সাহিত্যিকা

প্রভাকরের প্যাঁড়া

প্রভাকরের প্যাঁড়া
© দিলীপ কুমার চৌধুরী, ১৯৬৯ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

সেটি সম্ভবতঃ ২০০২ সাল। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছি। আর আমি পাশ করেছি ১৯৬৯ সালে, অর্থাৎ ৩২ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। আমি তখন আবাসন দপ্তরের অধীক্ষক বাস্তুকার (সুপারিণ্টেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার) পদে ছিলাম। অন্যান্য কাজের সংগে আমার একটা বাড়তি দায়িত্ব ছিল যে, কিছু জেলার সরকারী আবাসনগুলো কিরকম দেখভাল করা হচ্ছে, তা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা।

একবার আসানসোলে পর্যবেক্ষণ পড়ল। বেলাবেলি কাজ শেষ হয়ে যাবার পর হাতে কিছুটা সময় ছিল। কথা ছিল কাজ শেষে দুর্গাপুর ফিরে গিয়ে বাংলোয় রাত্রি যাপন। সংগী নির্বাহী বাস্তুকার ছেলেটি বলল, “স্যার তাড়াতাড়ি হয়ে গেল , হাতে কিছুটা সময় আছে। কাছেই কল্যাণেশ্বরী মন্দির। একবার যাবেন না কি ? ”

কল্যাণেশ্বরী? সেই কল্যাণেশ্বরী! মনটা ফ্ল্যাশব্যাকে চলে গেল ৩৫ বছর আগে ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে। আরে হ্যাঁ , ঐখানেই তো হয়েছিল আমাদের কলেজ জীবনের সিভিলের ৪র্থ বর্ষের সার্ভে ক্যাম্প। দিগন্তবিস্তৃত সেই” ভুবনডাঙ্গার মাঠ ” দুরের সিলুয়েটের মতন তার পূবের আকাশের গায়ে আঁকা পাঞ্চেত পাহাড় , পশ্চিমে অনতিদুরে মাইথন পাহাড়ের টিলা। এই মাঠেই সারি সারি তাঁবু পড়েছিল আমাদের সার্ভে ক্যাম্পের। উদ্দেশ্য এক ঢিলে দুই পাখী মারা। একদিকে যেমন ভাবী ইঞ্জিনিয়ারদের হাতে কলমে জরিপের কাজের শিক্ষা দেওয়া, অন্যদিকে তাদের এই মেঠো প্রকৃতির সংগে একটা পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

আমাদের কাজ ছিল পাবলিক হেল্থ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের প্রস্তাবিত রাণীগঞ্জ কয়লাখনি এলাকায় পানীয় জলের সরবরাহের প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জরিপের কাজ করা। সকাল বেলাতেই প্রাতঃকর্মাদি ও প্রাতরাশ সেরে এক একটি গ্রুপে যুক্ত হয়ে জরিপের কাজে মাঠে বেড়িয়ে পড়া হতো। সংগে নিয়ে যাওয়া শুকনো লাঞ্চ, যাত্রাপথেই সারা হয়ে যেত। ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা। ক্যাম্পে একটু চা স্ন্যাক্স্ খেয়ে সন্ধ্যা হলেই আমরা ঘুরঘুর করতাম অনতিদুরে সেই কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের প্রাঙ্গনে। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। প্রায়ান্ধকার গর্ভগৃহে জলের মধ্যে দেবী আসীন।

না ,না। ভক্তিভাব দেখানোর কোন ব্যাপার নেই। আমাদের যাওয়ার অন্য উদ্দেশ্য ছিল। মন্দির চত্বরে প্রভাকর নামে একটি বছর পঁচিশের এক যুবক ক্ষীরের প্যাঁড়া বিক্রি করতে বসত। কেমন ছিল সেই প্যাঁড়ার সাইজ? যেন প্রমাণ সাইজের লাল আটার একটা মোটা লেচি। মোষের দুধে তৈরী এই প্যাঁড়া খেতে যেমন সুস্বাদু ছিল, তেমনি শীতের রাতে বাড়তি ক্যালরি যোগাত এই প্যাঁড়া। হরিদ্বার , দেওঘর বা মথুরার বিখ্যাত প্যাঁড়ার নাম শোনা যায়। কিন্তু প্রভাকরের এই প্যাঁড়ার প্রচার সেরকম ছিল না।

ডিসেম্বর মাসের কনকনে ঠাণ্ডা। তখন তো আর বিশ্ব উষ্ণায়নের ব্যাপার স্যাপার ছিল না। তা ছাড়াও জায়গাটা ছিল ঝাড়খণ্ড সীমানার লাগোয়া। এই ঠাণ্ডার মোকাবিলায় রাতের ডিনারে থাকত গরম গরম রুটির সংগে দেশী মুরগীর কারি। তখনও ব্রয়লার মুরগীর চল হয়নি। চাঁদনি রাতে ক্যাম্পের কাছ থেকে মাইথনের টিলা, মনে হতো যেন এক মায়াবী অন্ধকার! আবার কৃষ্ণপক্ষের রাতে দুষণহীন নিকষ কালো আকাশের দিকে তাকালে দেখা যেত ঝাঁকে ঝাঁকে উজ্জ্বল তারা জ্বলজ্বল করছে। মনে হয় আকাশে কে যেন ঝলমলে হীরে জহরত সব ছড়িয়ে রেখেছে। এর আলোয় অন্ধকারে পথঘাট সব দেখা যাচ্ছে। এ দৃশ্য এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা, যা কোন শহরের ধোঁয়াটে আকাশের দেখা সম্ভব নয়।

ফিরে এলাম আবার এই সময়ে অর্থাৎ সেই আসানসোলে সেই সহকর্মীর সান্নিধ্যে। বললাম, চল তাহলে মন্দিরটা একবার ঘুরেই যাই। কিন্ত মনে কি তাই ছিল? ভাবছি, একবার যদি সেই প্রভাকরকে পাকড়াও করতে পারি তাহলে কেজি খানেক প্যাঁড়া কিনে বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে সবাই মিলে তার সদ্ব্যবহার করি।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক রকম! আসানসোলের জি. টি . রোড থেকে একটা রাজ্য সড়ক বেরিয়ে দক্ষিণে কল্যাণেশ্বরীর দিকে গেছে। কাছাকাছি আসতেই মনে এক ধাক্কা খেলাম। ডানদিকে তাকিয়ে দেখি, সেই মাইথনের টিলা আজও আছে। কিন্তু বামদিকে কোথায় সেই “দিগন্তবিস্তৃত ভুবনডাঙ্গার মাঠ”? তাকিয়ে দেখি , সে জায়গা জুড়ে অজস্র বাড়ী ঘর। শুনলাম, এ জায়গাতেই হয়েছে পাবলিক হেল্থ ইঞ্জিনিয়ারিং দপ্তরের ছোট বড়ো নানান অফিস, ডাকবাংলো, ইত্যাদি। অনতিদূরেই মন্দিরের সামনেটাও বদলেছে। জায়গাটা আগে ফাঁকা ফাঁকা ছিল। এখন দেখি সাইকেল রিক্সা, অটো, ছোটখাট কিছু দোকানের ভীড়ে জায়গাটা ঘিঞ্জি হয়ে গেছে।

যাই হোক পা চালিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করা গেল। ভেতরটাতেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। চাতালে মসৃণ টালি বসেছে। সেদিন আবার ঝাড়খণ্ডের দিক থেকে একটা নিম্নচাপ ঢুকে পড়েছে বাংলায়। সারাদিন গুঁড়ি গুঁড়ো বৃষ্টি। টালির ওপর হাঁটাই যেন মুশকিল। বেশ পেছল অবস্থা। এবার আমার আরও এক ধাক্কা খাওয়ার পালা। দেখি চাতালের ধারে সারি সারি প্যাঁড়ার দোকান। তখনও দিনের আলো আছে। কাঁচের শোকেসের ভেতর দিয়ে প্যাঁড়াগুলো দেখা যাচ্ছে। আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট পাতলা পাতলা ফ্যাকাশে রঙের প্যাঁড়া, যা সর্বত্র পাওয়া যায়। প্রভাকরের প্যাঁড়া কখনোই এরকম ছিল না। কিন্তু প্রভাকর কোথায় ? এক ছোকরা প্যাঁড়াওয়ালাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভায়া, এখানে বছর পঁইত্রিশ আগে প্রভাকর নামে এক প্যাঁড়াওয়ালা বসত, সে এখন কোথায় আছে ?”
“আরে”, উত্তরে সে হেসে বলল, “আমিই তো সেই প্রভাকর, বলুন কত কেজি প্যাঁড়া লাগবে?”
শুনে তো আমি অবাক ! বললাম , “তা কি করে হয় ? এখনতো তার বয়স ষাটের কোঠায়। তোমার মতন অল্প বয়স তো তার নয়। তুমি কি করে প্রভাকর হবে ?”
বাদানুবাদ শুনে আরেকজন যুবক প্যাঁড়াওয়ালা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল “কি হয়েছে?”।
সব শুনে বলল – “স্যার, আমিই প্রভাকর। আপনার প্যাঁড়া লাগবে? কতটা?”
এইভাবে আরও কয়েকজন এগিয়ে এল। প্যাঁড়া কেনা তো দুরের কথা! কার্য্যতঃ আমি এইসব নকল প্রভাকরের দ্বারা একরকম ঘেরাও হয়ে পড়লাম।

বলা বাহুল্য, সেদিন আমার প্রভাকরের প্যাঁড়া কেনা আর হলো না। সহকর্মীটির সহায়তায় অবশেষে সে স্থান ত্যাগ ও প্রত্যাবর্তন।
তা, নাইবা হোল কেনা। প্রভাকরের প্যাঁড়া আমার ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’! ‘স্মৃতি সততই সুখের’

[আজ থেকে বছর সতেরো আগে লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় পূর্ত ও পূর্ত (সড়ক) দপ্তরের “পথিক” নামের বাৎসরিক পত্রিকাতে। ঐ লেখাটি আবার পাঠালাম ঈষৎ পরিবর্তন সহ।]

*******

Sahityika Admin

Add comment