সাহিত্যিকা

স্মৃতিচারণ রবি’দা (সৌমিত্র লাহিড়ী, ১৯৭৭)

স্মৃতিচারণ রবি’দা (সৌমিত্র লাহিড়ী, ১৯৭৭)
– সুমন্ত চৌধুরী, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
– অব্যয় মিত্র, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
– উত্তম খান সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
– অমিয় মল্লিক, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

সৌমিত্র লাহিড়ী (রবি’দা), ১৯৭৭ সালের প্রাক্তনী। আমরা তাঁকে হারিয়েছি গত মাসের তারিখে। ৭২-৭৭ সালের কয়েকজন তাঁর স্মৃতিচারণ করেছেন।

আমি, অমিয় মল্লিক ওঁর রুমমেট ছিলাম, চার বছর এক সাথে পাশাপাশি বেডেই থাকতাম। ওঁকে খুবই কাছে থেকে দেখেছি, আর অনেক কিছুই শিখেছি।
সবার আগে বলবো, রবি’দার ছিলো সুশৃঙ্খল স্বভাব, যা হস্টেল জীবনে খুবই বিরল। ছিলো আদ্যন্ত একজন ভদ্রলোক। বেশভূষার কথা বললে ও সবসময় ইস্ত্রী করা জামাকাপড়ে টিপটপ থাকতো। প্রথম দিকে, সপ্তাহের মাঝে রবি’দার বাড়ির বিশ্বস্ত কাজের লোক দুপুরের খাওয়ার সময় কাচা ইস্ত্রি করা জামা প‍্যান্ট, এমনকি অনেক সময় বড় টিফিন ক‍্যারিয়ার করে খাবারও দিয়ে যেতো।

রবি’দা ছিলো সঙ্গীতপ্রেমী। রবীন্দ্র সঙ্গীতের, বিশেষ করে দেবব্রতের (জর্জ বিশ্বাস খুব ভক্ত ছিল। কিছু টাকা পকেট মানি থেকে বাঁচলে, সোজা এসপ্ল্যানেড চলে যেতো দেবব্রত বিশ্বাসের রেকর্ড কেনার জন্য। জর্জ দার রেকর্ডসের এক অপূর্ব সংকলন ছিলওঁর কাছে। আমাদের ব্যাচের সুমন্তের স্ত্রী সঞ্চিতার গানেরও খুবই গুণগ্রাহী ছিল।
আর ছিলো বই এর সাথে প্রেম। P. G. Wodehouse এর লেখা কমিক নভেল সিরিজ পড়তে খুব ভালোবাসতো। ওর কাছ থেকেই নিয়ে প্রথম আমি Jeeves সিরিজ পড়ি।

ডন বস্কো স্কুলে সুমন্ত, রবি’দা আর অমৃতাভ (রয়, মেটালার্জি) ছিলো খুবই কাছের বন্ধু। তিন জন একই কলেজে ভর্তি হলেও হোস্টেল আলাদা আলাদা হওয়ার জন্য ও পরবর্তী সময়ে প্রফেশনাল কারণে সামনাসামনি যোগাযোগ অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু দূরে থেকেও বন্ধুত্ব আগের মতই বজায় ছিল। আমি (সুমন্ত) ওর পাইকপাড়ার বাড়িতে বহুবার গেছি। রবিদাও সস্ত্রীক আমার বিয়ের এনিভর্সারিতে রাজারহাটে এসেছিলো।

ফার্স্ট ইয়ারে ১৩ নম্বর হোষ্টেলের চারতলায় সব মার্কামারা ছেলেদের মধ্যে রবি’দা ছিলো কিছুটা স্বতন্ত্র। একটু আগেই বলা হয়েছে, সে ছিলো জেন্টলম্যান। অন্যদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন প্রকৃতির। এমনকি হোষ্টেলের খাবারও অনেক সময় ওঁর মুখে রুচতো না। হোষ্টেলে এসে এই সমস্যা অনেকেরই হয়েছিলো, কিন্তু পরে বাধ‍্য হয়ে সবাই এসবের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়। কিন্তু রবি’দার সমস্যা রয়েই গেলো।
একদিন রবি’দার বিশ্বস্ত কাজের লোক জামাকাপড় আর টিফিন নিয়ে আসতে দেরী করে। আর ওদিকে রবি’দা ক্লাসে চলে যায়। তখন রোজই হস্টেলের কেউ না কেউ দুপুরের ক্লাস কামাই করতো। সেইদিন রবি’দার ঘরে তালা। আর সেই লোকটি এসে রবি’দার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা তখন সেই লোকটিকে আপ‍্যায়ন করে একটা ঘরে বসাই। বলি, রবি’দা তোমার আসার কথা বলে গেছে। তখন লোকটি আমাদের বিশ্বাস করে যা যা এনেছিলো, আমাদেরকে দিয়ে চলে যায়। জামা প‍্যান্ট আমরা নিয়ে গুছিয়ে রেখে দি। এরপর টিফিন ক‍্যারিয়ার খুলে দেখি, বেশ অনেকগুলো লুচি, বেগুন ভাজা, আলুর দম, আর সন্দেশ। আমরা বললাম ও বলে গেছে, যে ওঁর শরীরটা ভালো নেই, তাই আমরা যেন কিছুটা খেয়ে ওঁর জন্য অল্প রেখে দি। সেই দলে সম্ভবত শ্রীদীপ, দৈত‍্য, গাগা, বানু, মেশোও ছিলো। আমরা সবাই নিজেদের মধ্যে ভাগ করে খেয়ে আর আগান্তুককেও জোর করে একটা লুচি ও আলুর দম খাইয়ে, খাতির করে সিঁড়ি অবধি পৌঁছে বলে ছিলাম, যে বাড়িতে শরীর খারাপের কথা যে সে না জানায়। এও জানিয়ে দিলাম যে দাদা সব ঠিক ঠাক পেয়ে যাবে।
এবার বিকেলের দিকে সবাই বারান্দা থেকে দেখছি, কখন রবিদা আসছে। দূর থেকে রবি’দাকে দেখা মাত্রই দৌড়ে যে যার ঘরে। ওর ঘরের বাইরে বারান্দায় একটা টেবিলের উপর জামা প‍্যান্ট আর টিফিন ক‍্যারিয়ারের ভেতর একটা লুচি আর একটু আলুর দম রাখা ছিলো। উঁকি মেরে দেখলাম, রবি’দা তালা খুলে বেশ প্রসন্ন চিত্তে, সব নিয়ে ঘরে ঢুকলো। এর কয়েক মিনিট পরেই চিৎকার করে ঘরের বাইরে এসে বলতে লাগলো সব বাঁদর আর জন্তুর দল। কে কে করছে জানতে চাই? বাড়িতে খেতে দেয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সবই খুব ভদ্র সম্বোধন, অশ্লীল কথা ওর মুখ থেকে বেরতো না।
ফল স্বরূপ, এরপর আর কোনদিন খাবার আর জামা-প‍্যান্ট এলো না।

১৩নং হোস্টেলের সেই “রক্তচোষা দিন”টায় আমরা সেই রাত্রিতে ধর্মতলা থেকে নাইট’শো সিনেমা দেখে হোস্টেলে ফিরে রাতে কোনমতে আধপেটা খেয়ে ৪ তলায় আমাদের ঘরে ঢোকার আগে দেখি ভালো ছেলের দল, যেমন রবিদা, লেবু এরা যথারীতি ঘুমিয়ে পরেছে। তখন আমি, শ্রীদীপ, অরূপ সবাই মিলে ওদের ঘরের দরজার ওপর দমাদ্দম আওয়াজ করে যে যার ঘরে পালিয়ে গেলাম। রবিদা ঘুম ভেঙ্গে উঠে দরজা খুলে কাউকে দেখতে না পেয়ে এদিক ওদিক দেখছে, এই সময় গাগা হঠাৎ বললো আমি তো দরজায় ধাক্কা মারিনি। উঠে বাইরে বেরিয়ে দেখি রবিদা চিৎকার করে বলে ওঠে “গাগা আমি তোর রক্ত চুষে খাবো”, ইত্যাদি।
ঘটনাক্রমে ২০২০ ডিসেম্বরে কলেজের মাঠে আমাদের শেষ মিটে এই কথাটি নিয়ে রবিদার সাথে আলাপ করায়, রবিদা উচ্চস্বরে হেঁসে উঠে বলেছিলো, আরে ওই সময়টাই তো আমাদের জীবনের এক স্মরনীয় ইতিহাস।

কর্মজীবনে রবি’দা অ্যান্ড্রু ইউল কোম্পানির কল্যাণীর বেলটিং ডিভিশনে ছিলো। মাঝে একসময় ও দুবাইতেও পোস্টেড ছিলো। কল্যাণীর অ্যান্ড্রু ইউল এর বেলটিং ডিভিশনের ফ্যাক্টরিতে অনেক কিছু ইনোভেটিভ ইঞ্জিনিয়ারিং আইডিয়ার সার্থক রুপকার আমাদের রবি’দা। কিন্তু এরপর কল্যাণীর ফ্যাক্টরি বিক্রি হয়ে যাওয়ায় খুবই মানসিক কষ্ট পায়। কেন জানি না, সব বিষয়ে রবিদা ধীরে ধীরে নিজেকে কেমন যেন গুটিয়ে নিতে শুরু করে দিলো। স্কুল লাইফে রবি’দাকে যেরকম এক্টিভ দেখা গেছে, বিভিন্ন বিষয়ে এত এনার্জেটিক, সেই রবি’দাই আস্তে আস্তে কম বয়সেই কেমন যেন নিষ্প্রভ ও উদাসীন হয়ে গেলো।

বন্ধুদের মধ্যে ও বড় অভিমানী ছিল। বোধহয় এই জীবন সম্বন্ধে অকাল নির্লিপ্ততা ওকে বড় তাড়াতাড়িই অন্য জগৎ-এ নিয়ে গেলো। আমার নিজেকেও আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না ।
রবি’দা খুব হাসছিস,তাই না? ক্ষমা করে দিস। যেখানেই থাকিস, ভালো থাকিস।
ওম শান্তি, ওম শান্তি, ওম শান্তি।

Sahityika Admin

Add comment