সাহিত্যিকা

সেই আড্ডাটা আজ আর নেই , আজ আর নেই

সেই আড্ডাটা আজ আর নেই , আজ আর নেই
© অর্নব চ্যাটার্জি, ১৯৮৩ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

পুরোনো নথিপত্রের আড়ালে হঠাত্ই আবিষ্কার করলাম অমূল্য সম্পদ দুটো ফটো। আপাত নিরীহ সাদা-কালো এই ফটো দুটো বি ই কলেজের এক রঙিন দিনের সাক্ষী। বি ই কলেজের পুরোনো ইতিহাস হাতড়ালে সেই দিনের উল্লেখ পাওয়া যাবে। কি সেই দিন? এরা কারা, প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীত শিল্পী মান্না দের সাহচর্য লাভের আনন্দে যাদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে? এই প্রশ্নগুলি এতক্ষণে নিশ্চয়ই মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে।

সঙ্গীত জগতে কৈশোর প্রেমের বাংলা ব্যকরণের হাতেখড়ি যদি রাহুলদেবের “মনে পড়ে রুবি রায়” দিয়ে হয়ে থাকে তাহলে মানসিক পক্বতার পরবর্তী ধাপে এসে যৌবনের প্রবেশ দ্বারে যাঁর গান যুবসমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, যাঁর গান বাঙালি প্রেমিকের পরোক্ষে প্রেম নিবেদনের চলতি ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তিনি আর কেউ নন, স্বনামধন্য মান্না দে। আশির দশকে বিই কলেজের হোস্টেলে আই ডি বা গ্র্যান্ড ফিস্ট মানেই মান্না দের গানের লং প্লেইং রেকর্ড আর স্টাডির সামনে বসানো বক্স থেকে অবধারিত ভাবে ভেসে আসবে, “এইতো সেদিন তুমি আমারে বোঝালে”, “অভিমানে চলে যেয়ো না”, “সুন্দরী গো দোহাই তোমায় মান কোরো না”, এরকম একের পর এক গান। সে গানের মৌতাত ছড়িয়ে যেত এক হোস্টেল থেকে অন্য হোস্টেলে।

মান্না ভক্তদের সাথে হেমন্ত অনুরাগীদের প্রায়ই তর্ক বাধত, কার কণ্ঠস্বরের আবেদন বেশি। মান্না দে’র সমর্থকরাই ছিল সংখ্যায় বেশি। সেই তর্কের ঝড় শেষ পর্যন্ত ডাইনিং হলে গিয়ে আছড়ে পড়ত। অবশেষে গ্র্যান্ড ফিস্ট বা আই ডি র সুস্বাদু খাবার পাতে পড়ার পর আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসত তর্কের ঝড়। পরের দিন সকালে কোনো ঝাড় সাবজেক্টএর ক্লাস আর দুপুরে ত্যালতেলে মাছহীন মাছের ঝোলের কথা চিন্তা করতে করতে আবার পরের আই ডি বা গ্র্যান্ড ফিস্টের অপেক্ষা , তার সাথে মান্না দের গান।

এবার ফিরে যাই সেই প্রথম দুটি প্রশ্নে, কোন্ বিশেষ রঙিন দিনের সাক্ষী বহন করে ছবি দুটি আর ছবিতে কাদের দেখা যাচ্ছে। সালটা ছিল ১৯৮১, বি ই কলেজ তার দীর্ঘ যাত্রা পথ অতিক্রম ক’রে ১২৫ বছরে পদার্পণ করেছে, বিরল এই ঘটনার সাক্ষী ১৯৮২, ১৯৮৩ আর ১৯৮৪ সালে যারা পাশ করেছিল সেই ছাত্রেরা আর সেই সময়ের শিক্ষক এবং অন্যান্য কর্মী বৃন্দ। ডিসেম্বরের শীতের আমেজে লর্ডস সেজে উঠেছে ১২৫ বছরের রিউনিয়ন আয়োজনে। এতো বড় একটা অনুষ্ঠানে কলেজের ছেলেদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শিখরে থাকা মান্না দেকে আনা হবে না তাই আবার হয় নাকি? অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি মনে নেই। তবে এইটুকু মনে আছে যে মান্না দে মঞ্চে ওঠার পর কলেজ প্রাঙ্গন জন জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল। চিরকুট মারফত একের পর এক গানের অনুরোধ যাচ্ছে মান্নাবাবুর কাছে। আর উনি গেয়ে চলেছেন, আমার এক দিকে শুধু তুমি, পৃথিবী অন্যদিকে, তুমি নিজের মুখেই বললে যেদিন সবই তোমার অভিনয়, রাত জাগা দুটি চোখ। রাত এগারোটার পর আমি সাধারণত চোখ মেলে রাখতে পারতাম না, আজও পারি না। কিন্তু সেদিন মান্না বাবুর গলার আওয়াজের চৌম্বকত্বে চোখের দুপাতা এক করতে পারি নি, সারা রাত জেগে অনুষ্ঠান দেখেছিলাম। বি ই কলেজে কাটানো সোনালী দিন গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সেই দিনটা।

সেই অনুষ্ঠান উপলক্ষে যারা কলেজ থেকে মান্না দেকে আনতে গিয়েছিল তাদের সাথে পরিচয়টা সেরে নি। ওপরের ছবিতে, মান্না দের ঠিক ডান দিকে অনিরুদ্ধ’দা (১৯৮২ ইলেকট্রিক্যাল, হোস্টেল ৯) তার পর বিজিত দত্ত (১৯৮৩ সিভিল, হোস্টেল ৯) তার পরের জনকে চিনি না। মান্না দের বাম দিকে যে তাকে চিনি না। তার পাশে অরুণ ভট্টাচার্য (অরুণ দা ১৯৮২ ইলেকট্রিক্যাল, হোস্টেল ৭)। নীচের ছবিতে মান্না দের সাথে তিলক চ্যাটার্জি (১৯৮৩ ইলেকট্রিক্যাল, হোস্টেল ৯)। আমি হোস্টেল ৯ এ ছিলাম। সেই অর্থে ছ’জনের মধ্যে আমার তিনজন হোস্টেল মেট।

তিলকের ব্যাপারে ছোট্ট করে বলি। তিলক সাধারণত হোস্টেলে থাকতো না। পরের দিন কিছু জমা দেওয়ার বা বিশেষ কোনো কারণ থাকলে হোস্টেলে পাওয়া যেতো ওকে, তাও মাঝরাতে। চারতলার স্টাডিতে আমি আর আরও তিন জন থাকতাম। হঠাত্ মাঝরাতে পাশ ফেরার সময় দেখলাম তিলক জামা প্যান্ট পরেই পাশে শুয়ে আছে। ঘুম চোখে হয় তো জিজ্ঞেস করলাম, তিলক তুই? তিলক বলতো, আর বলিস না শালা, আগামী কাল রিলে সিস্টেমের সেসনাল জমা করতে হবে। পনেরো নম্বর হোস্টেলে গিয়েছিলাম চোথা করতে।

ওপরের ছবির একেবারে ডানদিকে অরুণ দা আমার বাড়ি থেকে একটু দুরে থাকে। বাজারে মাঝেমধ্যে দেখা হয়। সেদিন ডাকলাম অরুণ দাআআ। অরুণ দা কিছুটা থতমত খেয়ে হাঁ হুঁ করে চলে গেলো। সাধারণত এরকম তো করে না অরুণ দা। দাঁড়িয়ে দুটো কথা তো বলে। বুঝলাম অরুণ দার দোষ নেই। মুখে মাস্কের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসা ভ্যাসভেসে আওয়াজ আর মাস্ক এবং লকডাউনের জেরে উস্কোখুস্কো চুলের আবরণে ভাইটাকে চিনতে পারে নি।

— with Kalyanbrata Dasgupta.

********

Sahityika Admin

Add comment