ কটা সীল বিশ্রী মুখে তাকিয়ে আছে অবাক দৃষ্টিতে। আবার হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো ফটো তোলার।
দশটা পনেরো বাজে। দু ঘন্টা হয়ে গেলো এইখানে।
আজ আকাশ ঘন নীল। কাল রাত্রে তুষারপাতের ফলে আকাশ পরিষ্কার। তাপমাত্রা এখানে জিরো বা মাইনাস ওয়ান, কিন্তু হাওয়াটা নেই, ফলে কষ্ট কম। তাও হাত পা জমে গিয়েছিল, ঘন্টাদা বলল এবার পোর্ট সাইডে দ্বীপটা পড়বে, তাই চ, ঘরে যাই, আমাদের বারান্দা থেকে আরামে দেখা যাবে। কাজেই ফিরে এলাম দশতলায় -যে যার ঘরে।
বারন্দায় ডেক চেয়ারে বসলাম। টেবিলে রাখলাম ক্যামেরা, ওয়াইনের গ্লাস। প্রচন্ড ঠান্ডা, ফলে দু ঢোঁক ওয়াইনে শরীর একটু গরম হল। হঠাৎ পাশের বারান্দা থেকে ঘন্টাদা হেঁকে উঠল- আরে দেখ, এক ঝাঁক পেঙ্গুইন। ভালো করে চেয়ে দেখি সত্যিই তাই। পাড়ের কালো নুড়ির ওপর অজস্র পেঙ্গুইন। আশেপাশে যে দু একটা ছোট খাট পাথর জলের মধ্যে উঁকি মারছে, সেগুলোও পেঙ্গুইনে ভর্তি । এখন এদের ব্রিডিং এর সময়, ফলে পেঙ্গুইন প্রচুর। আরাম করে রোদে বসে পেঙ্গুইন দেখা হল।
জাহাজ দ্বীপের পাশে পাশে চলল, বেলা এগারোটা পর্যন্ত। তারপর জাহাজ আবার ঘুরল। এবার স্টারবোর্ডের দিকে দ্বীপ। যাতে সবাই দ্বীপটা ঠিকমতো দেখতে পায়, ক্যাপ্তেন তাই যতোটা পারেন ঐ অঞ্চলে জাহাজ চালিয়ে আবার ফিরতি পথ ধরেন। আমরা ঘর ছেড়ে এলাম সাততলার ডেকে স্টারবোর্ডের দিকে। আবার পেঙ্গুইনদের দেখা যাচ্ছে। এই সব দেখে বেলা বারোটা বাজল। এমন সময় ঘোষণা- জাহাজ এবার ঘুরবে। আবার দ্বীপের পাশ দিয়ে অনেকটা যাবে এ্যাডমিরাল বে দিয়ে। তারপর এই পথ ছেড়ে যাবে শার্লট বে র দিকে। সবাই যেন এই পথে নজর রাখে- কেননা আশেপাশে প্রচুর পেঙ্গুইন পাওয়া যাবে।
দীপা বলল, এই সুযোগে চলো, আমরা খেয়ে নিই। আবার তাই ওপরে এলাম। খাওয়া যথা-সম্ভব শীঘ্র সাঙ্গ করে বসলাম সাত তলার ডেকে।
বেলা দুটোয় জাহাজ বে ছাড়িয়ে জাহাজ এলো খোলা সমুদ্রে। আজ আকাশ একেবারে পরিষ্কার, ফলে রোদ উঠেছে ভালোই। সেই রোদে আরামও লাগছে আবার ঠান্ডাও লাগছে। পথে প্রায়ই দেখছি এদিক ওদিক ফোয়ারা উঠছে, মানে তিমির ছড়াছড়ি এই অঞ্চলে। মাঝে মাঝে দু একটা সীল-ও দেখা যাচ্ছে। বিকাল বেলায় দুটো সাদা দ্বীপ পরপর পেরিয়ে গেলাম। প্রথমটি গ্রীনউইচ দ্বীপ ও পরেরটি লিভিংস্টোন দ্বীপ। এরপর শুধুই খোলা সমুদ্র, তবে দূরে দেখা যাচ্ছে এ্যান্টারটিকার মূল ভূখন্ড। ক্রমে সন্ধ্যা সাতটা বাজল।
শার্লট বে হচ্ছে এ্যাডমিরালটি বে থেকে ১৬২ নটিক্যাল মাইল, অনেকট রাস্তা। কাল সকাল সাতটার আগে জাহাজ পৌছাবে না। অনেকটা সময়। কাজেই খানিক ঘরে বিশ্রাম। তারপর নেমে ডাইনীং হলে খাওয়া ও ঘুম।

********






Add comment