সাহিত্যিকা

ইতালির এটা সেটা (প্রথম পর্ব)

ইতালির এটা সেটা (প্রথম পর্ব)
© অঙ্কিতা মজুমদার, ২০০৯ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইনিনিয়ারিং

২২ আগস্ট ২০২৩
বহুদিন, বহু বহুদিন হিথরো একা পড়ে আছে। লিখি না। লিখতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় লেখার নাই। শেষ পর্যন্ত আজকে ধরে বেঁধে নিজেকে লিখতে বসিয়েছি। হিজিবিজি, এটা সেটা। ইতালির গল্প।

ইতালির এটা সেটা
******************
সেই যবে থেকে ৬৪ খ্রীষ্টাব্দের রোম শহর পুড়ে যাওয়া আর সম্রাট নীরোর বীনা বাজানোর কথা পড়েছি, তবে থেকেই কৌতূহলের শুরু। তারপর গিয়ে ভাটিকান সিটি। দা ভিঞ্চি কোড পড়ার সময় মনে মনে সবটাই যেন দেখে নিলাম। কিছু কিছু জায়গার ছবি আমার মনে ইতিমধ্যেই আঁকা হয়ে আছে। পড়ে পড়েই। রোম তার ভেতর একটা। আর অন্য সব ছবি আঁকা জায়গার ভেতর বাংলাদেশ গিয়েছি একবার। এবার যখন ইউকে এলাম প্রথমে ভেবেছিলাম প্যারিস যাব, অভির আমাকে প্যারিস নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা অনেকদিনের। সেই যবে থেকে সে একা একা প্যারিস ঘুরতে গেছে। তারপর নেদারল্যান্ডস যাব, সেখানে সন্দীপ থাকে। গ্রিস যাব, এমনিই যাব আরকি!

এখানে এসে প্রথম বছর চরকি পাক খেয়ে ইউকে’র সব দেশ ছুঁয়ে ফেলে দ্বিতীয় বছর যখন ইউরোপ ভিসা পেলাম তখন আর সব প্ল্যান করে টরে গ্রিসটা বাদ চলে গেল। গ্রিসের খরচই আলাদা। তার বদলে ক্রুজ ট্রিপে গেলাম নরওয়ে আর এলো ইটালি। ইটালি শুনেই আমার লিস্টিতে রোম আর মিলান। আর অভির লিস্টে ফ্লোরেন্স, ন্যাপেলস। ওদিকে আবার ভেনিসটা একটু যাব না! এও কি হয়? এই করে করে তিন চারদিনের ট্রিপ একটা গোটা হপ্তা হয়ে গেল আর দেখতে দেখতে লিস্টি বড় হতে হতে তাতে মিলান, ভেনিস, ফ্লোরেন্স, রোম, ন্যাপেলস সব ঢুকে পড়ল। যাব এইবার চারজন। আমরা দুইজন আর তালহা দারা দুইজন।

প্যারিস গিয়ে বুঝেছি ইউরোপ যেতে গেলে অন্তত তিন মাস আগে থেকে বুক করতে হবে। ইউরোপ যাওয়ার ভিসা পাওয়া এখন বিশাল চাপ। ভিসার এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া আর বাঘের দুধ পাওয়া প্রায় সমগোত্রীয়। আর তার উপর আছে ফ্লাইট ভাড়া, হোটেল ভাড়া এবং অন্যান্য।

মে মাসেই আমাদের ফ্লাইট, হোটেল বুক করা সারা। তারপর আগষ্টের মধ্যে মিউজিয়াম আর অন্যান্য জায়গার টিকিট আর কিছু টুর। আমার জামাকাপড়ের প্ল্যানিং। সামারে ইটালি যাব, তাই ব্যাপারই আলাদা। যাওয়ার আগের সপ্তাহ অবধি এটা সেটা কেনার আর শেষ নাই। এরকম লুক চাই, ওরকম লুক চাই এইসব। বেশ অনেকদিন রাতে খাওয়ার পর দুইজনে বসে ইউটিউব ভিডিও দেখেছি কোথায় কোথায় যাওয়া যায় সেইসবের। তার ওপর এই ট্রিপ তো শুধুই ট্রিপ নয়। অভির বাড্ডে ট্রিপ। এইবার আমরা প্যারিস গেছিলাম আমাদের বিয়ের বাড্ডেতে। তখনই ঠিক করেছিলাম ইটালি যাব অভির জন্মদিনে। যে কোনো স্পেশাল দিনক্ষণ দেখে বেড়াতে গেলে আরো স্পেশাল হয়ে যায় বুঝি! মনের ভেতর সেই বিশেষ দিনটার সাথে বিশেষ কতগুলো জায়গাও জুড়ে যায়। বিশেষ কিছু স্মৃতি তৈরী হয়ে যায়।

শুক্রবার রাতেই সব প্যাক করে রেখেছি। স্ট্যানস্টেড এয়ারপোর্ট থেকে রবিবার ফ্লাইট। সকাল ১১:২৫। ফ্লাইট মিলান পৌঁছাবে দেড় ঘন্টায়, অথচ আমাদের এয়ারপোর্ট যেতেই চার ঘন্টা লেগে যাবে। ভোর মানে রাত সাড়ে তিনটায় সাউথ্যাম্পটন থেকে বাস। এখানেও আবার গল্প আছে। আমাদের ফ্লাইট রায়ান এয়ারওয়েজের। এই রায়ান এয়ারওয়েজ, ইজিজেট এরা সব সস্তার বিমান বলেই পরিচিত। টিকিট সস্তাই। কিন্তু সেই টিকিটে কেবল পিঠের ছোট্ট ব্যাগই নেওয়া যায়। একটু বড় টোট ব্যাগও নেওয়া যায় না। একটা ছোট্ট বাক্সমত জায়গায় যদি ব্যাগ আঁটে তবেই নিতে দেবে নাহলে একস্ট্রা টাকা দিতে হবে। এদিকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ বা ঐরকম একটু ভালো এয়ারলাইন্স এর টিকিটের হয় প্রচুর দাম নয়তো উল্টাপাল্টা সময়। অথচ ছয় সাতদিনের ট্রিপ তো আর একটা ছোট পিঠের ব্যাগে করা সম্ভব না। অগত্যা যাওয়া আসার একস্ট্রা তিরিশ তিরিশ কেজির লাগেজ কেনা হয়েছে। তারপরেও গত রাতে হ্যান্ড ব্যাগেজ রীতিমত ফিতে দিয়ে মেপেছি। আসলে এই রায়ান এয়ারের এত গল্প পড়ে ফেলেছি বিভিন্ন ব্লগে। আমি বাবা এয়ারপোর্টে এসে ঝামেলায় পড়ার ভেতর নাই। যদিও এত করেও ফেরার সময়কার ঝামেলা মোটেও এড়ানো যায়নি। সে গল্প যথা সময় বলব।

ছোট থেকেই ব্যাগ গোছানো শুরু হতেই বেড়ানো শুরু হয়ে যায়। আর এ তো আবার আমার ছবির শহর সব। অভির জন্মদিনে থাকব না বলে আসার আগের দিনই জন্মদিনের খাবার দাবার খাওয়া হয়ে গেছে আমাদের। শনিবার দুপুরে দু চারজন বন্ধুর সাথে বেশ কবজি ডুবিয়ে খাওয়া দাওয়া করার পর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় এমন ঘুম পাচ্ছে, ভাবলাম এমনিই তো রাত আড়াইটায় উঠতে হবে, ঘুম ভাঙবে না। আমার রাত বারোটা না বাজলে ঘুমই আসে না। তারপর আবার রাতদুপুরে উঠে পড়তে হবে এই চিন্তাতে তো আরোই ঘুম আসবে না। ভাবলাম তার চাইতে সন্ধেবেলা ঘুমিয়ে যাই, রাতে এগারোটা বারোটা নাগাদ উঠে খেয়ে দেয়ে চুল টুল স্ট্রেইট করে বেরিয়ে পড়ব। তবে ভাবলেই আর কবে কী হয়েছে!

গভীর ঘুমে মনের সুখে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নে একটা সুন্দর হোটেলে শুয়ে আছি। সাদা ধবধবে বিছানা। আমাদের সাথে আরো অনেকে বেড়াতে গেছে। তারা সবাই খেতে গেছে। এমনসময় কে যেন বলল, “অঙ্কিতা, ওঠ ওঠ।” স্বপ্নে উঠে দেখি অভি নাকি সিঙ্গারা খেতে চলে গেছে। আমি আর খুঁজেই পাই না। স্বপ্নে খুঁজতে খুঁজতে জেগে উঠে দেখি সত্যিই তো অভি নাই। পাশের ঘরে যাতে আমার ঘুম না ভাঙে তাই বিড়বিড় করে তালহা’দার সাথে ফোনে কথা বলছে। অতঃপর, ফোনাফুনি হল। আমরা আবার খানিক ঘুমানোর চেষ্টা চালালাম গান টান চালিয়ে। এদিকে ততক্ষণে আমি এতোই একসাইটেড যে ঘুমই আসছে না।
– কিরে, তুই তো রোমেও চলে যাচ্ছিস।
অভিটা বেশ মনের কথা বুঝে ফেলে কিন্তু!
– হ্যাঁ তো। রোম তো আমার মনে ছবির মত আঁকা। কিন্তু কখনো এটা ভাবিনি যে চলে যাব। আমি তো ভাবতেই পারছি না। আমার সেই কবে থেকে রোমের প্রতি টান।
– কবে থেকে?
– আরে সেই ছোটবেলা থেকে। প্রথম যখন রোম পুড়ছে পড়েছি। তারপর দা ভিঞ্চি কোডের সময় থেকে তো মনে ছবি পুরো গেঁথে গেছে।
– তাহলে দেখ তোর সব জায়গাই তো হয়ে গেল।
– আহা আরো তো নতুন নতুন ছবি তৈরী হবে। হবে না?
– তা হবে। কিন্তু এখন তো হল।

গদগদ চিত্তে এপাশ ওপাশ করছি আর ভাবছি কী কী হবে, কেমন লাগবে। ঠিক তখনি মনে হল যে দেখতে দেখতেই তো সাতদিন কেটে যাবে। একটু বুঝি দুঃখও হল। মানুষ কী অদ্ভুত প্রাণী না! যে মনখারাপ এখনো আসেই নি সেই মনখারাপ ভেবে নাকি দুঃখ হচ্ছে একটু একটু। ভাবা যায়!

রাত দেড়টায় খাবার খেয়ে – খাবার মানে কিন্তু ভাত, শাকভাজা আর মাছ, নেইল পেন্ট লাগিয়ে, চুল স্ট্রেইট করে (কেবল সামনের টুকু), বেশ কয়েকবার ব্যাগ চেক করে, অন্ধকার থাকতে থাকতে একটা লাল বড় ব্যাগ আর দুটো পিঠের ব্যাগ নিয়ে দুইজনে হেঁটে হেঁটে যখন বাস স্টপে এলাম তখনো বাস আসতে বেশ সময় বাকি।

প্রত্যাশিত সময়ের আধঘন্টা আগেই আমাদের বাস এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিয়েছে। আমাদের কাছে এখন চারঘন্টা সময়। স্ট্যানস্টেড অদ্ভুত একটা এয়ারপোর্ট। কোথাও কিছু নাই তার ভেতর হঠাৎ একটা সাদা সাদা এয়ারপোর্ট। যেখান থেকে প্রায় সত্তর শতাংশ রায়ান এয়ারের ফ্লাইটই ছাড়ে। অভি ঢুকতে ঢুকতেই বলেছে কলকাতা এয়ারপোর্ট। কিন্তু বাইরে থেকে কলকাতা এয়ারপোর্ট কত সুন্দর। এখানে ওপরে যাওয়ার চলন্ত সিঁড়িগুলোও কী নোংরা। অবশ্য ভেতরটা ভালোই। যেমন এখানে হয়। অনেক দোকান পাট, লোক লস্কর। লোক দেখতে আমার সবসময় ভালো লাগে। নানা রঙের, নানা ঢঙের লোক। নানান এক্সপ্রেশন। তার ভেতর এক লেবানিজ রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট সেরে যখন উঠলাম তখনও হাতে ঘন্টা দেড়েক সময় বাকি।

পুরো এয়ারপোর্টটাই আমায় কিরকম যেন শিয়ালদা স্টেশনের ফিল দিয়েছে। হুট করে একটা বোর্ডিং গেটের সামনে মানুষজন ভীড় করে দাঁড়িয়ে গেল। বোর্ডিং হল। আর এই প্রথম আমায় অবাক করে দেখি কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে প্লেন ধরতে হবে। ঠিক যেন শিয়ালদা ঠেকে লোকাল ট্রেন ধরছি। বেশ সাম্য প্রতিষ্ঠা হচ্ছে কিন্তু। ট্রেন আর বিমানের ফারাক ঘুচে যাচ্ছে। অন্তত অনুভূতিতে।

আমাদের সবার আলাদা আলাদা সিট। আমরা সিট সিলেক্টশনে পয়সা দিইনি কিনা! সুতরাং সিস্টেম নিজেদের ইচ্ছামতন সিট দিয়েছে। এদিকে অফলাইন কাউন্টারে মহিলা চেক ইন করলেন না। বললেন অনলাইনই করতে হবে। যদিও পরে আমি আর সাদাফ একসাথে বসতে পেয়েছি কারণ আরো দুইটা মেয়ে একসাথে ছিল যাদের আলাদা আলাদা সিট ঠিক, ঠিক আমাদের মত আর আমাদের পাশেই। তারাও মনে হয় পয়সা দিয়ে সিট কেনে নি। তারাই আমাদের একসাথে বসার প্রস্তাব দিলে আমরা অমনি লাফিয়ে পড়ে সেই অফার লুফে নিলাম।

অতঃপর।
ঝকঝকে নীল আকাশ আর সাদা তুলো তুলো মেঘের মাঠ ভেদ করে
একটা গোটা শহর, মাঠ, রাস্তা নিচে ফেলে।
আমরা চলে যাচ্ছি।

২৩ আগস্ট ২০২৬
দ্য লাস্ট সাপার
পরদিন ২৩ আগস্ট মিলানে মালপেনসা (Malpensa) এয়ারপোর্টে নামলাম। প্রসঙ্গত বলি, ইন্টারন্যাশনাল ডিরেক্ট ফ্লাইট কানেকশন ধরলে মালপেনসা এয়ারপোর্ট দুনিয়ার নবম স্থানে আছে। আর আকাশ পরিস্কার থাকলে এখান থেকে আল্পস ছবির মতন দেখা যায়।

ফ্লাইট যখন মিলানে যখন ল্যান্ড করছে, ততক্ষণে খিদেও পেয়ে গেছে। স্ট্যানস্টেড এয়ারপোর্টে সেই কোন সকালে ব্রেকফাস্ট করেছি। আর এখন বাজে পৌনে তিনটে। ইমিগ্রেশনেও বিশাল লাইন। সব শেষ করে যখন বেরোলাম তখন প্রায় সাড়ে তিনটে। প্রথমে আমাদের প্ল্যান ছিল পাবলিক ট্রান্সপোর্টে হোটেল যাওয়ার। এয়ারপোর্টেই আছে মালপেনসা এক্সপ্রেস, যা টার্মিনাল ১, টার্মিনাল ২ আর সিটি সেন্টারের সাথে কানেক্ট করে দেয়। এদিকে এতক্ষণ লাইন দিয়ে, খিদে পেটে, লটবহর সমেত ক্যাব নিয়ে হোটেলে চলে যাওয়াই ভালো মনে হল।

মিলান মালপেনসা এয়ারপোর্ট থেকে মিলান সিটি প্রায় ৬৫ কিলোমিটার রাস্তা। ক্যাবে ঘন্টাখানেক লাগে। আর ভাড়া এক। ১১০ ইউরো। গোল বাঁধল বিএনবিতে পৌঁছানোর পর। আমরা এয়ারপোর্টে কোনো টাকা তুলিনি। এতটা ভাড়া, ক্যাবে সাধারণত কার্ড নেয়। গন্তব্যে পৌঁছে জানা গেল যে কেবল ক্যাশ দিতে হবে চালক দাদাকে। তা তিনিই আবার গাড়ি চালিয়ে কাছের এক এটিএমে নিয়ে গেলেন। আমরা টাকা তুলে তাঁকে দেওয়াতে তিনি আবার হোটেলে পৌঁছে দিলেন। তবে, এর জন্য উনি আলাদা কোনো পয়সাও নিলেন না।

যে বাড়িতে থাকব সেটা ভারী অদ্ভুত। আমাদের দেশে বেশ গায়ে গায়ে লাগা অনেকগুলা বাড়ি আর বাড়িগুলায় এক একটা সরু সিঁড়ি উঠে গেছে যেমন প্রায়ই দেখা যায়, এই বাড়িও খানিকটা সেইরকম। আমাদের ঘর ক’তলায় জানি না। প্রথমে ভেবেছি লিফট নাই। এদিকে ঢাউস দুই ব্যাগ। তবে আমাদের ভুল প্রমাণ করে একটু সিঁড়ি ওঠার পরই এক লিফটের দেখা মিলল। লঝঝড়ে লিফট।

দুই ব্যাগ আর সঙ্গের দুই ছেলেকে লিফটে চড়িয়ে আমরা সিঁড়ি চড়ছি আর নিজেদের ঘর খুঁজছি। প্রত্যেক তলায় উঁকি মেরে দেখতে দেখতে আর হ্যালো বলতে বলতে একসময় তিন না চারতলা থেকে একজন বার হয়ে এলেন। জানা গেল তিনিই আমাদের বিএনবির মালিক। ভদ্রলোক শ্রীলংকার। দেখামাত্রই আমরা কোথাকার তাঁর জানা হয়ে গেছে। তারপর টাকা পয়সা দিয়ে খানিক এটা সেটা বকে তিনি যখন বিদায় নিলেন তখন ঘড়িতে বোধহয় সাড়ে চারটে।

আমাদের দ্য লাস্ট সাপারের টিকিট সাড়ে পাঁচটার। পৌঁছাতে হবে পাঁচটা পনেরোর ভিতর। এর মধ্যে খাওয়ার সময় হবে না। কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে পোশাক বদলে খিদে পেটেই সান্তা মারিয়া ডেল গ্রেজির দিকে হাঁটা (Santa Maria delle Grazie) লাগালাম।

এবার সেখানে পৌঁছে আমাদের কাজ গাইডকে খুঁজে বার করে তারপর হেডফোন সংগ্রহ করে অপেক্ষা। সাড়ে পাঁচটা বাজলে তবেই ঢোকা যাবে। আর ঢোকার আগে ব্যাগে জল, খাবার কিছু থাকলে তা ব্যাগসমেত জমা রেখে ভিতরে ঢোকার নিয়ম। আমরা সঙ্গের জল খানিক খেয়ে, খানিক ফেলে দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করে যখন ভিতরে ঢুকছি ততক্ষণে রোদে, গরমে, খিদেয় সব মিলিয়ে কাহিল অবস্থা। তার ওপর আমাদের গাইড দিদি অদ্ভুত একটানা সুরে ভনভনে মাছির মত কত কীই না বলে চলেছেন। সারারাত জেগে এসে তারপর সেই মুহুর্তে তাঁর এই একটানা সুর মাঝে মাঝেই ঘুমপাড়ানি গানের মত লাগছে। আর উচ্চারণের কথা নাই বা বললাম! ইংরেজি ভাষাটা যে এতখানি এলিয়েন মনে হতে পারে এনার সাথে দেখা না হলে ঠাহর হত না।

এখানে আবার আরেক গল্প। আমি সাধারণত মিউজিয়াম বা এরকম যে কোনো দ্রষ্টব্যের টিকিট তাদের অফিশিয়াল সাইট থেকেই কাটি। তাতে দাম অনেকটা কম পড়ে। ইটালি যাব ঠিক হওয়া থেকেই অভি বলেছে লাস্ট সাপারের টিকিট কাটতে। টিকিট নাকি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। সেই ভয়ে আমি সেই মে মাস থেকে টিকিট খুঁজছি। যখনই দেখছি, দেখি কেবল দুপুর ১:৪৫ এর স্লট পাওয়া যাচ্ছে। আর সব বুকড। এদিকে বিকেলের আগে আমরা তো পৌঁছাবোই না। শেষে যখন লাস্ট সাপারের টিকিট গেট ইওর গাইড থেকে কাটব কী কাটব না বলে দোনোমোনো করছি হঠাৎ অভি আবিষ্কার করে টিকিটের স্লট ছয় সপ্তাহ আগে খোলে। তাদের সাইটে স্পষ্ট লেখা। অথচ তাও আমি কেন টিকিট পেলাম না খুঁজতে গিয়ে দেখি, ও বাবা আমি তো এদের অফিশিয়াল সাইটেই কোনোদিন যাইনি! এও সম্ভব!

অগত্যা প্রায় তিন চারগুণ দাম দিয়ে গাইডেড ট্যুর নেওয়া। তাতে খুব একটা ক্ষতি অবশ্য হয়নি। বরং অনেক গল্প শোনা গেছে। এইখানে বলে রাখি ভিঞ্চি আসলে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির গ্রামের নাম। তাঁর নামের মানে আক্ষরিক অর্থেই ভিঞ্চির লিওনার্দো। ভিঞ্চি মিলানে ছিলেন সাত বছর। ফ্লোরেন্স থেকে তিনি মিলান আসেন। এখানকার ডিউক তাকে একখান ভিনিয়ার্ড দেন যেটা এখনো আছে। আমাদের যাওয়ার সময় হয়নি। ফাইনালি মিলান থেকে রোম হয়ে সেখানে বছর তিনেক থেকে তিনি বরাবরের মত ফ্রান্সে চলে যান। আমার জ্ঞানভান্ডার এখানে উজাড় করে দেওয়ার দুঃখিত কিন্ত মাত্র জেনেছি কিনা তাই না বলে পারলাম না। তবে হ্যাঁ, আমরা কিন্তু ভিঞ্চির পদচিহ্ন অনুসরণ করেছি খানিকটা। ওই একটু এদিক ওদিক করে।

ভেতরে ঢুকে একটা প্যাসেজের ভিতর দিয়ে খানিক হেঁটে যখন সেই বিখ্যাত ছবির ঘরে পৌঁছেছি, পেটের ভিতর দিব্যি গুড়গুড় টের পাচ্ছি। কী হতে চলেছে না জানা থাকলে উত্তেজনায় যেমনটা হয় আর কী! এই ছবিটা আসলে একটা ডাইনিং হলে রাখা। সেখানে দুটো আসল ডাইনিং টেবিলও আছে। আর ভিঞ্চির ছবিটা একদিকের দেওয়ালে করা যাতে মনে হয় সেটাও ওই ঘরেরই এক অংশ এবং যীশুখ্রীষ্ট সেখানে শিষ্যদের সাথে খেতে বসেছেন। এই কাজটি নাকি কমিশনড কাজ মানে অর্থের বিনিময়ে অন্যের জন্য করা। তখনকার দিনে ট্রেনডিং ফ্রেস্কোর কাজ করতে তেমন আগ্রহী ছিলেন না বলেই নাকি দ্য ভিঞ্চি এই ছবিটি আঁকেন। ছবিতে বহুবার রেস্টোরেশনের কাজ হয়েছে। এইটা টেম্পোরা পেইন্টে করা সরাসরি দেওয়ালের ওপর যা কিছুদিনেই আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছিল যে কারণে বিভিন্ন সময় একে আবার পেইন্ট করাতে হয়েছে।

অদ্ভুত ছবি! আমি তো ছবির বিশেষ কিছু বুঝি না। কিন্তু এই ছবিটি সম্পর্কে এত শুনেছি যে সামনে থেকে দেখে কিরকম একটা লাগছে বোঝাতে পারছি না। এই ছবিতে যীশুখ্রীষ্ট ঘোষণা করে দিয়েছেন যে তিনি জানেন তাঁর বারোজন শিষ্যর মধ্যে কোনো একজন তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চলেছে। আমাদের গাইড এই অবস্থায় ছবিটিতে প্রত্যেকের হাতের মুদ্রা এবং মুখের অভিব্যক্তি দেখিয়ে তারা কী ভাবছে তাও বুঝিয়ে দিলেন। যদিও এসবই হয়তো মানুষ নিজের মত করে ভেবে নিয়েছে। তবুও শুনতে ভালো লাগে। মনের ভেতর ছবি ভেসে ওঠে। মনে হয় আমিও ওখানেই বসে আছি। টেবিলের এককোণে।

ছবিতে আলোছায়ার অদ্ভুত খেলা। এমনভাবে যীশুর ওপর আলো পড়ছে যেন মনে হচ্ছে তাঁর মাথার চারপাশে একটা হ্যালো। জানতে পারলাম এই ঘরটির ছাদ নাকি একদা ট্রান্সপারেন্ট ছিল। তাই তো বোধহয় বললেন! মোদ্দা কথা ছাদ দিয়ে আলো আসত যাতে ছবির আলোছায়ার খেলা আরো স্পষ্ট হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র শক্তির বোমায় সব নষ্ট হয়ে যায়। আলো ঢোকার রাস্তাও, কারণ তারপরই ছাদ দেওয়াল সব নতুন করে তোলা হয়। ধ্বংসের একটা ছবিও দিলাম, ১৯৪৩ সালের যুদ্ধের সময় তোলা।

মানুষ যে কী অদ্ভুত প্রাণী। কী অপূর্ব সব সৃষ্টির সাথেই কী ভয়ানক সব ধ্বংসের দিকে ঝোঁক। খুব ছোটবেলায় নালন্দা গেছিলাম। খুব কিছু মনে নেই। খালি মনে আছে এক গাইড কাকু ছোট ছোট হোস্টেলের ঘরের মত পাথরের ছোট ছোট ঘর দেখিয়েছিলেন। ছাত্রাবাস। পাথরের ছোট ছোট চৌকি, ছোট ছোট টেবিল। সেই একটা আস্ত বিশ্ববিদ্যালয় কেমন ধ্বংস করে ফেলা হল। করল কারা! মানুষ! করল কেন! স্রেফ অন্যের চিহ্ন মিটিয়ে ফেলতে। একদল ক্ষমতায় আসে। নিজের ক্ষমতা জাহির করতে অতীতের সব সৃষ্টি ধ্বংস করে দিতে চায়। কেবল নিজের ক্ষমতার চিহ্ন রেখে যেতে চায়। অথচ আজকাল প্রায়ই মনে হয় আসলে কিছুর কোনো মানে নেই। ছোট থেকে অনেকগুলো চলে যাওয়া দেখতে দেখতে জীবনকে অপেক্ষা ছাড়া কিছুই মনে হয় না প্রায়ই। অথচ ক্ষমতার কী মোহ!

লাস্ট সাপার দেখে বার হওয়ার পর সটান বাস্তবে। যীশুর ডিনার দেখে খিদে আরো চাগার দিয়ে উঠছে। সামনে এক ট্রামের স্টপ। কারো শরীরেই আর হাঁটার ক্ষমতা নাই। দাঁড়ালাম ট্রামের জন্য। আমরা ডুওমোর স্টপে নামব। দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি। ট্রামের দেখা নাই। কী এক নোটিশ চিপকানো যার অক্ষরগুলা তো চিনি, অর্থ একবিন্দুও বোধগম্য হয় না। আমাদের এই করুণ অবস্থা দেখে মায়াবশতই বুঝি এক ভদ্রলোক এসে জানালেন এই স্টপ আজ বন্ধ। এখানে কোনো ট্রাম আসবে না। আর কী করা। আবার হাঁটা। নিজেদেরকে কোনোমতে টেনে নিয়ে চলা খাবারের কাছে। মাঝে গুগল দেখে অভি একটা ইয়াব্বড় বাসস্টপে নিয়ে এল। এখান থেকে আমাদের গন্তব্যের বাস পাওয়া যাবে। কতক্ষণ পরে বাস এল মনে নাই! কেবল মনে আছে অনন্তকাল অপেক্ষার পর বাসে উঠলাম।

(ক্রমশঃ)

*********

Sahityika Admin

Add comment