ইতিহাস যেখানে নীরব (ধারাবাহিক ষষ্ঠ পর্ব)
© দেবাশীষ তেওয়ারী, ১৯৬৯ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
পর্ব (৯)
পার্বতীপুর নগরীর রাস্তা এখন সম্পূর্ণ নির্জন, এরই মধ্য দিয়ে ঘোড়া ছুটে চলেছে। সুতনুকার নিজের দেশ, নিজের নগর, এর প্রতিটি পথ, প্রতিটি গলি তাঁর চেনা। তাই সুতনুকার সাহায্যে রাজপথ ছেড়ে গলিপথ দিয়ে শক সৈন্যদের এড়িয়ে চন্দ্র অতিদ্রুত পৌঁছে গেল নগরীর উত্তর তোরণে। তোরণদ্বার তখনও খোলা, ওপরে মাত্র দুজন ত্রিগর্তের সৈনিক, পাহারারত শকসেনারা সবাই গেছে তাদের নতুন সম্রাজ্ঞীকে দেখতে। কিন্তু রক্ষীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক সরু গলিপথ থেকে বেরিয়ে চন্দ্রের ঘোড়া বিদ্যুত বেগে তোরণ পেরিয়ে নিকটবর্তী জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল। সৈন্যেরা ওপর থেকে এক ঝলক মাত্র দেখল যেন কোন সেনানায়ক উন্মুক্ত তরবারি হাতে এক দ্রুতগতির কালো ঘোড়ায় সওয়ারী, আর তাঁকে পিছন থেকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে আছে এক অতি সুন্দরী রমনী। ঘোড়া তোরণ পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবার পরে প্রহরীদের মনে হলো যে মেয়েটির চেহারা সম্ভবত তাঁদের রাজকুমারীর মত। কী আশ্চর্য, তাঁর সাথেই তো আজ শকরাজা রুদ্রসিংহের বিয়ে হওয়ার কথা।
কে এই সেনানায়ক? কোথা থেকে এলো? রাজকুমারীকে নিয়ে পালালোই বা কেন? নিশ্চয় কিছু গোলমাল হয়েছে বুঝতে পেরে তারা দ্রুত তোরণ দ্বার বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণ পরে পিছু ধাওয়া করে আসা শকসেনাদের কাছে তারা বেমালুম অস্বীকার করল কোন অশ্বারোহীর পালানোর কথা। ‘তোরণদ্বার আমরা বন্ধ করে রেখেছিলাম প্রভু। কোন মাছিও এখান থেকে গলে বেরোয় নি, কোন ঘোড়াও এদিকে আসেনি।’ শক সেনারা বড় নিষ্ঠুর, রক্ষীরা জানে সত্য ঘটনা বললে তাদের মুণ্ডু এখনি গড়াগড়ি যাবে।
চন্দ্রের এসব জানার কথা নয়। অনুসরণকারীরা পিছু ধাওয়া করছে ধরে নিয়েই তাদের এড়াতে সে কোথাও থামেনি, টানা কয়েক ঘণ্টা ঘোড়া ছুটিয়ে এসে পৌঁছোল এক পাহাড়ের পাদদেশে। এবার ঘোড়া নিয়ে আর এগোনো সম্ভব নয়। ঘোড়াকে সেখানেই ছেড়ে দিয়ে তারা সরু পাহাড়ী পথে ওপরে উঠতে লাগল। বেশ কিছুটা ওঠার পর একটা ছোট ঝর্ণার পাশে ফাঁকা গুহার মত দেখে চন্দ্র যখন থামলো, পশ্চিম দিকে আকাশ লাল করে তখন সূর্য অস্তগামী। ‘মহারাণী, আজ রাতের মত এখানেই আমাদের বিশ্রাম নিতে হবে। সামনের পথ অন্ধকারে বিপজ্জনক। শকেরা পিছু ধাওয়া করে এতদূর নিশ্চয় আজ রাতে আর আসতে পারবে না।’
সুতানুকা এতক্ষণ বিশেষ কিছু বলেনি। যেন কিরকম একটা ঘোরের মধ্যে সে ছিল। সেই দানব, অভেদ্য বর্ম শিরস্ত্রাণ পরে মহাক্ষত্রপ, মহারাজাধিরাজ, পশ্চিম সাম্রাজ্যের সম্রাট, শক কুলতিলক রুদ্রসিংহ নিজে, তার অত সৈন্য, লোক লস্কর, সেনাপতি। তাদের কাছে বর্মহীন, শস্ত্রহীন, চন্দ্র? তাকে নিতান্তই এক অসহায় বালকের মত মনে হয়। কিন্তু সুতনুকার বিশ্বাস ছিল, বিশ্বাস ছিল তার রাজপুত্র যখন এসে গেছেন, তাকে যেমন করেই হোক উদ্ধার করবেন, অবশ্য কেমন করে করবেন তা সে জানে না। সেই বিশ্বাসে ভর করেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবার ভান করে সে বুক থেকে যখন ছুরিকাটা বার করে দিয়েছিল, তার দূরতম কল্পনাতেও ছিল না কি ঘটতে চলেছে। এরপর রুদ্রসিংহের গলা থেকে যখন ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল, আতঙ্কে সে চোখ বুজেছিল। মৃত্যু এত কাছে ছিল! মৃত্যু এতই সহজ! তার নবনীকোমল রাজকুমার যে যুদ্ধে এত নির্মম, এত নির্দয় হয় তা সে শুনেছিল বটে, কিন্তু সামনে থেকে এই প্রথম সে মৃত্যু দেখল। তারপর কি হল, কি করে তারা বেরিয়ে এল, কি করে এতদূর পথ এল, তার বিশেষ কিছুই মনে নেই। সে প্রাণপণে চন্দ্রকে ধরে ছিল, তার রক্ষাকর্তাকে। এতক্ষণে, এই পাহাড়ের ওপরে উঠে, অবশেষে তার হুঁশ ফিরল, সে তার চিন্তাশক্তি ফিরে পেল।
কিন্তু রাজপুত্র আবার এ কী বলে সম্বোধন করছেন? ‘মহারাণী’!
কেন? সে তো তার রাজপুত্রেরই রাজকুমারী।
সুতনুকা বলল, ‘কুমার, তুমি আমায় ঐ নামে ডেকো না, আমার পছন্দ নয়।’
‘তাই? কী নামে সম্বোধনে আপনি খুশি হবেন দেবী?’
‘দেবী, আপনি? তোমার হল কী? একটু আগেই তো তুমি আমায় রাজকুমারী বলে ডাকছিলে। ঐ নামই আমার পছন্দ।’
‘তা আর হয়না দেবী। তখন আপনি ত্রিগর্ত রাজ্যে ছিলেন। এই স্থান ত্রিগর্ত সীমার বাইরে। এখানে আপনি মগধের সম্রাজ্ঞী, আপনাকে সঠিক সম্বোধন করাই তো শিষ্টাচার।’
‘সম্রাজ্ঞী? আমাকে তো শকদের কাছে উপঢৌকন দিয়েছিল তোমাদের সম্রাট নিজে বাঁচবার জন্যে। বরং অগ্নিতে প্রবেশ করব, কিন্তু সেই কাপুরুষের রাণী আমি আর কিছুতেই হব না।’
‘এটা করবেন না দেবী, এই সময় মগধের আপনাকে বড় প্রয়োজন ।’
‘তুমি মগধের যুবরাজ। সেই কাপুরুষ তো তার স্বামীত্ব আগেই ত্যাগ করেছে, এখন কোন মুখে আমায় আবার ফিরে চাইবে। তুমি আমাকে দ্বিতীয়বার উদ্ধার করেছ, কেন করলে? এক কাপুরুষের হাতে আমায় তুলে দেবে বলে?’
এই বলে সুতনুকা আগ্রহভরে চন্দ্রের মুখের দিকে চেয়ে রইল, লজ্জা তাঁকে ভাষাহীন করে দিয়েছে, সে বলতে পারছে না, ‘আমার স্বপ্নের রাজকুমার, আমার শয়নে স্বপনে শুধুই তুমি, আমি তোমারি জন্যে অর্ঘ্য সাজিয়ে বসে আছি।’
সূর্য খানিক আগেই অস্ত গেছেন, কিন্তু শেষ গোধূলির রাঙা আলোয় সুতনুকার মুখে পড়ে তাঁকে এক অনির্বচনীয় দীপ্তি দান করেছে। সেই দিকে চেয়ে চন্দ্রের মন ব্যথায় ভরে গেল। এই নারী, এ মাত্র আজকের জন্যেই তার সঙ্গে আছে, কিন্তু কালকেই অন্যের হয়ে যাবে। এই বালিকার মত সরল, কুসুম কোমল অথচ অসমসাহসী নারী, হৃদয়ের কোন গোপন স্থানে কী তার হৃদয়, মন প্রাণ উন্মুখ হয়ে থাকে না? এই বালিকাকে কাছে টেনে নেবার জন্যে, এর মাথায় হাত বুলিয়ে প্রবোধ দেবার জন্যে? যেমন সে কাল রাত্রেও করেছিল।
কে যেন তার মনের মধ্যে থেকে বলে উঠল, ‘কাল তুমি ছিলে মগধের সৈনিক, দুর্ধর্ষ শক রাজা রুদ্রসিংহকে হত্যার প্রয়োজনে দরকার ছিল রাণীকে প্রস্তুত করার, তাকে সাহস দেওয়ার।’
‘সত্যিই কী তাই?’ মনের মধ্যে অন্য এক চন্দ্র বলে, ‘খালি রাণীকে সাহস দেবার জন্যে এই কাজ করে ছিলে? তোমার নিজের মনের কোন আর্তি ছিল না?’
‘হয়ত ছিল, কিন্তু তাতে কী, ভুলে যেওনা আজ তুমি মগধের যুবরাজ, বড় ভাই মগধ সম্রাট রামগুপ্তের রাণীকে শত্রুর হাত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে চলেছ, তার কোন ক্ষতি না করে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া তোমার কর্তব্য, তোমার ক্ষত্রিয় ধর্ম।’
‘কিসের রাণী? কিসের ক্ষত্রিয় ধর্ম? তাকে তুমি দু দুবার জয় করে এনেছ। প্রথমবার সম্রাটকে উপহার দিয়েছিলে, কিন্তু তিনি তাকে মর্যাদা দেননি, নিজেকে বাঁচাতে উপঢৌকনের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কী হত যদি তুমি রুদ্রসিংহকে বধ করে তাকে আবার ছিনিয়ে না আনতে? বীরভোগ্যা বসুন্ধরা, সে তোমার, একান্তই তোমার।’
কি এত ভাবছ কুমার?’
গোধূলির আলো সরে গিয়ে গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছে পাহাড় শীর্ষে। সুতনুকার মুখ আর দেখা যায় না, আকাশের চন্দ্রতারার স্নিগ্ধ আলোয় শুধু দেখা যায় তার গভীর প্রত্যাশা ভরা দুটি চোখ।
চন্দ্র চোখ সরিয়ে নিয়ে আকাশের পানে চাইল। তারায় ভরা আকাশ। পুব আকাশে পাহাড়ের ওপর দিয়ে সপ্তর্ষিমণ্ডলকে দেখা যায়, জানা অজানা কত শত সহস্র নক্ষত্রে আকাশ ভরে আছে।
‘ঐ তারাটি কিছু মনে পড়ায়?’ চন্দ্র দূরে উত্তর আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
‘এটি ধ্রুবতারা। তুমিই তো আমায় চিনিয়েছিলে কুমার, সেই সেবার যখন রাত্রিতে ঘোড়া ছুটিয়ে আমরা দুজনে কুষাণদের থেকে পালাচ্ছিলাম। সব সময় উত্তর দিকে এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে আর অন্ধকারে পথভ্রান্তকে দিক নির্দেশ করে।’
‘পথভ্রান্তকে দিক নির্দেশ করে! একদম ঠিক’ চন্দ্র মনে মনে বলল, ‘আমার মনের অন্ধকার দূর হয়ে গেছে রাজকুমারী, আমি পথ খুঁজে পেয়েছি।’
পর্ব (১০)
চন্দ্র রুদ্রসিংহের গলার নলি কেটে সুতনুকাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া মাত্র পূর্ব পরিকল্পনা মত অংশুমান তার দু’শো সেনা নিয়ে লুকানো স্থান থেকে বেরিয়ে আসে এবং সোজা মঞ্চের দিকে ছুটে যায়। মঞ্চে তখন শক সেনারা তাদের মরণোন্মুখ রাজার অসহায় ছটফটানি দেখে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। তাদের হতভম্ব ভাব কাটার আগেই অংশুমান মঞ্চে উঠে মগধ সম্রাটের তরবারিটি নিয়ে নেমে আসে। দুর্জয় আর তার সেনারাও ততক্ষণে নিজেদের অস্ত্রগুলি নিয়ে প্রস্তুত। এই চারশো সেনার মিলিত বাহিনী কিন্তু আক্রমণ না করে ক্রমে পিছিয়ে যেতে থাকে। শকসেনারা বিহ্বলতা কাটিয়ে প্রতি আক্রমণ করার আগেই মগধের বাহিনী বনে ঢুকে পড়ে। তখনও রুদ্রসিংহের অন্তিম মুহূর্তের আর্তনাদে চারদিক কেঁপে উঠছে। অরিদমণ মগধ সেনাদের বনের মধ্যে আর অনুসরণ না করে মুমূর্ষু মহারাজের সেবায় মনোনিবেশ করা মনস্থ করে। মগধকে পরে বুঝে নেওয়া যাবে, আগে মৃত্যুপথযাত্রী সম্রাটকে দেখা দরকার।
*******
গত রাতে মধুপান বোধহয় একটু় বেশীই হয়ে গিয়েছিল। এটি বিশেষ এক মদিরা, যেমন স্বাদ, তেমনিই তার দ্রব্যগুণ, কখন যে নরম নেশা শিরা উপশিরা বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে শরীর মন আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল টেরই পাওয়া যায় নি। রামগুপ্ত নিজেই দুই ভৃঙ্গারের ওপর শেষ করে দেয়, সঙ্গী বলতে ছিল একমাত্র নিপুণিকা। মধুপানে সেও কিছু কম যায় না, প্রায় দেড়় ভৃঙ্গার শেষ করে সম্রাটের বুকে মাথা রেখে রহস্যালাপে রত ছিল।
‘কোন দেশের মাধ্বী গো প্রভু, পরশু? আহা, কি মধুর আবেশে প্রাণ যেন ভরে দিল!’
‘কেন, ভাল লেগেছে? এটা পরশুদের তৈরী নয়, যবনদের।’
‘বুঝেছি, বুঝেছি, কাল আমাদের মুক্তির দিন, তাই আজ হয়ত এই বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন।’
‘আরে না না, এটা রুদ্রসিংহ উপহার দিয়েছিল। যাই বল, লোকটার দিল আছে বটে, অনেক কিছু উপহার পাঠিয়েছে।’
‘এটুকু করবে না! আপনি ওকে বৌ উপহার দিয়েছেন, ও আপনাকে দামী মাধ্বী দিয়েছে। নাকের বদলে নরুন। বৌকে দিয়ে দিতে হয়েছে বলে মহারাজের নিশ্চয় কষ্ট হচ্ছে।’
‘পাগল, তুমি থাকতে বৌয়ের দরকার কিসের। তাছাড়া আমরা হলাম গিয়ে ক্ষত্রিয়, জীবনেরই মায়া করি না তো – – -!’
কথা শেষ হওয়ার আগেই রামগুপ্তের নাসিকা গর্জন সুরু হয়ে গেল। নিপুণিকা নিপুণতার সাথে সম্রাটের চেপে ধরা হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। আজ অন্তত ভাল করে ঘুমানো যাবে।
পরদিন বেলা দুপ্রহর প্রায় অতিক্রান্ত, কিন্তু তখনও রামগুপ্ত নিদ্রিত। এক অগ্রদূত সেই কোন ভোর থেকে বসে আছে দেখা করবে বলে, কিন্তু সম্রাটের ঘুম ভাঙ্গে না। অবশেষে তাঁর সুখনিদ্রা কিসের যেন গোলমালে ভেঙ্গে গেল। কোথা হতে হট্টগোলের আওয়াজ আসছে। কার এত সাহস সম্রাটের শিবিরের সামনে চেঁচামেচি করে? প্রতিহারকে ডেকে কারণ জিজ্ঞেস করাতে সে জানাল, ‘প্রভু, যুবরাজ চন্দ্রগুপ্তের নামে সৈন্যেরা জয়ধ্বনি দিচ্ছে।’
সম্রাটের সামনে যুবরাজের নামে জয়ধ্বনি! কেন, কার এত সাহস? উন্মত্ত ক্রোধে রামগুপ্ত নিজেই শিবিরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। শিবির থেকে বেশ কিছুটা দূরে হলেও স্পষ্ট বোঝা যায়, শ চারেক সৈন্যের দলটির পুরোভাগে একটি বিশাল কালো ঘোড়ায় চড়ে আসছে চন্দ্র। আশ্চর্য! ও এখানে কি করে এল? কবে এল? তিনি তো কিছইু জানেন না! আর তার পাশেই সাদা ঘোড়ায় কে? তিনি কি ঠিক দেখছেন? ওকে কি রুদ্রসিংহ ছেড়ে দিয়েছে? কেন? সম্রাট নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলেন না। কাঁচা ঘুমে ওঠা তো, কি দেখতে কি দেখছেন। বারবার চোখ কচলেও দৃশ্য কিন্তু পাল্টাল না। সাদা ঘোড়ার আরোহী আর কেউ নয়,সুতনুকা স্বয়ং।
শিবিরে সম্রাটের সভাগৃহ। চারজন গভীর আলোচনারত। যুবরাজ চন্দ্র, মহামন্ত্রী কাত্যায়ন, প্রধান সেনাপতি দেবদত্ত এবং সম্রাট নিজে। ‘অসাধারণ, অভাবনীয় সাহস আর বীরত্বের কাজ। রুদ্রসিংহের ডেরায় গিয়ে স্বয়ং রুদ্রসিংহকে বধ করা!’ দেবদত্ত দুর্জয়ের কাছ থেকে যা শুনেছে বিবৃত করে বলল, ‘চারশো সৈন্য নিজের চোখে ঘটনাটি দেখে যুবরাজের নামে ধন্য ধন্য করছে। শকেরা এতই বিধ্বস্ত যে তারা প্রতি আক্রমণ করার সাহস পর্যন্ত পায় নি। তবে আমরা প্রস্তুত আছি মহারাজ।’
‘বিরাট ঝুঁকির কাজ, দরকার ছিল না। আমি তো শকদের আক্রমণ করতামই। তাছাড়া চাঁদু, তুই যে শকদের ডেরায় যাচ্ছিস, আমায় তো কই জানাসনি, আমার অনুমতি নিসনি।’ সম্রাটকে একটু অখুশী মনে হল।
‘সময় ছিল না মহারাজ। আমরা গোপন সুড়ঙ্গ পথে এসেছিলাম। মহারাণীকে রক্ষা করা আমার প্রথম কর্তব্য ছিল।’
‘ওঃ, ভাল কথা মনে পড়েছে,’ রামগুপ্ত কাত্যায়নের দিকে তাকালেন, ‘এবারে ওর বাবাকে ধরে এনে আমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করুন। আর তো রুদ্রসিংহ নেই।’
‘কিভাবে বিয়েটা হবে একটু মহারাণীর সঙ্গে আলোচনা করে নিলে ভাল হতো না?’ কাত্যায়নকে একটু কুণ্ঠিত দেখায়, কি যেন বলি বলি করেও তিনি বলতে পারছেন না।
‘তার মানে? ওর সঙ্গে আবার কি আলোচনা? আপনার হল কি? আমি সম্রাট, আমার বিয়ে কিভাবে করব তাতে সুতনুকার কি বলার আছে?’
‘মহারাজ, তিনি এখন আর আপনার স্ত্রী নন, আপনি তাকে অন্য কাউকে দান করেছিলেন। এটা ঠিক কাজ হয় নি। মগধের সম্মান সবার আগে।’ এবারের বক্তা স্বয়ং চন্দ্র।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি তো যুদ্ধ করব বলেই ঠিক করেছিলাম। বিয়ের ব্যাপারটা আমি নিজেই দেখছি। মহামন্ত্রী, আপনি কুলগুরুকে খবর দিন। আর রুদ্রসিংহকে হত্যা করে চাঁদু অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে, গুপ্তবংশের যোগ্য কাজ। কোন প্রশংসাই এর জন্যে যথেষ্ট নয়। ওকে কি পুরস্কার দেওয়া যায় চিন্তা করে দেখছি।’ এই বলে সম্রাট সভা শেষ করে দিলেন। সৈন্যরা এখন চন্দ্রকে দেবতার আসনে বসিয়েছে, তাকে চটানো যাবে না।
সৈন্য ছাউনির মাঝামাঝি রাজ অবরোধ। চারদিক মোটা কাপড় দিয়ে ঘেরা। ভিতরে দুটি প্রধান শিবির, একটি সম্রাটের,অপরটি মহারাণীর, দুটির মধ্যে সংযোগকারী পথটিও বনাত দিয়ে ঘেরা। কিন্তু আজ সুতনুকা রাজ অবরোধে ঢোকেনি। শকদের কাছে যাবার সময় যে ছোট্ট শিবিরটি সে ব্যবহার করেছিল সেটিতেই আছে। মহারাণীর শিবিরটি খালি থাকায় সেটিতেই যুবরাজের সাময়িক থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। অবরোধে এবং রাজ শিবিরে ঢোকার মুখে কড়া পাহারা, একটা মাছিও গলার উপায় নেই।
গভীর রাত। শিবিরে মহারাজ রামগুপ্ত শয্যায় একা শুয়ে আছেন। তাঁর ঘুম আসছে না। নিপুণিকাকে পাঠিয়েছিলেন সুতনুকার কাছে, কিন্তু সুতনুকা সম্রাটকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে সরাসরি অস্বীকার করেছে। ‘মনে হয় যুবরাজের সঙ্গে তার একটা লটঘট চলছে,’ নিপুণিকা চোখ মটকে একথা জানানো মাত্র তিনি প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তাকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন। ‘এতবড় সাহস! লটঘট চলছে?’
এখন এই একাকী নির্ঘুম রাতে তিনি ভাবতে বসলেন, আচ্ছা নিপুণিকার ওপর রাগ করে তো তাকে তাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু সে কী আদৌ দোষী! সে তো তাঁর অতি অনুগত। আসল দোষ তো সুতনুকার, যে তাঁকে বিয়ে করতে চায় না। কিন্তু সুতনুকার এত সাহস হল কী করে? এইবার রামগুপ্ত আসল অপরাধীকে খুঁজে পেলেন। চন্দ্র! এই সবকিছুর জন্যে দায়ী আর কেউ নয়, স্বয়ং চন্দ্র।
এই চন্দ্র যেন কালশত্রু হয়ে তাঁর জীবনে এসেছে। পিতা তাঁকেই বেশী ভালবাসতেন, তাকে পাশে নিয়ে যুদ্ধ করেছেন, হঠাৎ মারা না গেলে হয়ত রাজ্যও তাকেই দিয়ে দিতেন। সেনাপতি, মহামন্ত্রীকেও সে হাত করেছে। রাজ্যের প্রয়োজনে তারা চন্দ্রের সাথেই আলোচনা করে, সৈন্যরা সম্রাটের সামনেই যুবরাজের নামে জয়ধ্বনি দেয়। এমনকি তাঁর স্ত্রী, সেও তার বীরত্বে মুগ্ধ, তাকেও সে বশ করেছে। তাঁকে না জানিয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে রুদ্রসিংহকে হত্যা করে সে রাণীকে উদ্ধার করেছে। কেন? তার নিশ্চয় স্বার্থ ছিল, তারা নিশ্চয় পরস্পরের প্রতি আসক্ত, এতটাই যে রাণী তাঁকে বিয়ে করতে পর্যন্ত অস্বীকার করেছে। চন্দ্রও চায়না যে এই বিয়ে হোক। শনি, সাক্ষাৎ শনি, তাঁর নিষ্কণ্টক রাজ্য ভোগে একমাত্র বাধা চন্দ্র।
প্রহর শেষের ঘোষণা হল, দ্বিতীয় প্রহর শেষ হয়ে এখন তৃতীয় প্রহর। সম্রাট উঠে পড়লেন। তিনি মনস্থির করে ফেলেছেন। আজকেই সুযোগ, আর হয়ত এমন সুযোগ আসবে না। ছোট্ট গলিপথ, তাতে একজন মাত্র প্রহরী। তিনি তাকে ডেকে প্রধান দ্বারে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে নাকি প্রহরী কম। তাঁর শয়ন কক্ষ এবং চন্দ্রের কক্ষের মধ্যে আর কোন বাধা রইল না।
চন্দ্র তখন গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন। পরপর তিন রাত্রি সে ঘুমোবার বিশেষ সুযোগ পায়নি। নিঃশব্দে চন্দ্রের শয্যায় পৌঁছে সম্রাট বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। অবশেষে নিশ্চিত হয়ে তিনি দুহাত মাথার ওপর তুললেন। জোড়া হাতে ধরা আছে একটি আধহাত মাপের ছুরিকা, প্রদীপের ম্লান আলোতেও তা ঝকঝক করছে। মুহূর্ত মাত্র, এবার সেই ছুরিকা দ্রুতবেগে নেমে এল চন্দ্রের বুকে।
কিন্তু একি? দ্রুতবেগে নেমে আসা সেই ছুরিকা তো চন্দ্রের বুক স্পর্শ করল না! তার আগেই প্রচণ্ড শক্তিতে কেউ তাকে ঘুরিয়ে ঢুকিয়ে দিল সম্রাটের নিজের বুকে। বিস্মিত সম্রাট দেখলেন এক ভয়ানক দানব তাঁর দিকে রোষ কষায়িত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। পড়ে যেতে যেতে ভয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন। চন্দ্রের ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে সামনে বেতালকে দেখতে পেল। দেখল মাটিতে পড়ে থাকা সম্রাটকে, বুকে আমূল বিদ্ধ হয়ে আছে মাঝারি মাপের একটি ছুরিকা।
‘এ কী করেছ বেতাল, ইনি সম্রাট, আমার নিজের বড় ভাই। তুমি তাঁকে মারলে? আমার এই ক্ষতি করবে বলেই কী তুমি এতদিন আমায় ছেড়ে যাওনি।’ চন্দ্র হাহাকার করে উঠল। ‘দাদা, বেতাল, আমার দাদা।’
‘না চাঁদু, দোষ আমার। মুহূর্তের মোহাবেশে আমার ভাল মন্দ বোধ লুপ্ত হয়েছিল, আমিই তোকে মারতে গিয়েছিলাম, বেতাল শুধু তার প্রভুকে রক্ষা করেছে মাত্র।’
‘তুমি দেখো দাদা,বেতাল নিশ্চয় তোমায় ভাল করে দেবে, তাই না বেতাল!’
বেতাল চুপ করে থাকল, তার পক্ষে অসম্ভব প্রায় কিছুই নেই, কেবল একটি ছাড়া, মৃত্যু পথযাত্রীকে জীবন দান।
এক বছরের ওপর কেটে গেছে। সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত শকদের তাদের শেষ আশ্রয় অবন্তী থেকেও উৎখাত করে দিয়েছেন। প্রজারা তাঁর নাম দিয়েছে শকারি। মথুরা থেকে তিনি রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেছেন শকদের কাছ থেকে জেতা নগরী উজ্জয়িনীতে। শিপ্রা নদীর তীরে তৈরি হয়েছে সম্রাটের নতুন প্রাসাদ।
তখন বসন্তকাল। এক গভীর নিশীথে তিনি রাণীকে নিয়ে ছাদে এসে বসলেন। মাথার ওপরে আকাশের শামিয়ানা। লক্ষ লক্ষ তারারা উজ্জ্বল হীরের দীপ্তি ছড়িয়ে আকাশ ভরে রেখেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশীর অজানা সুর, মুকুল গন্ধে বাতাস মদির। এই উতলা মন কেমন করা সময়ে চন্দ্র রাণীকে বলল, ‘রাজকুমারী,সেদিনের কথা মনে পড়ে?’
‘কোন দিনের কথা সম্রাট?’
‘সেই যেদিন রুদ্রসিংহকে মেরে পালাবার সময় আমরা পাহাড়ে রাত কাটিয়েছিলাম?’
‘কেন থাকবে না, সেদিনও এমনি মদির রাত ছিল, আকাশের শামিয়ানা ছিল, আর ছিল ঐ দূর আকাশের ধ্রুবতারা।’ আবেগে ঘন রাণীর নিশ্বাস।
চন্দ্র সুতনুকাকে কাছে টেনে নিল। গভীর আশ্লেষে চুম্বন করতে করতে বসল, ‘আকাশের ধ্রুবতারা আজ মর্ত্যে নেমে এসেছে, যার পরিবর্তন নেই, স্থির, স্থির যৌবনা, আমার ধ্রুব – – -‘
আদরে ভেসে যেতে যেতে রাণী বলল, ‘বেশ তো, বে – – -।’
কথা মাঝপথেই অসমাপ্ত থেমে গেল। আকাশের তারারা সাক্ষী থাকল এই যুগল মিলনের।
(শেষ)
*******






Add comment