সাহিত্যিকা

পথেঘাটের দুর্গা

পথেঘাটের দুর্গা
© অনিরুদ্ধ রায়, ১৯৮৩ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

মাঝবয়সী অধ‍্যাপক সরোজ চক্রবর্তী বন্ধুর নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে তাঁদের চন্দন নগরের বাড়িতে দুর্গাপুজো উপলক্ষে এসেছেন। বন্ধু মাধব মুখার্জিদের পারিবারিক পুজো। মন্ডপে গিয়ে প্রতিমা দর্শন করে এবার বন্ধুর আত্মীয়দের সাথে পরিচিত হচ্ছেন। প্রতিমার কাছে বসে থাকা এক বৃদ্ধার কাছে নিয়ে গিয়ে মাধব বলেন, “কাকীমা, ইনি আমার বন্ধু সরোজ চক্রবর্তী, ইকনমিক্সের স্বনামধন‍্য প্রফেসর।“
বৃদ্ধা হাঁটতে পারেন না, শরীরটাকে ঘষে ঘষে হাত দিয়ে ঠেলে ঠেলে এগিয়ে এসে সরোজের মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহভরে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের দেশ কোথায়?”
– আমাদের বাংলাদেশে ঘর বাড়ি ছিল।
– বাংলাদেশের কোথায়?
– ফরিদপুরের পালং এ।
– ফরিদপুরে ঘর? পালং এ? তা তোমার বাবার নাম কী?
– আমার বাবার জন্ম ফরিদপুরে নয়, কলকাতায়। ঠাকুর্দা ফরিদপুরের। নাম নির্মল চন্দ্র চক্রবর্তী। পেশায় স্কুল মাস্টার ছিলেন।
– ওই দেখো। তুমি নির্মল মাস্টারের নাতি? আরে, উনি তো আমার মাসির নন্দাই। আমার মামাবাড়িও পালং এ। আমি ছেলেবেলায় তোমাদের শিবমন্দির লাগোয়া বাড়িতে অনেক গিয়েছি। তোমার ঠাকুর্দাকে আমার স্পষ্ট মনে আছে, টিকালো নাক ছিল।
সরোজ দুই পরিবারের এই যোগাযোগে উতসাহী হয়ে বললেন, “আমি আমার ঠাকুর্দাকে দেখিনি, ওনার কথা বাবার কাছে শুনেছি মাত্র। কী অদ্ভুত যোগাযোগ দেখুন আজ এমন একজনের সাথে দেখা হলো যিনি আমার ঠাকুর্দাকে দেখেছেন।“
– তাহলে তোমরা তো আমাদের আত্মীয় গো।

সরোজের পক্ষে সম্পর্কের বেড়াজাল ধরে আত্মীয়তা খুঁজে বার করা মুস্কিল তবু খুশিই হলেন। একটা ছাপা শাড়ি পরা সাধারণ দর্শন মেয়েকে ডেকে সেই বৃদ্ধা আলাপ করিয়ে দিয়ে বললে, “শোনো, এই আমার নাতনী।“ তারপর মেয়েটাকে বললেন, “এ মাধবের বন্ধু, আবার সম্পর্কে তোর মামাও বটে,প্রণাম কর।“
মেয়েটা ঠিক প্রণাম নয়, হাঁটু ভাজ করে বসে পায়ে হাত দিয়ে পায়ে চুমু খেয়ে নিলো, যাকে আমরা কদমবুসি বলি।
সরোজ মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে মেয়েটির হাত ধরে তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?”
– অদ্রিজা হাসান।
নামটা শুনেই সরোজ নিজের মনে চমকে উঠলেন। মেয়েটি মুসলিম বলে নয়, এই নামটার সাথে সরোজের পরিচিতি আছে।
বৃদ্ধা পাশ থেকে বলেন, “দুর্গাপূজার অষ্টমীতে ওর জন্ম, তাই ওর নাম রেখেছে অদ্রিজা।“
সরোজ মেয়েটিকে প্রশ্ন করলেন, “তুমি কী কর?”
– আমি জে এন ইউতে ইকনমিক্সে মাস্টার্স করছি, সেকেন্ড ইয়ার।

বছর দুই আগে সরোজ নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির এক্সটারনাল এগজামিনার হয়ে ইকনমেট্রিক্সের খাতা দেখেছিলেন, একটা খাতা দেখে সন্দেহ হলো, এই খাতা পরীক্ষার হলে বসে জেনারেট করা সম্ভব নয়, কিন্তু এই খাতায় সরোজকে ফুল মার্কস দিতেই হবে। অন্যদিকে সেই ব‍্যাচের অন্য কি সব উত্তরগুলো ভীষণই সাধারণ মানের। সরোজ হেড এক্সামিনারকে জানাতে উনি ইউনিভারসিটি মারফত সংশ্লিষ্ট কলেজে লিখিত এনকোয়ারি করে জানতে পারলেন, এই পরীক্ষাত্রীর নাম অদ্রিজা হাসান আর সে কলেজের ফার্সট গার্ল। সরোজ তবু সন্দেহবশে চেপে মার্কিং করে ছেয়াত্তর দিয়েছিলেন। কলকাতার কোনো নামী কলেজের কারো খাতা হলে সরোজ হয়ত একশই দিতেন। সরোজ এরপর মেয়েটির খোঁজ রাখতেন, এবং জানতে পেরেছিলেন সেই মেয়ে সেবার ইউনিভার্সিটির টপার হয়েছিল। আজ সামনা সামনি সেই মেয়েকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। চেহারায় তেমন শ্রী নেই তবে বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুটো জ্বল-জ্বল করছে। নিজ কৃতকর্মের জন‍্য সরোজের মন আজ গ্লানিতে ভরে গেলো। মেয়েটির হকের চব্বিশ নম্বর তো ওর দেওয়া উচিত ছিল।

মেয়েটি চলে যেতে বৃদ্ধা বললেন, “এই মেয়ে ভালোবেসে তার কলেজের প্রফেসরকে বিয়ে করেছিল, কিন্তু জামাই বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় মারা যায়। মেয়ে এখন একা স্কুল মাস্টারি করে নিজের মেয়েকে মানুষ করছে। আমার এই নাতনী বিদ‍্যা-বুদ্ধি আর তেজে সাক্ষাৎ মা দুর্গাই বটে।“

সরোজের তেমন ঈশ্বর বিশ্বাস নেই, কিন্তু আজ জীবন্ত মা দুর্গা দর্শনে পরিপূর্ণ তৃপ্তি লাভ করে প্রতিমার কাছে প্রার্থনা করল – মা, এর মঙ্গল করো, এ দেশের সম্পদ।

********

রণেনদা পুরুলিয়ায় থাকে, আমাকে বলে রেখেছে এবার পুজোয় কলকাতায় আসবে, আর আমাকে সাথে নিয়ে দুর্গাঠাকুর দর্শনে যাবে। আমি ভিড় ঠেলে প‍্যান্ডেলে গিয়ে প্রতিমা দেখার লোক নই কিন্তু রণেনদাকে না বলতে পারলাম না। জানিয়েছে, অষ্টমীর দিন সকালেই পুরুলিয়া ফিরে যাবে তাই ষষ্ঠী, সপ্তমীতেই ঠাকুর যত দেখাদেখি সব সারতে হবে।

পরিচিত সমাজে রণেনদার একটা ইমেজ আছে। মহিলাদের শিক্ষার সাথে যুক্ত হয়ে একটা এন জি ও চালায়, ভীষণই ডেডিকেটেড্। রণেনদার যা শিক্ষাগত যোগ‍্যতা, একটা স্কুল-কলেজে পড়ানোর চাকরি নিশ্চয়ই পেত তবু এই কাজই করে।

ষষ্ঠীর দিন সকালেই রণেনদা তার পেটেন্ট পায়জামা, খদ্দেরের পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়ে আর একটা ঝোলাব‍্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে আমার বাড়িতে এসে হাজির। আমাকে বলে – চল নর্থ থেকেই শুরু করি।

আমাকে প্রথমেই একটা বাংলা মদের দোকানে নিয়ে গেল। আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, “রণেনদা, শোনো, শোনো, আমি কিন্তু এইসব খাই না।“
জবাবে রণেনদা বলে, “আমিও খাই না, দেবী দর্শনে এসেছি, তাই।“
দেখি দোকানের কাউন্টারে একজন সেলস গার্ল বসে আছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, “এই দোকানে মহিলা!”
দাদা বলে, “এরাই তো আজকের দুর্গা রে। স্বামীহারা অভাগিনী মেয়ে, বাড়ির সব কাজ সামলে সেই কোন সকাল বেলা রান্না করে, শাশুড়িকে খাইয়ে তার জিম্মায় মূক-বধির মেয়েকে রেখে দশটার মধ‍্যে দোকান খুলে বিক্রি বাট্টা চালু করে। এ আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতন নয় রে। এর তেজে দোকানে কোনো খরিদ্দার ঝামেলা করার সাহস পায় না। কত অল্প টাকায় যে এদের সংসার চলে তুই ভাবতেও পারবি না।“
আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল সন্ধ‍্যা নামের সেই মেয়ের সাথে যার চেহারায় যৌবনের কোনোই চাকচিক‍্য নেই, আছে দৃঢ় চোখে কঠিন বাস্তবের সাথে লড়ে জেতার সঙ্কল্প।

সন্ধ‍্যাকে রণেনদা একটা ইংরেজি নোট বই দিয়ে বলল, “তুই এটা থেকে পড়, এখানে বাংলায় মানে লেখা আছে। আমি ভাইফোঁটায় আসব, তখন কিছু বুঝতে না পারলে জিজ্ঞেস করিস।
সন্ধ‍্যা বইটা একবার উল্টে-পাল্টে দেখে নিয়ে পাশে রেখে দিল। আমরা বেরিয়ে এলাম, রণেনদা বলল, “এই সন্ধ্যা মেয়েটি বিশ্বাস করে, একমাত্র শিক্ষিত মায়েরাই পারে প্রতিবন্ধী মেয়েদেরকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে। প্রাইভেটে ওর মেয়ে এবার মাধ‍্যমিক দেবে এবং আমি জানি ও পাশ করবেই।“

ওখান থেকে আমরা গেলাম বিডন্ স্ট্রীটের একটা জীর্ন এজমালি বাড়ির সিঁড়ির নীচের ঘরে। একটা কালো মেয়ে উনুনের ধিমি আঁচে লোহার ইস্তিরি দিয়ে ডাঁই করা কাপড় ইস্তিরি করছে, রণেনদা পরিচয় করিয়ে দিল সীমা নামের সেই মেয়ের সাথে।
রণেনদা বলল, “এও আরেক দুর্গা, এই পরিবেশে থেকেও নিজের সঙ্কল্পে অনড়, কারো একে ছোঁয়ার সাহস হয় না। কোনো অসুর যদি জোর ফলায় তো এখানকার শত দুর্গা সেই অসুর নিধন করে ফেলবে।“

রণেনদা আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে সীমাকে ইংরেজি পড়াতে লাগল। সীমা ইস্তিরি করতে করতেই পড়া বুঝছে। আর আমি দরজার বাইরে দাড়িয়ে দেখছি, বারান্দায়, উঠোনে দুর্গার ঢল নেমেছে।
আমি দেখলাম জনজটে, বেসাতিতে, রিপু সন্নিধানে শত শত দুর্গা। অপূজিতা সব দুর্গা অবহেলায় বিরাজমান।

আজ এঁদের বোধনের দিন।
মা তোমাদের প্রণাম।।

******

Sahityika Admin

Add comment