নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথ ও গোরা উপন্যাস
© অপূর্ব চক্রবর্তী, ১৯৭৭ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
ভগিনী নিবেদিতার মাধুর্যমন্ডিত চরিত্র ও তাঁর দৃপ্ত ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের মানসলোকে ছায়াপাত করেছিলো। আর এরই ফলস্বরূপ আমরা পেয়েছি তাঁর অমর সৃষ্টি উপন্যাস “গোরা”।
ভগিনী নিবেদিতা (মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল) এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গভীর বন্ধুত্বের। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে “লোকমাতা” আখ্যা দেন এবং নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পটি ‘হাঙ্গরী স্টোন’ নামে অনুবাদ করেছিলেন। কবির অনুরোধে নিবেদিতা কয়েকবার শিলাইদহের কুঠিতে আতিথ্য গ্রহন করেছিলেন, যেখানে নিবেদিতার পরামর্শে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত ‘গোরা’ উপন্যাসের ট্র্যাজিক সমাপ্তি পরিবর্তন করেছিলেন।
স্বামী বিবেকানন্দের অনুগামিনী বিদেশিনী ভগিনী নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের “গোরা”-র মধ্যেই শাশ্বতী হয়ে রয়েছেন। কখন যে তিনি কবির মানসলোকে একটি কালজয়ী উপন্যাসের ছায়া ফেলেছিলেন তা তিনি জানতেও পারেননি। গোরার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো সে নম্রস্বভাবের হিন্দু ও নিজ সংকল্পে দৃঢ়। নেতৃত্বে ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট। আদ্যন্ত গোঁড়া অথচ মুক্তির উপাসক ও স্বাধীনতার পূজারী। শেষ পর্যন্ত গোরা জানতে পেরেছিল যে তাঁর ধমনীতে বইছে আইরিশ রক্ত। এই চরিত্র যখন সদ্য রবীন্দ্রনাথের কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করেছে তখনও কবিগুরু নিজেই জানতেন না এর কি পরিনাম হ’বে। তিনি শুধু জানতেন একটি পুরুষের চরিত্র চিত্রায়িত করবেন নিবেদিতার মতনই যার চোখে আগুন ঝলসে ওঠে। যার ব্যক্তিত্বে রয়েছে আবেগ। গোরা রজতগিরি আর নিবেদিতা গৌরাঙ্গী। কবিগুরুর নজরে নিবেদিতার পূর্ণ মহিমা আর অদম্য তেজ পড়ে আর এই তেজস্বীনী দৃঢ়চেতা নিবেদিতাকেই তিনি তার “গোরা” উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
নিবেদিতার মৃত্যুর তেরো বছর পরে বাংলা কথা সাহিত্যে “গোরা”-র আবির্ভাব। নিবেদিতা বেঁচে থাকার সময়েই কবি গোরা-র কাহিনী নিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে জানা যায় “গোরা”রচনা শুরু হয় ১৯০৭ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের শেষের দিকে। এই উপন্যাসের শেষ কথাটি হলো যে গোরা আইরিশম্যানের পুত্র ধর্মের সমস্তই সত্য সমস্ত পবিত্র নির্বিচারে সমস্ত কিছুকে গ্রহণ করেছে।
গোরার প্রবল দেশাত্মিকতার উগ্রতা কবি নিজে এক সময় গভীরভাবে অনুভব করেছেন। সেই কারণে গোরার যুক্তিজাল এমন সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। স্বামীজীর বাণীতে হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদ স্পন্দিত হয়েছিল। গোরার চরিত্রে স্বামী বিবেকানন্দ ও নিবেদিতার মিশ্রিত স্বভাবকে পাওয়া যায় নিবেদিতার পক্ষে হিন্দু হওয়ার অসম্ভবত্ব কল্পনা করেই কবিগুরু যেন আইরিশম্যানের পুত্র গোরাকে উপন্যাসের নায়ক রূপে সৃষ্টি করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের বহুদিনের ইচ্ছা তাঁর ছোট মেয়েকে ভালো করে ইংরেজি শেখাবেন। রবীন্দ্রনাথ একদিন নিবেদিতাকে অনুরোধ করলেন তার ছোট মেয়েকে ইংরেজি শেখানোর জন্য। “ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে যখন আমার প্রথম দেখা হয় তখন তিনি অল্পদিনমাত্র ভারতবর্ষে আসিয়াছেন। আমি ভাবিয়াছিলাম সাধারণত ইংরেজ মিশনরি মহিলারা যেমন হইয়া থাকেন ইনিও সেই শ্রেণীর লোক, কেবল ইঁহার ধর্মসম্প্রদায় স্বতন্ত্র।“
কবির অনুরোধ শুনে নিবেদিতা অবাক হয়ে বললেন “সে কী ঠাকুর বাড়ির মেয়েকে বিলিতি মেম বানাবেন?”
রবীন্দ্রনাথ সেদিন বলেছিলেন, “ইংরেজি ভাষাটা মেয়েকে শেখাতে চাই। আর সেই ভাষার মাধ্যমে যে শিক্ষা দেওয়া হয় সেই শিক্ষা।”
নিবেদিতার উত্তর ছিলো “কিন্তু বাইরে থেকে কোনোও একটা শিক্ষা গিলিয়ে দিয়ে লাভ কী? বাঁধা নিয়মের বিদেশী শিক্ষায় নিজের জাতিগত বৈশিষ্ট্যকে চাপা দেওয়া আমি পছন্দ করি না।”
“তাহার পরে মাঝে মাঝে নানাদিক দিয়া তাঁহার পরিচয়-লাভের অবসর আমার ঘটিয়াছিল। তাঁহার প্রবল শক্তি আমি অনুভব করিয়াছিলাম কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও বুঝিয়াছিলাম তাঁহার পথ আমার চলিবার পথ নহে। তাঁহার সর্বতোমুখী প্রতিভা ছিল, সেই সঙ্গে তাঁহার আর একটি জিনিস ছিল, সেটি তাঁহার যোদ্ধত্ব। তাঁহার বল ছিল এবং সেই বল তিনি অন্যের জীবনের উপর একান্ত বেগে প্রয়োগ করিতেন–মনকে পরাভূত করিয়া অধিকার করিয়া লইবার একটা বিপুল উৎসাহ তাঁহার মধ্যে কাজ করিত। যেখানে তাঁহাকে মানিয়া চলা অসম্ভব সেখানে তাঁহার সঙ্গে মিলিয়া চলা কঠিন ছিল। অন্তত আমি নিজের দিক দিয়া বলিতে পারি তাঁহার সঙ্গে আমার মিলনের নানা অবকাশ ঘটিলেও এক জায়গায় অন্তরের মধ্যে আমি গভীর বাধা অনুভব করিতাম। সে যে ঠিক মতের অনৈক্যের বাধা তাহা নহে, সে যেন একটা বলবান আক্রমণের বাধা।“
কবির নিজের ভাষায়, “যদিচ আমার মনে সংশয় ছিল, এরূপ শিক্ষা দিবার শক্তি তাঁহার আছে কি না, তবু আমি তাঁহাকে বলিলাম, আচ্ছা বেশ আপনার নিজের প্রণালীমতোই কাজ করিবেন, আমি কোনো প্রকার ফরমাশ করিতে চাই না। বোধ করি ক্ষণকালের জন্য তাঁহার মন অনুকুল হইয়াছিল, কিন্তু পরক্ষণেই বলিলেন, না, আমার এ কাজ নহে। বাগবাজারের একটি বিশেষ গলির কাছে তিনি আত্মনিবেদন করিয়াছিলেন–সেখানে তিনি পাড়ার মেয়েদের মাঝখানে থাকিয়া শিক্ষা দিবেন তাহা নহে, শিক্ষা জাগাইয়া তুলিবেন। মিশনরির মতো মাথা গণনা করিয়া দলবৃদ্ধি করিবার সুযোগকে, কোনো একটি পরিবারের মধ্যে নিজের প্রভাব বিস্তারের উপলক্ষ্যকে, তিনি অবজ্ঞা করিয়া পরিহার করিলেন।“
কবি সেদিন কোনও দ্বিমত প্রকাশ করেন নি, বরং নিবেদিতা তাঁর শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠেছিলেন। “তাহার পরে মাঝে মাঝে নানাদিক দিয়া তাঁহার পরিচয়-লাভের অবসর আমার ঘটিয়াছিল। তাঁহার প্রবল শক্তি আমি অনুভব করিয়াছিলাম কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও বুঝিয়াছিলাম তাঁহার পথ আমার চলিবার পথ নহে। তাঁহার সর্বতোমুখী প্রতিভা ছিল, সেই সঙ্গে তাঁহার আর একটি জিনিস ছিল, সেটি তাঁহার যোদ্ধত্ব। তাঁহার বল ছিল এবং সেই বল তিনি অন্যের জীবনের উপর একান্ত বেগে প্রয়োগ করিতেন–মনকে পরাভুত করিয়া অধিকার করিয়া লইবার একটা বিপুল উৎসাহ তাঁহার মধ্যে কাজ করিত।“
পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের সাথে নিবেদিতার পরিচয় যখন নিবিড় হয় তখন তিনি মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে শিলাইদহের জমিদারি কাছারিতে এসে অতিথি হয়ে আসতেন। দুরন্ত পদ্মার প্রতি তিনি যেন অন্তরের একটি আকর্ষণ অনুভব করতেন। পদ্মার প্রকৃতির সাথে তাঁর প্রকৃতির যেন কোথায় একটা মিল ছিলো, তেমনি পদ্মার মতই উদ্যাম এবং উচ্ছলিত।
এরপর একাধিক সভায় নিবেদিতার ভাষনে রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন যে এই বিদেশীনীর ভারতপ্রীতি যথার্থ, এটি কোনও মোহ নয়। তবু একবার রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন “এমন অন্তরঙ্গভাবে এসব জিনিস দেখবার যথার্থই কোন প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা।”
নিবেদিতা বলেছিলেন “আছে বৈকি। গুরুজী বলতেন একটা জাতিকে বুঝতে হ’লে তার সবকিছু গ্রহণ করতে হ’বে।”
ভারতবর্ষের অন্তরঙ্গ পরিচয় লাভের জন্য এক বিদেশিনীর এই আকুতি ও আন্তরিকতা রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছিল। নিবেদিতার প্রতি কবির মন সেদিন শ্রদ্ধায় ভরে উঠেছিল। নিবেদিতার কার্যকুশলতা, উচ্চ আদর্শ ও মহাপ্রাণ যেন এক মধুর আলোক মূর্তি হয়ে কবির অন্তর্দৃষ্টি জ্বলে উঠেছিলো। মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতাকে লোকমাতার গৌরবময় আসনে স্থান দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কবি তাই বলতেন “বহু বিদেশি পুরুষ ও নারী ভারতের নিমিত্ত বহু ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু নিবেদিতার মতো কেউ করেননি।”
নিবেদিতাও রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববোধ ও মানবতার বিশেষ অনুরাগিনী ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি কবিতার ইংরেজি অনুবাদও করেছিলেন।
“যেমনই হউক, তিনি হিন্দু ছিলেন বলিয়া নহে, তিনি মহৎ ছিলেন বলিয়াই আমাদের প্রণম্য। তিনি আমাদেরই মতন ছিলেন বলিয়া তাঁহাকে ভক্তি করিব তাহা নহে, তিনি আমাদের চেয়ে বড়ো ছিলেন বলিয়াই তিনি আমাদের ভক্তির যোগ্য। সেই দিক দিয়া যদি তাঁহার চরিত আলোচনা করি তবে, হিন্দুত্বের নহে, মনুষ্যত্বের গৌরবে আমরা গৌরবান্বিত হইব।“
এক দিকে তাঁহার কাছ হইতে যেমন উপকার পাইয়াছি এমন আর কাহারও কাছ হইতে পাইয়াছি বলিয়া মনে হয় না। তাঁহার সহিত পরিচয়ের পর হইতে এমন বারঙবার ঘটিয়াছে যখন তাঁহার চরিত স্মরণ করিয়া ও তাঁহার প্রতি গভীর ভক্তি অনুভব করিয়া আমি প্রচুর বল পাইয়াছি।
১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর সকালে জীবনদীপ নিভে গেল এক মহাপ্রাণার। জন্মসূত্রে খ্রিস্টান আর অন্তর থেকে হিন্দু। তাঁর দেহ সেদিন আগুনেই ভস্মীভূত করা হয়েছিল। পড়ে থাকা কয়েক মুঠো ভস্মের কিছুটা গিয়েছিল বেলুড় মঠে, কিছুটা বাগবাজারের বশি সেনের মন্দিরে, কিছুটা আয়ারল্যান্ডের নিজ জন্মগৃহে আর কিছুটা ভারতবর্ষের বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র বসু বিজ্ঞান মন্দিরে।
তথ্যঋণঃ
https://rabindra-rachanabali.nltr.org/node/14874
https://www.bongodorshon.com/home/story_detail/sister-nivedita-in-rabindranath-s-eye
https://pagefournews.com/sister-nevedita-rabindranath-tagore/
******






Add comment