সাহিত্যিকা

কেঞ্জাকুড়া বাঁকুড়ার মুড়ির মেলা

কেঞ্জাকুড়া বাঁকুড়ার মুড়ির মেলা
© বিজিত কুমার রায়, ১৯৭৪ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

মুড়ির সঙ্গে রাঢ়বাংলার মানুষের ভালোবাসা চিরকালের। কিন্তু তাই বলে মুড়ি নিয়ে আস্ত একটা মেলা! শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। ফি বছর মাঘ মাসের ৪ তারিখে বাঁকুড়া কেঞ্জাকুড়ায় দ্বারকেশ্বর নদীর চরে বসে মুড়ির মেলা। তোয়াজ করে মুড়ি খাওয়ার জন্যই আশপাশের প্রায় ৫০-৬০টি গ্রামের মানুষ এসে জড়ো হন এখানে।

জেলার বাইরে দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে আসেন। কেঞ্জাকুড়ার এই মুড়ি মেলা ঘিরে এবারও মানুষের উন্মাদনা দেখা গেল। দিনভর মুড়িময় হলো দ্বারকেশ্বরের চর। কেমন হয় সেই মুড়ি-ভোজ? নদীর চরে বালির উপর গামছা পেতে পঞ্চব্যঞ্জন সহযোগে মাখা হয় বাড়ি থেকে বয়ে আনা পাহাড় প্রমাণ মুড়ি। সঙ্গে থাকে চপ, বেগুনি, শিঙাড়া, হরেকরকম চানাচুর। মুড়ি মাখা হয় পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, টমেটো, মটরশুঁটি, ধনেপাতা দিয়ে। অনেকে আবার মুড়ির সঙ্গে আলুর দম, ঘুগনিও খেতে পছন্দ করেন। কেউ কেউ ঝুলি ভরে নিয়ে আসেন নারকেল নাড়ুও। নদীর বালি সরিয়ে চুঁয়া কেটে বের করে আনা হয় জল। তার পর মুড়ি মাখিয়ে চলে দিব্যি খাওয়াদাওয়া। আত্মীয়-পরিজন, বন্ধুবান্ধব মিলে সেই মুড়ি চিবোতে চিবোতেই জমে ওঠে আড্ডা-হুল্লোড়। বর্তমান জমানা মেনে চলে সেলফির পালা।

মজার এই মেলার জন্মবৃত্তান্তও বেশ মজার। শহর থেকে ২০ কিমি দূরে বাঁকুড়া-১ ব্লকের মধ্যে পড়ে কেঞ্জাকুড়া গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দ্বারকেশ্বর নদীর পাড়েই সঞ্জীবনী মাতার আশ্রম। প্রাচীনকাল থেকে এই আশ্রমে প্রতিবছর মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে বসে হরিনাম সংকীর্ত্তনের আসর। চলে মাঘ মাসের ১ থেকে ৪ তারিখ পর্যন্ত।

শেষ দিনে অর্থাৎ ৪ মাঘ দ্বারকেশ্বরের চরে বসে মুড়ি মেলা। স্থানীয়রা জানান, আশ্রমটি একসময় ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা। সন্ধ্যার পর জঙ্গলের পথ দিয়ে বাড়ি ফিরতে ভয় করায় ভক্তরা রাত জেগে আশ্রমে বসেই হরিনাম শুনতেন। সঙ্গে করে পোঁটলা বেঁধে আনা মুড়ি-বাতাসা দু’বেলা খেতেন নদীর চরে বসে। সেই মুড়ি খাওয়ার রেওয়াজই ধীরে ধীরে মেলার চেহারা নিয়েছে দ্বারকেশ্বরকে সাক্ষী রেখে।

নদীর চরে হাজার হাজার মানুষ বসে মুড়ি খাচ্ছে! সঙ্গে চপ, সিঙাড়া, নাড়ু, জিলিপি, শশা, পেঁয়াজ, মটরশুঁটি, আলু সিদ্ধ, এইসব মিলিয়েই হয় মুড়ির মেলা। বিগত ২০০ বছর ধরে বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়া গ্রামের দারকেশ্বর নদীর চরে আয়োজিত হয়ে চলেছে এই উৎসব, নির্দিষ্ট করে মাঘ মাসের চতুর্থ দিন। দ্বারকেশ্বর নদীর চরে আছে সঞ্জীবনী মাতার মন্দিরে প্রতিবছর মকর সংক্রান্তির দিন হরিনামের আসর বসে। আর নতুন মাসের চতুর্থ দিন, অর্থাৎ ৪ঠা মাঘ এখানেই আয়োজিত হয় মুড়ি উৎসব। বেলার দিকে নরনারায়ণ সেবায় ঢল নামে অজস্র মানুষের।

প্রতি বছর এই উৎসবে যোগ দিতে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন স্রেফ মুড়ি উৎসবে অংশ নেবেন বলে। দ্বারকেশ্বর নদীর জলেই মুড়ি মাখিয়ে খাওয়া হয়। যদিও এর পিছনে একটি লোককথা আছে। মেলা কমিটির সদস্য প্রদীপ মোদক জানান, “আনুমানিক ২০০ বছর আগে মা সঞ্জীবনীর নাম সংকীর্তন শুনতে আসা দর্শনার্থীরা যোগাযোগের অভাবে নদীতেই রাত্রি যাপন করতেন। পরের দিন নদীর জলে মুড়ি ভিজিয়ে খেয়ে বাড়ি ফিরতেন। তখন থেকেই শুরু মুড়ি মেলার।”

শোনা যায় এই কেঞ্জাকুড়া মুড়ি মেলা চালু করেছিলেন এলাকার ভান্ডারবেড় গ্রামের জমিদার পরিবারের সন্ন্যাসী রায়কিশোর চট্টোপাধায়। জমিদার পরিবারে জন্ম হলেও তিনি যুবক বয়সেই সন্ন্যাস নিয়ে তীর্থক্ষেত্রে চলে যান। পরে জমিজমা নিয়ে অন্য ভাইদের মধ্যে বিরোধ শুরু হলে তাঁকে কয়েক দিনের জন্য ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তিনি শর্ত দিয়েছিলেন, ফিরে আসবেন কিন্তু কারও বাড়িতে তিনি থাকবেন না। তাঁর জন্য দ্বারকেশ্বর নদের তীরে বাড়ি বানিয়ে দিতে হবে। সেই বাড়িই এখন সঞ্জীবনী মন্দির। প্রতি বছর মাঘ মাসের ১ তারিখ মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে শুরু হয় নাম সংকীর্তন ও উৎসব। আর ৪ তারিখে শেষের দিনে হয় এই মুড়ি মেলা। আরও প্রচলিত আছে যে ‘চুয়া’ দিয়ে, অর্থাৎ বালি খুঁড়ে দ্বারকেশ্বর নদীর জল তুলে সেই জল দিয়ে মুড়ি মেখে খেলেই নাকি রোগব্যাধি সেরে যায়!

একসময় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার লোক জমায়েত হলে মানুষের এই ভিড় সামাল দেওয়া যেত না। সকলে সঞ্জীবনী মাতার ভোগও পেতেন না। বড় বড় সিমেন্টের চৌবাচ্চা তৈরি করে মাতার ভোগ খিচুড়ি রাখা হয় । সঙ্গে ভাজা আর তরকারি । লাইন দিয়ে মাটিতে বসে সবাই প্রসাদ পান ।

কিভাবে আসবেন এই মেলায়?
বাঁকুড়া থেকে কেঞ্জাকুড়া মুড়ি মেলায় আসতে গেলে আপনি প্রথমে বাস এ করে চলে আসতে হবে কেঞ্জাকুড়া, আর পুরুলিয়া বা আসানসোল থেকে আসতে হলে আপনাকে প্রথমে আসতে হবে ছাতনা। ছাতনা থেকে বাসে করে চলে আসুন কেঞ্জাকুড়া। কেঞ্জাকুড়া থেকে টোটো করে খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় সঞ্জীবনী আশ্রম ও মুড়ি মেলায়। বাঁকুড়া থেকে মুড়ি মেলায় দুরত্ব প্রায় ১৫ কিমি আর ছাতনা থেকে প্রায় ৭ কিমির মতো।
আমাদের গ্রাম বাংলায় কত যে বৈচিত্র লুকিয়ে সে আমরা আন্দাজই করতে পারি না।

ছবি ও কিছু তথ্য নেট থেকে আহরিত।

********

Sahityika Admin

Add comment