পাঁচি কাহন
@অনিরুদ্ধ রায়, ১৯৮৩ ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং
দীর্ঘ দিন টিউশনিকে পেশা হিসাবে চালাবার পরে ভাগ্যক্রমে এসএসসি তে উতরে গেলাম। মনে অনেক রঙিন স্বপ্ন ছিলো, বড় অফিসার হব। গত পাঁচ বছর অনেক কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দিলাম, কোথাও লাগাতে পারলাম না। স্বপ্ন যখন ভূমি ছুঁয়ে কঠিন বাস্তবের সাথে প্রাত্যহিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল তখন এই সেকেন্ডারি স্কুলমাস্টারের চাকরিটা পেয়ে সত্যি খুব আনন্দ হলো। হোক না ক্যানিং এর স্কুল, হোক না সাধারণ, সেখানেই আমি ভালো ছাত্র তৈরি করে দেখিয়ে দেবো।
আমাদের যাদবপুরের বাড়ি থেকেই যাতায়াত করে কর্মজীবন শুরু করলাম। দেখলাম সব টিচারই ডেইলি প্যাসেঞ্জার। স্কুলে শিক্ষক অপর্যাপ্ত, তাই প্রায় সবাই তিন চারটে করে বিষয় পড়ান। আমাকে ক্লাস টেনের ক্লাস টিচার করে দেওয়া হলো, আটান্ন জন ছাত্র। ক্লাস টেন এ আর নাইন এ আমার বিষয় অঙ্ক, সেভেন এ ইতিহাস, আর ক্লাস নাইনে আরেকটা আছে, কেমিস্ট্রি। কয়েকদিনেই বুঝে গেলাম যে দু’তিন জন ছাড়া বাকি ছাত্রদের পড়াশোনায় তেমন কোনো আগ্ৰহই নেই। আমি ছাত্রদের সাথে বন্ধুর মত মিশতে শুরু করলাম। এবং মনে হয় তাতেই ফল হলো। ছেলেরা আমাকে পছন্দ করছে, পড়ায় কম হলেও খানিক আগ্ৰহও বাড়ছে। বয়স্ক ও অভিজ্ঞ ভূগোল স্যার বিকাশবাবু বলল – শোনো হে, ছাত্রদের সঙ্গে বেশী মাখামাখি কোরো না। এতে ফল ভালো হবে না, টেবিলের এদিক আর ওদিকের অনেক তফাৎ। আমরা ওদের কাছে ছুঁচো, ব্যাঙ, বাঙাল, হিটু হয়েই আজীবন থাকব। আমি ইতিমধ্যেই জেনেছি যে বিকাশবাবু বছর দশেক আগে ছেলেদের সাথে ক্রিকেট ম্যাচ খেলার সময় বাউন্ডারি লাইনের কাছ থেকে বল ছুঁড়ে উইকেটে লাগিয়ে ক্যাপটেনকে রান আউট করে দিয়েছিলেন। এক হিটে সপাটে স্ট্যাম্প উখড়ে দিয়েছিলেন, সেই থেকে উনি ছাত্রদের কাছে হিটু নামেই পরিচিত।
আমি স্কুল ছুটির পরে স্পেশাল ক্লাস নেওয়া চালু করলাম। দেখলাম ছ’মাসের মধ্যে বেশীর ভাগ ছেলেরই অঙ্কতে আগ্ৰহ হলো। টেস্ট পরীক্ষায় সবাই পাশ করলো, খালি পরান ধর পাঁচ পাঁচটা সাবজেক্টে ফেল, ইংরাজি আর ভূগোল ছাড়া বাকি তিনটে সাইন্স সাবজেক্টেও গেঁড়িয়েছে। আমি ওর অঙ্ক খাতা দেখেছি, চারটে মাত্র অঙ্ক চেস্টা করেছে, তাও ভুল। নম্বর দেওয়ার জায়গাই রাখেনি। ছেলেটা ক্লাসেও রেগুলার আসে না। রেজাল্টের দিন ওর বিধবা মা এসে আমায় ধরে বসলো, পাশ করিয়ে দিতেই হবে। আমি বুঝিয়ে বললাম – এত খারাপ ফল করেছে, একবছর ভালো ভাবে পড়াশোনা করুক। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি, ভালো ভাবে পরের বছর মাধ্যমিক পাশ করে যাবে।
মহিলা তো কান্নাকাটি করে অস্থির, বলে – আমি অপারগ, আমি কোনো কথাই শুনতে চাই না, এতদিন দায়িত্ব নেন নি কেন? ও পাশ না করলে ভাশুর ওকে আর মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতেই দেবে না, দোকানে বসিয়ে দেবে।
আমি বলি, মা, শুনুন ওতো স্কুলেও আসতো না। বাকি যারা ক্লাস করত সবাই পাশ করে গেছে। পাঁচটা বিষয়ে ফেল করলে তো আর পাশ করানো যায় না?
উনি বলেন, আমি নিরক্ষর অতোসতো বুঝিনা, পাশ করাতেই হবে।
মায়ের মন, ছেলের জন্য কাঁদছে, আমার সত্যি খুব খারাপ লাগলো। বিকাশবাবুকে ব্যাপারটা বলাতে উনি বললেন, বুঝেছি, জোয়ান বিধবাটাকে তোমার মনে ধরেছে।
কী বিচ্ছিরি কথা? আজ বুঝতে পারছি, এই জন্যই নচ্ছারটাকে সবাই হিটু বলে। অগত্যা হেডস্যারকে গিয়ে অনুরোধ করলাম। স্যার যদিও আমাকে খুব স্নেহ করেন, কিন্তু স্রেফ বলে দিলেন- পাঁচ বিষয়ে ফেল করা ছাত্রকে টেস্টে এ্যালাউ করা কোনো ভাবেই সম্ভব না। ভদ্রমহিলাকে বললাম- মা, আপনি বাড়ি যান, আমি বিকেল বেলা আপনার বাড়িতে যাচ্ছি। আপনার ভাশুরকে থাকতে বলবেন।
ছুটির পর দেড় কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে ওদের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। বাড়ি আর দোকান একসাথেই। ভাশুর হলধরবাবু খাটো ধুতি পরে, গেঞ্জি গায়ে ভুঁড়ি বাগিয়ে মুড়ি চিবোতে চিবোতে আমাকে ডাকলেন। মাথার কুচকুচে কালো চুল, সামান্য খ্যাঁদা নাক, মোটা ঠোট, বেশ কদাকার দেখতে। আমাকে ভালো ভাবে মেপে নিয়ে বললেন – ফেল করা ছাত্রের বাড়িতে মিষ্টি খেতে এলে মাস্টার?
– দেখুন, ফেল এবার করলেও পরে আর করবে না। ওকে আর একটা সুযোগ দিন। আমি দায়িত্ব নেব।
– তা আমার মুদি দোকানটা কে দেখবে, আমারও তো বয়স হয়েছে?
– বিকেলে দোকান চালিয়ে সকালে স্কুল করুক না, একটু এডজাস্ট করলে পড়াশোনা টা চালাতে পারবে।
– এটা তোমার প্রথম চাকরি, কতটাকা মাইনে পাও?
খুব বাজে প্রশ্ন তাও জবাব দিলাম- তিরিশ হাজার পাই এখন।
– ওঃ পার্মানেন্ট চাকরি, আজকাল তো মাস্টারদের মাইনে অনেক ভালো! তা বাপু, তোমার বাড়ি কোথায় ? বড়িতে কে কে আছে?
– কোলকাতায় যাদবপুরে, মা বাবা আছেন।
– শোনো মাস্টার পরানকে স্কুল পাঠাতে পারি তবে তোমাকে আমারএকটা শর্তে রাজি হতে হবে, আমার মেয়ে পাঁচিকে তোমায় বিয়ে করতে হবে।
স্শালা কী খতরনাক হারামি বুড়ো! যে মোটা ট্যারা মেয়েটা আমায় নিয়ে এসে বসালো সেটাই নির্ঘাৎ পাঁচি। রাগে গা রি রি করে উঠলো, শালা বজ্জাত চুলে কলপ করে বয়স কমিয়েছে, কুৎসিত বুড়োটাকে বলেই দিলাম – আপনি তো মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন, আমি ছাত্রের উপকার করতে এসেছিলাম।
– আমিও তো তোমার উপকারই করতে চাইছি, তোমাকে কি আমার গোয়াল ঘর পরিস্কার করতে বলছি?
পাঁচিটা এই সময় জল মিষ্টি নিয়ে এল, আমি সটান উঠে দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
শীতের ছুটির পর স্কুল খুলেছে। এক শনিবার আমি এক্সট্রা ক্লাস করে বাড়ি ফিরছি, স্টেশনে দেখি শালোয়ার কামিজ পরা এক ঝকঝকে সুন্দরী ট্রেন থেকে নেমে আমার দিকে আসছে, কাছে এসে মিষ্টি হেসে আমাকে বলল- পরানকে পাশ করানোর মহান সংকল্প থেকে ফিরলেন কেন? পাঁচি যদি আপনাকে বিয়ে করতে রাজি না হয় তাহলে তো আর আপনার বিয়ে করার ভয় রইল না?
– আপনি?
– আমি আর পাঁচি হরিহর আত্মা, আমি বলে দিলে পাঁচি আপনাকে বিয়ে করবে না।
– আ আ আপনি এখানে থাকেন?
– আমি এখন তমলুকে থাকি, এখানে থাকলে হয়ত পরানটাকে একটু পড়া দেখিয়ে দিতে পারতাম, চলি।
আমি বিহ্বল, বাকরহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। বাড়ি ফিরে সারা রাত ঐ মেয়েটার কথা ভাবলাম – কী সপ্রতিভ, কী পরিস্কার উচ্চারণ, কী স্নিগ্ধ স্টাইল,কী মিষ্টি হাসি, ভীষণ সুন্দর। আমাদের যাদবপুরে কোন ছার, সারা কোলকাতাতেও এরকম মেয়ে সচরাচর পাওয়া যাবে না। আচ্ছা, আমি যদি পরানকে পড়াই তাহলে নিশ্চয় ওর খোঁজ পাব ?
সোমবারই পরানের জ্যাঠাকে গিয়ে বললাম- আমি আপনার শর্তে রাজি তবে বিয়ে ফিয়ের কোনো কথা পরানের মাধ্যমিকের আগে হবে না।
– ঠিক আছে, পাঁচিও এখন বিয়ে করবে না।
পরান স্কুলে আসে। আমিও বিকেলে প্রায়ই ওদের মুদি দোকানের দাওয়ায় বসে পড়িয়ে আসি। আগে টিউশনি করার অভিজ্ঞতার জন্য আমি মাধ্যমিক অবধি সব সাবজেক্টই পড়াতে পারি। আমার অধীনে পরান আস্তে আস্তে পড়াশোনায় অনেক উন্নতি করল। কিন্তু ভয়ানক হাঁদা টাইপ, কিছুতেই ওর কাছ থেকে ঐ মেয়ের কোনো খোঁজ পাই না। এমনিতেই জেঠু সবসময় সামনে বসে দোকান চালায়। একদিন সুযোগ পেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলাম – তোমার দিদির বন্ধু যে তমলুকে থাকে, সে আসে না?
– মলি’দি তো সেই দোলের আগে দিদির কাছে এসেছিল, পূর্ণিমার সত্যনারায়ন পুজোর পরে চলে গেছে।
– তমলুকে কোথায় থাকে জানো?
– না তো! তবে জ্যাঠা নিশ্চয়ই জানে।
– না, না না, জেঠ্যাকে জিজ্ঞেস করতে হবে না।
আমি পড়িয়ে যাচ্ছি, আমার ছাত্রেরও উন্নতি হচ্ছে, যা বলি করার চেষ্টা করে।
একদিন স্টেশনে দেখি সেই আমার স্বপ্নের মলি নীল শাড়ি পড়ে রিক্শা করে পরানের জ্যাঠার সাথে যাচ্ছে। চোখা চোখি হোলো, মিষ্টি হাসল, ব্যাস ঐ অবধি। ওখানেই শুরু, ওখানেই শেষ। শুধুই ক্ষনিকের চাক্ষুষ আনন্দ। আঃ নীল শাড়ি, হলুদ ব্লাউজ, এত ম্যাচিং? কাউকে এতো সুন্দর লাগতে পারে এই সাধারণ বেশে? ক্যানিং এর মতো ছোট্টো জায়গায় এরকম মেয়ে আসে, আর ঐরকম কদাকার একটা লোকের পাশে রিক্শায় বসে যায়?
পরান এবার টেস্টে ভালো ফল করলো। মাধ্যমিকে সবাইকে অবাক করে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করলো। আরো আট’জন আমাদের স্কুল থেকে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করলো, স্কুলের রেজাল্ট এবার বেশ ভালো, সবাই খুশি। পরানের মা এসে আমার হাত ধরে বললো- বাবা, তোমার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ, আজ বিকেলে আমাদের বাড়িতে একবার এসো বাবা।
পরানদের বৈঠকখানায় বসে ওর জ্যাঠা গম্ভীরস্বরে বললো- তুমি তো অসাধ্য সাধন করলে হে, পাঁচিও এখানকার গার্লস স্কুলে বদলির অর্ডার পেয়ে গেছে। তা, এবার তো তোমায় বিয়ের কথাটা ভাবতে হয়। মুখ তুলে চমকে উঠলাম। দেখি হাতে মিষ্টির থালা নিয়ে মলি ঘরে ঢুকছে। আমার হার্ট বিট রাজধানীর এক্সপ্রেসের থেকেও দ্রুত, হঠাৎ বন্ধ না হয়ে যায়! জ্যাঠা বললো – পাঁচি মা, এই ছেলেটা আমার মন কেড়েছে। তোর জন্যই একে ভেবেছি , তোর মত হলে —
আমার স্বপ্ন সুন্দরী হেসে বললো – পরানকে যখন ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করিয়েছে ,তখন একটু সিরিয়াসলি তো ভাবতেই হবে, দেখি….?
আমি বোধহয় অজ্ঞানই হয়ে যাব, তাও মুখ দিয়ে বেরোলো – ঐ ট্যারা মত মহিলাটি পাঁচি নয়?
জেঠু বলল – ও কেন পাঁচি হবে ? ও তো আমার পিসতুতো বোন বুঁচি, আমাদের সাথেই থাকে।
আমি আর পাঁচি এখন একসাথে ক্যানিং এ থাকি, ভারী ভালো জায়গা এটা।
পাঁচির ইচ্ছায় আমাকে যদিও প্রতি রোববার ওদের গোয়াল ঘর পরিস্কারের তদারকি করতে হয়।
আর আমি এখন ছাত্র মহলে জামাই স্যার হিসাবে পরিচিত।
বাকি সব ঠিক আছে।।
ভালো গল্প।
🙏🏼🩷🙏🏼