আমাদের ৭২-৭৭ রিইউনিয়ন
© অব্যায় ইস্টউড মিত্র, ১৯৭৭ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
প্রতিবার হয়, এবারেও হলো। বছরের প্রথম রবিবার জানুয়ারির ৪ তারিখ কলেজের মেইন বিল্ডিং (বা ফার্স্ট লবিও অনেকেই বলেন) এর সামনের লনে। এখন জায়গাটির নাম ফ্ল্যাগ গ্রাউন্ড। মানে কলেজ ক্যাম্পাসে আমাদের ৭২-৭৭ ব্যাচের বাৎসরিক রিইউনিয়ন। আমাদের অর্গানাইজার কাম আহ্বায়ক শ্রী শ্রী অসীম দেব মহাশয় প্রতি বছর দিল্লি থেকেই সমস্ত কলকাঠি নাড়েন। কলেজের পারমিশন, লন বুকিং, হেডকাউন্ট, বাজেটিং, ক্যাটারিং, মেনু, গেস্ট হাউসের লাউঞ্জ, স্যারদের জন্য আলাদা জায়গা, মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট …… তারপর কে নিরামিষ খাবে, কে মাংস খাবে, কে মাছ খাবে, অথবা কে শুধুই মিষ্টান্ন খাবে? কে সারপ্রাইজ দেবে? বৃষ্টি হলে কি হবে? গাড়ি কোথায় পার্কিং হবে? ডেরাইভারের কি খাবে? হাজারো ঝামেলা ……… তবে যতই আমরা কামদেবকে কাঠিবাজি করি, তেমনি আবার উৎসাহও দিয়ে যাই।
রবিবার সকাল দশটা নাগাদ কলেজের ফার্স্ট গেট দিয়ে ঢোকার সময় সিকিউরিটি প্রশ্ন করে বসলো, ৭৭ ব্যাচ? বললাম হ্যাঁ, ৭৭ ব্যাচ। গেট খুলে দিলো আর ফ্ল্যাগ গ্রাউন্ড যাওয়ার রাস্তাও দেখিয়ে দিলো। পরে অন্যদের কাছেও শুনলাম যে কামদেব গেটের সিকিউরিটিকে জানিয়ে দিয়েছে, ৭৭ ব্যাচ? তাহলে ঐদিকে ফ্ল্যাগ গ্রাউন্ড চলে যান।

এবার আমাদের নতুন নিয়মে সবাই আগে থেকেই চাঁদা দিয়ে রেখেছে। প্রতি বছর বেশ কিছু জনতা সবাইকে খেলিয়েছে, মানে আসবে কনফার্ম করেও আসেনি। এতে প্রতিবারই হয় খাবারের অপচয় হয়েছে, অথচ ক্যাটারারকে পয়সাও দিতে হয়েছে। এইবার আগে থেকেই চাঁদা নেওয়ায় আগের দিন রাতেই জানা গেল যে পরিবার সহ ১০৮ জন হবে, মানে চাঁদা দিয়ে রেখেছে। এবং এইবার আমাদের এস্টিমেশন নিয়ে কোন সমস্যা হয় নি। কে চাঁদা দিলো, অথবা কার বাকী রয়ে গেলো, এসব ঝামেলাই আর হলো না। তবে মৃণ্ময় আর তকাদা চাঁদা দিয়েও আসতে পারলো না।
দেখি মাঠ জুড়ে বড়ো বড়ো ছাতার তলায় চেয়ার, টেবিল দিয়ে সাজানো। আর এক কোনে চায়ের ঠেক, প্রতিবারের মতন সামনে বানিয়ে দেবে, আর বেঞ্চি পেতে ঘিরে বসা। অসীম দত্ত এসেছে সবার আগে, মানে আর্লি বার্ড। দ্বিতীয় অসীম দেব, আর তৃতীয় হারাধন বসাক। অসীমের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকেই একদিকের টেবিলে দুধ-চিনি দেওয়া ভাঁড়ের গরম চা শুরু হয়ে গেছে। আর পাশেই বড় কড়াইয়ে জিলিপি ভাজা হচ্ছে। যারা সুগারের ভয়ে চরম সংযমী তাঁরাও একের পর এক জিলিপি তুলে নিচ্ছে। আমিও গরম জিলিপি দিয়ে সকালের উপবাস ভাঙ্গলাম। অসীম জানালো যে জিলিপি এগারোটা পর্যন্ত আনলিমিটেড, আর চা দুপুরের খাওয়ার সময় পর্যন্ত আনলিমিটেড। দেখলাম, জনতা চা আর জিলিপি ভালোই টানছে। দুনিয়া কাঁপানো ৭৭ ব্যাচের সব দিগ্বিজয়ী সহপাঠীরা একে একে মঞ্চে প্রবেশ করছেন। কেউ কেউ আবার সোজা চায়ের আসরে। শ্রীদীপ তাঁর ব্যাস্ত সময়ের মাঝেও ঝাড়গ্রাম যাওরার পথে একবার ঢুঁ মেরে কয়েক কাপ চা খেয়ে গেলো।

সাড়ে দশটার খানিক পরেই এবারের জলখাবারে কিছু এক্সপেরিমেন্ট ভাবা হয়েছিল। প্রতিবার হয় কড়াইশুঁটির কচুড়ি, আর আলু ফুলকপির তরকারি। এবার ক্লাব কচুরি, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক জমলো না। এরপর চা জিলিপি কাউন্টারের পাশে আমরা ব্যাটাছেলেরা জমিয়ে আড্ডা মারছি আর চারিদিকে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে। অনেকে নিজেদের পুরনো হোস্টেলগুলোয় ঢুঁ মারতে ছোটো ছোটো গ্রুপে বেড়িয়ে গেছে।

আমাদের সময়ের কয়েকজন প্রফেসর এসে গেছেন। প্রতিবারই আসেন। অন্যবারের মতো এবারেও নিজেদের আড্ডায় জমে গেছেন। আমাদের ব্যাচের প্রফেসর আলফা (গৌতম) দেখভাল করছে। সাথে আছে সজল দাশগুপ্ত। এবার সবাইকে চমক দিয়ে এলেন এখনের ডিরেক্টর প্রফেসর মূর্তি। চমকের উপর চমক, তিনি এসেছেন আমাদের ৭২-৭৭ সালের ব্র্যান্ড টি-শার্ট গায়ে। ডিরেক্টরকে আমাদের ৯৫% জনতাই চেনে না। অনেকেই ভাবছে, উনিও আমাদেরই ব্যাচমেট। আর আমাদের কে কখন যে কি বিশেষ বিশেষ বাক্য বলে বসে, তাই অসীম চেঁচিয়ে সবাইকে জানালো, মানে সাংকেতিক সাবধানবাণী শুনিয়ে দিলো যে ডিরেক্টর প্রফেসর মূর্তি এসেছেন। তারপরই কয়েকজনের উৎসাহ, করমর্দন করবে, ফটো তুলবে। প্রফেসর মূর্তি আমাদের মতনই ভাঁড়ের দুধ-চিনির চা খেলেন। খানিক বাদে আরও এক কাপ চা আর সাথে জিলিপি গেলো। উনি দ্বিতীয়বার জিলিপি খাবেন না। অসীম গিয়ে জানালো যে এটা বাঙালী জিলিপি। এই শুনে উনি জানতে চাইলেন বাঙালী জিলিপি আর তেলেগু জিলিপির ফারাক কোথায়? ব্যাস এবার বোঝাও!! যাই হোক, জিলিপি ওনার ভালোই লেগেছিল, নইলে দ্বিতীয়বার কেন খাবেন? উনি ছিলেন ঘন্টা দেড়েক, পুরো সময়টাই ছিলেন আমাদের সময়ের প্রফেসরদের সাথে। যাওয়ার আগে আমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ জানালেন। যাওার বললেন, আমরাই প্রথম ব্যাচ যারা ওনাকে এরকম অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করেছি, এবং এই নিয়ে দ্বিতীয়বার। আমাদের তরফ থেকে উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সাম্মানিক উপহার দিয়েছি। উনার সাথে আমরা Dean, Alumni Relations প্রফেসর অনির্বান গুপ্তকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম।

ইতিমধ্যে অসীম এক চমক দিয়ে ময়দান জমিয়ে দিলো। এই দুষ্টবুদ্ধির মস্তিস্ক অসীম আর সুকান্ত যৌথভাবে। আগে থেকেই সে বিয়ের বর-বৌয়ের জোড়মালা নিয়ে এসেছে। দুজনে মিলে প্রফেসর অলোক দাসকে গিয়ে ধরলো, স্যার আজ আপনাদের belated marriage anniversary পালন করা হবে, আর অঞ্জনা, সঙ্ঘশ্রী আর রত্নাকে দায়িত্ব ধরিয়ে দিয়ে রীতিমত অনুষ্ঠান করে মালাবদল করিয়ে দিলো। চতুর্দিকের জনতার প্রশ্ন আজ কিসের এনিভার্সারি? যাই হোক, তুমুল উলুধ্বনি এবং অন্যান্য নানান রকমের ধ্বনির মাঝে ওঁদের মালাবদল হয়ে গেলো। পরে অসীম জানালো যে এটা ময়দানে হঠাতই ছাড়া হয়েছে।

এরই ফাঁকে মেয়েদের লাকি প্রাইজ অনুষ্ঠান হয়ে গেলো। প্রাইজ কেনার দায়িত্বে ছিল উত্তম খান।
খাওয়ার পরে প্রতিবারের মতন এবারেও স্যারদেরকে সৌজন্য উপহার দেওয়া হলো। এই প্রথমবার উনাদের স্ত্রীদেরও কিছু উপহার দেওয়া হলো। কেনাকাটার দায়িত্বে ছিল উত্তম খান। স্যারদের সাম্মানিক অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিল আমাদের তিনকন্যা অঞ্জনা, সংঘশ্রী, আর রত্না। প্রফেসর জয়দেব সরকার কলেজের ঠিক বাইরেই থাকেন, আর্কিটেকচারের ছেলেমেয়েরা ওনার বাড়ি গিয়ে ফুলের তোড়া, আর সৌজন্য উপহার দিয়ে এলো। আর পরদিন জয় আর সন্দীপ রুদ্র প্রফেসর সুধেন্দু সাহার বাড়ি গিয়ে তাঁর সাম্মানিক দিয়ে এলো।


এখানে একটা কথা, প্রতিবার স্যারেরা বলেন অনুষ্ঠানের ফটো চাই। তাই এবার গত কয়েক বছরের কিছু ফটো একসাথে কোলাজ ফ্রেম করে দেওয়া হয়েছে। এর দায়িত্বে ছিল দেবাশীষ প্যালা গাঙ্গুলী।
সেদিনের সময়টায় কিছুক্ষনের জন্য যেন ৭২-৭৭ এর দিনগুলিতে ফিরে গিয়েছিলাম। ক্যাম্পাস জীবনের সেই উত্তাপ, আমাদের বয়েসগুলো কোথায় যেনো হারিয়ে গেলো। অনেকেই সেদিন সুযোগ বুঝে কৈশোর যৌবনে ব্যাবহার করা বিশেষ বিশেষ বাক্যগুলো ব্যাবহার করেছে।
খাওয়া দাওয়ার শেষে হালকা রোদে গা এলিয়ে চেয়ারে বসে গ্যাজানো। আর তখনই বোঝা যায় যে বয়স হয়েছে, মনে তেজ থাকলেও শরীরে ক্লান্তি এসে গেছে। বিকেলে জনগণ ধীরে ধীরে চলে যেতে শুরু করেছে। আমরা কজন চায়ের কথা তুলতেই রামু এগিয়ে গিয়ে ক্যাটারারের লোককে ডেকে চা বানাতে লাগিয়ে দিলো। শুধু তাই নয়, রামু হাতে হাতে চায়ের ভাঁড়ও ধরিয়ে দিলো। সেদিন আমরা নিজেদের অজান্তেই কত ভাঁড় যে চা মেরে দিলাম নিজেদেরই খেয়াল নেই। বিকেল পূনে চারটে পর্যন্ত চা চলেছে। চা পান শেষ করে সবাই আসছে বছর আবার হবে বলে অসীমকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে যে যার বাড়ির পথে রওনা দিলাম।

তবে যেটা সবথেকে দুঃখ দিলো, অনেক প্ল্যান করে, টেক্সাস মার্কা হ্যাট আর কালো চশমা চোখে ভেবেছিলাম সবাই তারিফ করবে, উল্টে জনতা আমাকে ক্লিন্ট মেহমুদ নামে ডেকে বসলো। বেক ৭৭ এর জনতা টেক্সাস মার্কা ফিল্মের হিরোদের কদর দেয় না। সামনের বছর চাটুর মতন জামা গায়ে যাবো।
*******






Add comment