এ্যান্টারটিকা অভিযানে দুই বিক্কলেজিয়ান (চতুর্থ পর্ব)
@ দীপ্ত প্রতিম মল্লিক, ১৯৮০ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
২৮ ডিসেম্বর ২০২৩- শার্লট বে ও নেমিয়ার চ্যানেল
Charlotte Bay was discovered by Adrien de Gerlache during the 1897–99 Belgian Antarctic Expedition, and was named after the fiancée of his executive officer, Georges Lecointe. The glaciers surrounding the bay are named for aviation pioneers. At the head of the bay, Portal Point (this is a separate site) was the site of the Reclus Hut where Wally Herbert completed his traverse of the peninsula from Hope Bay by dog sled.
শার্লট বে হচ্ছে এ্যান্টারটিক পেনিনসুলার পশ্চিমে – দুধারে বিস্তীর্ণ দ্বীপপুঞ্জ আর তার পাশ দিয়ে চলেছে এই বে। অপর দিকে এ্যান্টারটিকার মূল ভূখন্ড। শার্লট বে বিখ্যাত, কেননা এখানে ছড়িয়ে আছে অজস্র গ্লেসিয়ার আর আইসবার্গ। জলের গভীরতা প্রচুর। হাম্পব্যাক তিমিদের প্রিয় জায়গা এটি। এখানে তিমি দেখার সুযোগ প্রচুর। এছাড়া সীল, পেঙ্গুইন এরা তো আছেই।
তখনও সকাল ছটা বাজে নি। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কি জানি কেন আজ একবারে মড়ার মত ঘুম হচ্ছিল, ঘুম ভাঙ্গল ঘন্টাদা ও অনি বৌদির সম্মিলিত ডাকে, পাশের ব্যালকনি থেকে – “ঐ যে, ঐ যে” শুনে- তড়াক করে আমরা দুজন উঠে গেলাম। ঘুম চোখে কম্বল গায়ে ক্যামেরা নিয়ে ব্যালকনিতে আসতেই বৌদি বলল, আরে সামনে দেখো- তিমির ছড়ছড়ি। দেখলাম জলে এদিক ওদিকে প্রচুর ফোয়ারা উঠছে আর তিমিরা ডিগবাজি খেয়ে উলটে যাচ্ছে। সবই বড়ো বড়ো হাম্প ব্যাক তিমি। আমাদের সামনে মুল ভূখণ্ড – সে যেন এক বরফের পাঁচিল, সোজা ওপরে উঠে গেছে। এখানে জাহাজ চালাতে প্রচুর অভিজ্ঞতা লাগে নিশ্চয়ই, কেননা ইতস্তত প্রচুর বড়ো বড়ো আইসবার্গ। তাদের সাথে সদা উপযুক্ত দূরত্ব রেখে চলা এক দুরুহ কাজ। আর সেটাই করে দেখাচ্ছেন আমাদের ক্যাপ্তেন ও তাঁদের ক্রু-রা।
হাতে সময় নেই। কোনো রকমে জামাকাপড়ের জোব্বা পরে ওপরে, মানে ডেক পনেরোতে উঠলাম। আজ দেখছি সামনেটা খুলে দিয়েছে। এখানে চারদিকে সুউচ্চ বরফের পাহাড়, হাওয়া অতোটা নেই, তার ওপর আকাশ পরিষ্কার- মাঝে মাঝে রোদের দেখা মিলছে। ক্রমে জাহাজ বরফের পর্বতশ্রেণীর একেবারে সামনে এলো। আবার ইঞ্জিন বন্ধ, ফলে আবার সেই নিস্তব্ধতা। এবার দেখছি মাঝে মাঝেই বোমা ফাটার মতো শব্দ করে গ্লেসিয়ার থেকে বরফ ভেঙ্গে সমুদ্রে পড়ছে। ঘন্টাদা এক মনে ছবি তুলছে আর বিড়বিড় করছে- গ্লোবাল ওয়ারমিং সব শেষ করে দিলো রে, আর ক-বছর পর সব বরফই গলে যাবে মনে হয়। অনি বৌদি দেখলাম এদিক ওদিক ঘুরছে – যেখানেই তিমি দেখছে, ছবি তুলছে।
আটটা প্রায় বাজল। জাহাজের ইঞ্জিন আবার চালু হয়ে জাহাজ আবার ঘুরছে। এবার যাবে অন্য একটা খাঁজের দিকে। প্রচুর আইসবার্গ ইতস্তত ছড়িয়ে আর কয়েকটায় পেঙ্গুইন বসে- তাদের কি লম্ফজম্প! পেঙ্গুইনের কারবার দেখতে দেখতেই দেখি এক দল তিমি। তাদের দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখি কিছু আইসবার্গ, এদের রঙ আবার সবুজ। নীল বরফ তো দেখেছি, সবুজ তো কোনোদিনও দেখিনি!
জাহাজ চলেছে শার্লট বে দিয়ে- মেনল্যান্ডের সমান্তরাল ভাবে- এবার চলেছে উইলহেলমিনা বে-র (Wilhelmina Bay) দিকে। প্রায় সাত নটিক্যাল মাইল রাস্তা এই উইলহেলমিনা বে। আমাদের জাহাজের লাগবে এক ঘন্টা। এই ফাঁকে জলখাবার খেয়ে নিলাম চারজনে।

এ্যান্টারটিকার মূল ভূখন্ডের সাথে সমান্তরাল ভাবে চলেছি, আর সেটা পড়েছে পোর্ট সাইডে। তাই আমরা ফিরে এলাম ঘরে, যে যার ব্যলকনিতে গরম কফি আর ক্যামেরা নিয়ে উপভোগ করছি প্রকৃতি। এখানে সব বরফের পাহাড়গুলো জল থেকে উঠে মেঘের মধ্যে হারিয়ে গেছে। চারদিকে অজস্র ছোট বড়ো মাঝারি সাইজের আইসবার্গ, তার মধ্যে অনেকগুলি সবুজ বরফের। ঘন্টাদা বলল, ওইগুলো নাকি কয়েক লক্ষ বছরের পুরানো, তাই সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে এই রূপ। আর এখানে তিমিরও যেন শেষ নেই। যেখানে সেখনে তিমি মাছ ভেসে উঠছে, জলের ফোয়ারা ছুঁড়ছে আর ল্যাজ উলটে ডুব মারছে। এছারা পেঙ্গুইনও অজস্র। কয়েকটা আইসবার্গে যেন পেঙ্গুইনের মেলা বসেছে।
আবার ঘোষণা ট্যুর ম্যানেজারের- এক ঝাঁক তিমি এদিকে এগিয়ে আসছে। পরবর্তী পনেরো মিনিটে দেখলাম বটে খান পাঁচ তিমির খেলা। ল্যাজ নেড়ে জল ফুস ফুস করে কোনাকুনিভাবে তারা জাহাজের গা ঘেঁসে চলে গেল। সবাই উত্তেজিত, ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দে কান পাতা দায়! এই তিমিগুলো যেন তাদের যা কিছু আছে, সেগুলো নিয়ে আমাদের শো দেখাতে মগ্ন। কখন যে ঐ তিমির ঝাঁক তাদের খেলা দেখিয়ে চলে গেল, হুঁস ফিরল টুর ম্যানেজারের ঘোষণায়- আমরা উইলহেলমিনা বে এসে গিয়েছি। তখন বাজে সকাল সাড়ে দশটা, আমরা ব্যালকনি ছেড়ে আবার এলাম পনেরোতলার ডেকে, উইলহেলমিনা বে ভালোভাবে দেখব বলে।

ওপরে যখন এলাম, তখন লেমায়ার (Lemair) চ্যানেল পার হচ্ছে। লেমায়ার চ্যানেল হচ্ছে সরু এক পথ, দুপাশে বরফের পাহাড়। সুর্যের আলোয় বা রাতের চাঁদের আলোতেও উজ্জ্বল দেখায়। আমাদের জাহাজ অনেক বড়ো, তাই ক্যাপ্তেন নিপুন হাতে ঐ সরু চ্যানেল পার হলেন, আমরা ঢুকলাম উইলহেলমিনা বে তে। এখানে দেখছি তিমির ছড়াছড়ি। যেদিকেই তাকাই বরফ, গ্লেসিয়ার আর তিমি। এখানে প্রচুর বাচ্চা তিমি দেখা গেল। হাম্বব্যাক তিমিরা এখানে আসে বাচ্চা দিতে আর এই জায়গাটা তাদের স্বর্গ রাজ্য। ঘন্টাখানেক ছিলাম উইলহেলমিনা বে তে, এত তিমি দেখলাম, সে আর বলার নয়, তিমির পর তিমি। কোথাও মা তিমি তার বাচ্চাকে নিয়ে চলেছে কোথাও বা এক ঝাঁক তিমি একসাথে। মাঝে মাঝেই আইসবার্গ আর পেঙ্গুইন। আর এক পাশে মূল ভূখন্ডের বরফের পাহাড় মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে।
বেলা একটায় এই বে ভ্রমণ সমাপ্ত। এবার জাহাজ ছুটলো আরো দক্ষিণে নেমিয়ার (Neumayer) চ্যানেলের দিকে, ২৩ নটিক্যাল মাইল, আসবে বিকাল পাঁচটা নাগাদ। আমরা এই ফাঁকে লাঞ্চ খেয়ে এলাম।
নেমিয়ার চ্যানেল হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে দক্ষিণের পথ। এখানে আমরা ৬৫ ডিগ্রী ল্যাটিচিউডে (সাউথ) আসব। এটাই হবে আমাদের সবচেয়ে দক্ষিণের যাত্রা। উত্তরে আমরা নরওয়েতে ৭১ ডিগ্রী নর্থতে গেছি। আর দক্ষিণে এটাই সর্বনিম্ন- এর নীচে নামা আর সম্ভব নয়, অন্তত আমাদের মত সাধারণ লোকেদের।

বিকালবেলা এসে গেলাম নেমিয়ার চ্যানেল। দক্ষিণ পশ্চিমের এই চ্যানেলের প্রবেশপথ প্রথম দেখেন এডুয়ার্ড ডলম্যন ( Eduard Dallman), ১৮৭৩-৭৪ সালের অভিযানে যিনি প্রথম এই চ্যানেলে ঢোকেন। এটা অনেকটা উলটানো “এস” এর মতো। এখানে ঢোকা আর বেরুনো এই বেঁকানো “এস” মার্কা পথে, ফলে এই পথে জাহাজ ঢোকাতে খুব পারদর্শীতার প্রযোজন। আমদের ক্যাপ্তেন সেই কঠিন কাজটাই করে দেখালেন। এখানকার বরফের চুড়াগুলো দেখলে আপনা থেকেই মাথা নত হয়ে আসে। ক্রমে জাহাজ এক জায়গায় এলো, যার চারিদিকেই সুউচ্চ তুষার শৃঙ্গ, মাঝে এক সরু বাঁকানো চ্যানেল দিয়ে আমরা এসেছি। সকালে যা যা দেখেছি অর্থাৎ পেঙ্গুইন,তিমি, সীল মাছ,বরফ শৃঙ্গ সব যেন এখানে একজোট হয়েছে। যেদিকেই তাকাই তিমি মাছের লেজ আর জলের ফোয়ারা। যে আইসবার্গই দেখি, পেঙ্গুইনরা দখল নিয়েছে। তাদের ক্যাচর ম্যাচর জাহাজের মৃদু আওয়াজ ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে।

এখন তীব্র ঠান্ডা আর মাঝে মাঝে ঝোড়ো হাওয়া যেন কাঁপিয়ে দিচ্ছে। দক্ষিণে যতদূর যাওয়া যায়, এসেছি। রাত আটটা বাজলে জাহাজ ক্রমে নেমিয়র চ্যানেলের বের হবার সরু প্যাসেজে চলে এল। দেখলাম বটে ক্যাপ্টেনের কেরামতি। জাহাজের দু পাশে সুউচ্চ বরফের পাহাড়, এত কাছে যে মনে হচ্ছে এই বুঝি জাহাজের গা ঠেকল পাহাড়ে। কিন্তু না, জাহাজ ওই শীর্ণকায় পথ দিয়ে সঠিক পথে বেরিয়ে এল। এবার উত্তর পূর্ব দিকে যাওয়ার পালা। আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল ডিসেপশন (Deception point) পয়েন্ট। যেটা এখান থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের রাস্তা। জাহাজ সারারাত চলে কাল সকালে আসবে ডিসেপশন পয়েন্ট।
ঠান্ডায় শরীর জমে গিয়েছিল। ঘন্টাখানেক ঘরে গিয়ে গা গরম করে এলাম। তারপর আবার যাত্রা মেন ডাইনীং হলে – জমিয়ে খাওয়া ও ঘুম।
(চলবে)






Add comment