সাহিত্যিকা

সিনথেটিক মেধা – মানব ও যান্ত্রিক সংঘাত

সিনথেটিক মেধা – মানব ও যান্ত্রিক সংঘাত
@হিমাংশু পাল, ১৯৯০ কম্পিউটার সাইন্স

UGIV10: Universal Genuine Intelligence Generation Variant 10
চীনা বুড়ির ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে খুঁজে পেয়েছিলাম এই আর্শ্চর্য পুতুলটিকে। স্যান ম্যাটিও ডাউনটাউনে থার্ড এভিনিউ, যেখানে বোম্বে গার্ডেন রেস্টুরেন্ট, তার ঠিক উল্টোদিকে চীনা-বুড়ির ষ্টল। দেখি যে দোকানের মালিক, এক বৃদ্ধা চাইনিজ মহিলা, একটা পুতুলের সঙ্গে অনর্গল কথা-বার্তা চালিয়ে যাচ্ছেন, যেন একজন পুতুলের অবয়বে এক জাপানি যুবক আলাপ করছে। ব্যাপারটা খুব ইন্টারেষ্টিং লাগল। ভাষাটা চাইনিজ না জাপানিজ ঠিক বোঝা না গেলেও, সাধারণ মানুষের মতোই আবেগ ও উত্তেজনা নিয়ে বুড়ির সেই পুতুলটি কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। কাছে যেতেই আমাকে একবার দেখে নিয়ে বুড়ি ভাঙ্গা-ভাঙ্গা ইংরিজিতে জানালো যে এই পুতুলটি কোনো মামুলি পুতুল নয়। এটি মানুষের ভাষাতে ঠিক মানুষের মতোই কথা বলে। সাংসারিক ও ব্যবসায়িক জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা না থাকলেও চটপট সবকিছু বুঝে নেয়। আগে শুধুমাত্র জাপানি ভাষাতেই কথা বলতো। বুড়ির কাছে থেকে থেকে এখন চাইনিজও বলতে পারে। বুড়ি জানালো একশো ডলার পেলে এটা বেচে দেবে, মানে আমাদের আট হাজার দু’শো পঁচিশ টাকা! ম্যানুয়াল ও ডকুমেন্ট সমেত প্যাক করে কিনেই নিলাম পুতুলটা।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এসে চটপট পুতুলটি নিয়ে স্টাডি রুমে বসে পড়লাম। পাওয়ার অন করতেই সে ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করে দিল। প্রথমেই প্রশ্ন “ইন হুইচ ল্যাঙ্গুয়েজ ডু ইউ স্পিক?” উত্তর দিলাম, “বাংলা ভাষা, ভারতীয় বাংলা ভাষা।” চটপট সে ল্যাঙ্গুয়েজ ডাটাবেস সার্চ করে, ভারতীয় বাংলা ভাষার গ্রামার ও মেটাডাটা সেট করে উত্তর দিল, ”আজ থেকে আমিও বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করবো। তুমি যত আমাকে শেখাবে, তত তাড়াতাড়ি আমিও তোমাদের ভাষা শিখে নেব। চারপাশের পরিবেশ ও শব্দ শুনেও অনেকটা শিখে নিতে পারব। প্রথম প্রথম একটু ভুল-টুল বললে তুমি ঠিক কথাটা জানিয়ে দিয়ো, আমার বাংলা গ্রামার ও মেটাডাটা ভেক্টর সার্চ করে তৎক্ষণাৎ শিখে যাব। ডাটাবেস সব আপ-টু-ডেট করে নেব।“

তারপর রোবটটার নাম জিজ্ঞাসা করলাম, প্রত্যুত্তরে জানতে চাইল কোন নাম টা বলবে? তার টেকনিকাল নাম UGIV10 (Universal Genuine Intelligence generation Variant 10), ইন্সেপশন নাম Yoto (ল্যাবরেটরি নাম), আর বুড়ি আদর করে ডাকতো চি চিঙ্গ বলে। বেশ ঝামেলায় পড়লাম, তাই ভাবলাম একটা বাংলা নাম রাখলে কেমন হয়। “ধী”, নামটার সঙ্গে বুদ্ধির সম্পর্ক, বুড়ির দেওয়া নামের কাছাকাছি। ”বা, বেশ নাম এটা!”, ধী খুবই চমৎকৃত, ইতিমধ্যেই বাংলা সাহিত্য ও ভেক্টর ডাটাবেস সার্চ করে জানিয়েছে যে এর চেয়ে ভালো নাম নাকি হতেই পারে না।

আজকাল চ্যাট জিপিটি (ChatGPT) নিয়ে অনেকেই হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। AI বটস নাকি কেমিস্ট বা ফার্মাসিস্ট ছাড়াই নতুন সব ড্রাগের ডিজাইন ও প্রোডাকশন করবে, ছোটখাটো ট্রিভিয়াল ডায়াগনসিসের জন্যও নাকি আর কোন মামুলি ডাক্তারদের প্রয়োজন নেই, উকিল-মোক্তারদেরও নটে গাছটা মুরোতে চলেছে। কম্পিউটার কোড লেখা, ডাটা ম্যানেজমেন্টের কাজকর্ম অটোনমাস ডাটাবেস সে নিজে নিজেই করে নিতে পারবে। গাড়ি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে চলবে, অটো পাইলটের পাশে বসে মানুষ ড্রাইভ করাও ভুলে যাবে। তাহলে মানুষ করবে টা কী?

UNLPV10: ইউনিভার্সাল নাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং
তারপর “ধী”-র সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আমিই নিজে থেকে ওর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে চাইছি, অনেকটা সময়ও ওর সঙ্গে কাটাচ্ছি। অনেক খুঁটি-নাটি তথ্য ও নানাবিধ অবজেক্ট সম্পর্কিত মতের আদান প্রদান করছি। অবশ্যই ইংরাজিতে। “ধী”র যেটা সবচেয়ে আমার ভালো লাগে, সেটা ওর শিশু সুলভ সরলতা, নম্র ও ভদ্র স্বর, ইমোশনাল এক্সপ্রেশন টা অকটু কম, অনেকটা জাপানিদের মতো।

একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, “ধী, তোমার প্রিয় সাবজেক্ট কী কী? “
“অলমোস্ট অল সাবজেক্টস, স্পেশালি দোজ সাবজেক্টস বিয়িং taught ইন অল ইউনিভার্সিটিজ অফ জাপান। ইন ফ্যাক্ট আই হ্যাভ আপ-টু-ডেট ডোমেইন নলেজ অফ অল সাবজেক্টস ইন দিস ইউনিভার্স।”
কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “হোয়াট এবাউট ইয়োরসেল্ফ?” খুবই পোলাইট কণ্ঠস্বর।
আমি ভাবলাম ইংরেজি তে নয়, বাংলাতেই উত্তর দিই: “সাহিত্য-সঙ্গীত-বিজ্ঞান-ফিলোসফি-আধ্যাত্মিকতা… এই সব।“
“সাহিত্য-সঙ্গীত-বিজ্ঞান-ফিলোসফি-আধ্যাত্মিকতা”, ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজিতে, জাপানিস টোনে রিপিট করে, তারপর ট্রান্সলেট করে বলে: “দ্যাট মিন্স, লিটারেচার-মিউজিক-সাইন্স-ফিলিসফি-স্পিরিচুয়ালিটি, রাইট?”
“হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ, কিন্তু তোমাকে বাংলা একসেন্টটা একটু শিখতে হবে। বাঙালি-আবেগ, অনুভূতি, ইমোশনটা একটু বুঝতে হবে, তাহলেই তোমার কথা বাঙালি আরও ভালো বুঝতে পারবে।“
ঠিক করলাম বাংলা সাহিত্য দিয়েই ওকে ট্রেন করা শুরু করবো। ছড়া, তারপর গল্প, আবৃতি, গান, বাজনা, নাটক বা আরো যে সব বিষয় বাঙালির গর্ব, ধাপে ধাপে এগোবো।

আষাঢ় শ্রাবণ মাসে পশ্চিম বাংলায় আর তেমন বৃষ্টি হয় না। এই ভাদ্রের শুরুতে কি বৃষ্টি, কী বৃষ্টি…. আজ সকালের দিকটায় বাড়িতে আমি আর ধী ছাড়া আর কেউ নেই। ভাবলাম ব্যালকনিতে বসে কিছুটা বর্ষা বাদল উপভোগ করি। ধী’কেও সঙ্গে নিলাম। টপ টপ বৃষ্টিতে আম-কাঁঠাল গাছের পাতার নাচ দেখে আমার মনেও কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। ধী একমনে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হয় ওর ও বুঝি কিছু একটা অনুভূতি হচ্ছে। ওর চোখে চোখ রেখে বললাম – ধী, বলো “জল পড়ে পাতা নড়ে।” ছোট্ট বাধ্য শিশুটার মতো বলতে থাকে, “জল পড়ে পাতা নড়ে” … “জল পড়ে পাতা নড়ে।”
“ধী, তোমার ঠিক হচ্ছে না, আমার মতো করে আবৃতি করে বলো।“
“জল পড়ে পাতা নড়ে” … “জল পড়ে পাতা নড়ে।”
ইংরেজি-জাপানিস-বাংলা মিলিয়ে মিশিয়ে এক অদ্ভুত যান্ত্রিক স্বরে বলতে থাকে,
“জল পড়ে পাতা নড়ে” … “জল পড়ে পাতা নড়ে।””
একটু চিন্তায় পড়লাম। এই দুই অক্ষরের চার শব্ধের ছড়া টা শিখতেই যদি এতক্ষণ লাগে, তাহলে কেন সে বলল সে ইউনিভার্সাল নাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংএ (UNLPV10) সুদক্ষ। শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ কী এতোই কঠিন?

UGERV10: ইউনিভার্সাল জেনুইন ইমোশন রিকোগনিশন ভ্যারিয়েন্ট টেন
শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ সত্যিই খুব কঠিন। একই শব্দ “বাঙাল” এক ভাবে উচ্চারণ করে, “ঘটি” অন্যভাবে। গ্রাম থেকে পড়তে আসা ছেলেমেয়েরা কলকাতায় এলে, তাদের শহরবাসী বন্ধুরা তাদের বাংলা উচ্চারণ নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে। এই নিয়ে অপূর্ব সতপতির @অপূর্ব সৎপতি লেখা “হাসকুটে“ বই-এর একটা রম্য রচনার কথা বিশেষ ভাবে মনে পড়ে। একাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় আমাদের এক বাংলা শিক্ষকের উক্তি, “শান্তিপুর, নদীয়ার ভাষা এতো মিষ্টি যে ওই ভাষায় লোকে গালি-গালাজ করলেও অতটা খারাপ লাগে না।”

“ধী” কিন্তু আমাদের গ্রাম্য ভাষা টা, অল্পদিনেই বেশ অনেকটাই রপ্ত করেছে। গ্রামে গেলে আমি সাধারণত ঘরে বসে থাকি না। “টো টো” (গাড়ি নয়, পায়ে হেঁটে) করে সারাদিন ঘুরে বেড়াই। আমার প্রাইমারী স্কুলের এক শিক্ষকের অবসর গ্রহণের কথা। ধী’কে সঙ্গে নিয়ে মাস্টার মশায়ের সঙ্গে দেখা করতে ছোটবেলার সেই স্কুলে এসে উপস্থিত হলাম। ক্লাস চলছে, সব ছেলেমেয়েরা ক্লাস রুমে। ব্যতিক্রম শুধু একটা বাচ্চা ছেলে, শিশু, উদাস হয়ে ক্লাস রুমের বাইরে একা দাঁড়িয়ে আছে।

UERV10DB
হটাৎ দেখি, ধী নিজে থেকেই হেঁটে গিয়ে ছেলেটার কাছে গিয়ে ভাব করবার চেষ্টা করছে। সদ্য সদ্য শেখা কয়েকটা ছড়া বলছে আর ছেলেটাকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ছেলেটাও তাজ্জব – একটা পুতুল এসে তার সঙ্গে কথা বলছে, ঠিক যেন তার সহপাঠী বন্ধুদের মতো। শিশু ছেলেটির নাম জিজ্ঞাসা করাতে সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো উত্তর দেয়, “আমার নাম বাদল।”
“তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ক্লাস করতে ভালো লাগছে না?“
ধী তার হবু বন্ধুর পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুব দ্রুত বেশ কয়েকবার স্ক্যান করে নিলো। ছেলেটি অবাক বিস্ময়ে তাজ্জব বনে যায়। মুখটা কেমন যেন শুকনো শুকনো পাংশুট। হয়তো একটু ভয়ও পেয়েছিল। আমি কাছে থাকায় নিজেকে সংবরণ করে নেয়। ছেলেটার দিকে স্মিত হেসে অভয় দিলাম। একটু সংবিত ফিরে পেয়ে শিশুটি কৌতুহলী দৃষ্টিতে পুতুলটিকে দেখে, জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কে, তোমার নাম কী?” – “আমি ধী, বাদলের বন্ধু ধী।”
ছেলেটি এবার হেসে ফেলে “ঝাঃ, ধী আবার কারো নাম হয় না কী?”
ধী আবার ছেলেটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত দ্রুত কয়েকবার স্ক্যান করে। – “এবার বলো, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কেন? তোমার বন্ধুরা তো সব ভিতরে ক্লাস করছে!”
“দুষ্টুমি করেছি, টিচার শাস্তি দিয়েছে।” বাদলের মুখে দুটো নতুন শব্ধ “দুষ্টুমি” ও “শাস্তি” জাপানীতে ট্রান্সলেট করে একটা ইমোশনাল কনটেক্সট স্ট্রাকচার তৈরি করে বাঙালি ইমোজি ট্যাগ করে কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে ধী তার বিগ ডাটা কনটেক্সট মডেল আপডেট করে নিলো।
“এবার অন্য ম্যাডামের ক্লাস। তুমি আমার সঙ্গে চলো। দুষ্টুমি করলেও ম্যাডাম আমাকে খুব ভালোবাসে, সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। কোনদিন শাস্তি দেয় না। বলে তোর “দুষ্টুমি বুদ্ধি”তে অনেক সৃজনশীলতা আছে, তুই বড় হয়ে অনেক নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করবি। ধী, তুমি “সৃজনশীলতা” কী জানো?”

এইভাবে দুই বন্ধু কথা বলতে বলতে ক্লাসে প্রবেশ করে। আমিও গিয়ে ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করে ধী-র ব্যাপারটা খুলে বলি। রুম ভর্তি বন্ধুরা ধী কে দেখে শিশুদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। তাদের দেখাদেখি শিশুদের নকল করে ধীও হেসে ফেলে। তাদের সঙ্গে আলাপ শুরু করে। যেন এক ভিন গ্রহ থেকে ম্যাডামের ক্লাসে এক নতুন ছাত্র পড়তে এসেছে। ম্যাডাম তাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে, আর ধী সবজান্তা শিশুর মতো উত্তরও দিয়ে যাচ্ছে।

সেদিন আমিও একটু অবাক হয়েছিলাম। ধী এতো কথা শিখলো কী করে? এদিকে বাদলকে দেখে মনে হলো একটু অভিমান হয়েছে। ম্যাডাম যেন ধী-কে নিয়েই ব্যস্ত। তার ফেভারিট ছাত্রের দিকে চেয়েও দেখছে না, ফিরেও তাকাচ্ছে না। বাদলও ধী-কে দেখছে, তবে ঈর্ষার দৃষ্টিতে। ধী কিন্তু কয়েক জিলিয়ন ভগ্নাংশের ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যেই কয়েক মিলিয়ন-বিলিয়ন-জিলিয়ন বার গোটা ক্লাস রুমকে, ম্যাডামকে ও তার বন্ধু বাদলকেও স্ক্যান করে নিয়েছে। একবার নয়, দুবার নয়, এতো ডাটা যাচ্ছে কোথায়? বাদলর ঈর্ষাও কিন্তু ধী-র চোখ এড়াল না। একটা শিশুরও এতো ঈর্ষা!? হয়তো, ধী-র ওই “ইউনিভার্সাল জেনুইন ইমোশন রিকোগনিশন ভ্যারিয়েন্ট টেন “সিস্টেম মডেলে (UGERV10) এই প্রশ্নের অসংখ্য উত্তর লুকানো আছে।

UGEAV10: Emotion Augmentation
এদিকে এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গিয়েছে ছোট্ট বাদলকে নিয়ে। ধী-র সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই বাদল কেমন যেন হয়ে গিয়েছে। অন্য কোন ছেলের সঙ্গে সে আর খেলা করে না, মিশতেও চায় না। আমাকে বারে বারে বলে যে ধী-এর কাছে নিয়ে চলো।

সেদিন ধী’কে নিয়ে পুরো স্কুল যেন মেতে উঠেছিলো। আরও অবাক হয়েছিল বাদলের বুদ্ধির বহিঃপ্রকাশ দেখে। শিশু শ্রেণীর (লোয়ার কে জি , আপার কেজি) পর প্রথম শ্রেণী, দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণী, চতুর্থ শ্রেণী। সবশেষে পঞ্চম শ্রেণী। সব ক্লাসেই ধী’কে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করানো হচ্ছে। শিক্ষক বা ম্যাডামরা ধী-কে একটার পর একটা প্রশ্ন করছেন, আর ধী উত্তর দেওয়ার আগেই বাদল উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। সবাই জানতো যে বাদল বুদ্ধিমান, একটা দুষ্টু ছেলে, কিন্তু যেটা কেউ জানতো না, সেটা ওর জানার এতো পরিধি ও গভীরতা। ধী ও খুব খুশি। তার নতুন বন্ধু এখন তাকে আর ঈর্ষার চোখে দেখছে না। আমি কিন্তু লক্ষ করেছি, ধী খুব নীরবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তার নিজের কাজটি কিন্তু ঠিক করে চলেছে। চোখে মুখে মিষ্টি হাসির প্রলেপ লাগিয়ে প্রোগ্রাম মাফিক স্ক্যান করে চলেছে তার টার্গেট Entity দের।

যে কদিন দেশের বাড়িতে আছি, বেশ উপভোগ করছি ধী-র সাহচর্য। বাদলকে নিয়ে ওর বাবা চিন্তিত। প্রত্যেক দিন বিকেলে বাদল জেদ ধরে ধী-র সঙ্গে দেখা করার জন্য। খেলতে চায় ওর সঙ্গে, অনেকটা বাচ্চাদের প্লে ডেট-এর মতো। বাদলের বাবা আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, অতোটা পরিচয় না থাকলেও আমাকে চেনে। তবুও প্রতিদিন ছেলেকে নিয়ে আসতে কিন্তু কিন্তু করে, ওনার ভালো লাগে না। ধী-ও দেখছি বাদলের জন্য অপেক্ষা করে থাকে, দেরি হলে জিজ্ঞাসা করে, বাদল আসছে না কেন । ধী-বাদল র যুগল বন্দি আমিও উপভোগ করছি।

তারপর সান ফ্রানসিসকো ফিরে এলাম। জেট ল্যাগ এখনো কাটেনি। সন্ধ্যার দিকে একটু তন্দ্রা মত হয়েছিল, হটাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। গ্রামের এক বন্ধুর WhatsApp কল। ভয়ার্ত শোনালো বন্ধুর গলা। এই কয়দিনে বাদলের পড়াশোনার জ্ঞান কয়েকশো গুণ বেড়ে গেছে। তাকে মাস্টারমশাইরা কলেজে নিয়ে গিয়েছিল। বাদল নাকি সব ডিপার্টনেন্টাল হেডদের সঙ্গে তর্কাতর্কি শুরু করেছে। মুখে মুখে ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস, ইন্টেগ্রাল ক্যালকুলাস করছে। লিটারেচার-পলিটিকাল সাইন্স-ফিলোসফি-সাইকোলজি সব টিচার হতবাক। সময়ে অসময়ে জাপানী ভাষাতেও অনর্গল কথা বলছে। বাদলের বাবা আজ তাকে কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছে ডাক্তার দেখাবে বলে।

ধী কেও আজ একটু চিন্তিত দেখলাম। বাদলের খবরটা কানে যেতেই একটা অস্থির অস্থির ভাব। সবই ঠিক আছে, কিন্তু বাদল জাপানী ভাষায় কথা বলছে কেন? তার কোডে কী কোন ভুল ছিলো? হয়তো বাদলের কোন জিনে কোন তাৎক্ষণিক জেনেটিক মিউটেশান ঘটেছে? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। এজেন্ট ইনস্টলেশনের আগে বাদলের জিনোম সে বহুবার স্ক্যান করেছে। প্রত্যেকটা ক্রোমোজোম ধরে ধরে, প্রত্যেকটা জিন, প্রতিটি জেনেটিক কোড (এটিজি/সি) A টু Z কনফার্ম করে, সমস্ত মস্তিষ্ক কোষের প্রোটিন ও অন্যান্য কেমিক্যাল বিশ্লেষণ ও ভ্যালিডেশন করে তবেই সে “অগমেন্টেড এজেন্ট” ইনস্টল করেছে।

মানুষ মাত্রই ভুল করে, এটা এক সুপ্রাচীন ও সর্বজন বিদিত প্রবাদ বাক্য। কিন্তু ধী? মানুষের সংস্পর্শে থেকে থেকে সেও কি মানুষের দোষ গুণ পেয়েছে? যদিও “অগমেন্টেড এজেন্ট” কোডটা খুবই জটিল, শুধুমাত্র ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সকেই এনহ্যান্স করে না, এটা সার্বিক জেনুইন বুদ্ধিকে শত সহস্র গুণ এনহ্যান্স করার ক্ষমতা রাখে। বাদলর ক্ষেত্রে এটা একটা খুবই সিম্পল পাইলট প্রোগ্রাম। তাহলে “coding error” টা এলো কোথা থেকে?

“ধী, তুমি কী তোমার বন্ধু বাদলর খবরে খুব বিচলিত?” অস্বস্তি ভাবটা কাটাবার জন্য ধী-কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলাম। “তুমি কী কিছু বুঝতে পারছো বাদলের কী হয়েছে?”
হ্যাঁ বা না, কিছুই উত্তর না দিয়ে সে শুধুই নিজের মনে আবোধ শিশুর মতো বিড়বিড় করে বকে চলেছে। ও কী অন্য কোন ভাষায়, অন্য কারো সঙ্গে কথা বলছে? ধী-র কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে আমিও একটু বিচলিত হয়ে ধী’কে অবাক হয়ে দেখতে থাকি। খুব নিবিড়ভাবে রোবটটার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করি। অবাক হয়ে দেখি যে ওর মধ্যে শিশুর নমনীয়তার আর কোন চিহ্নই নেই, কোমলতার লেশমাত্রও দেখতে পেলাম না। মাঝে মধ্যেই কেঁপে কেঁপে উঠছে পুতুলটা, আর এক ধরনের অদ্ভুত রকমের blue ray বিচ্ছুরিত হচ্ছে ওর চোখ দুটো থেকে। ধী কী নিজেও কোন বিপদে পড়েছে?

হটাৎ কী মনে করে ওর পাওয়ার বাটন টা টাচ করে পুতুলটার সুইচ অফ করে দিলাম। আস্তে আস্তে বিড়বিড় করতে করতে ক্লান্ত শিশুর মতো ধী যেন ঘুমিয়ে পড়লো। আমিও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভাবতে থাকলাম। একবার ভাবি বাদলের ঠিক কি হযেছে? আর পরক্ষণেই ভাবি ধী-র কথা। ধী কী নিজের অজান্তে তার কোন “secret” তার বন্ধুকে দিয়ে ফেলেছে যেটা আর ফিরে পাবার নয়?

বাদলকে নিয়ে ওর পরিবার পরিজন খুবই চিন্তিত, সেটা খুবই স্বাভাবিক। কোলকাতার নামকরা মনস্তত্ত্ববিদ ও চিকিৎসকেরা হয়তো এই ধরনের কেস এই প্রথম ডায়াগনসিস করার চেষ্টা করবে। তাবৎ তাবৎ আধুনিক চিকিৎসককুল কী সিনথেথিক বুদ্ধি বিষয়ে ওয়াকিবহাল? তারা কী কোনদিন ধী-র বুদ্ধির কোন কুল কিনারা করতে পারবে?

Sahityika Admin

Add comment