সাহিত্যিকা

অন্যরূপে বি ই কলেজের মাস্টারমশাইরা

অন্যরূপে বি ই কলেজের মাস্টারমশাইরা
রমা সিনহা বড়াল, ১৯৭৬, স্থাপত্য বিভাগ

আজ আমি যে কাহিনী বলবো, আশাকরি পাঠকদের ভালোই লাগবে। দেশেবিদেশে, শিক্ষার জগতে আমাদের শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাইদের পড়াশোনার বাইরেও যে বেশ কিছু পছন্দের ঘটনা ছিল, আজ সেই সম্পর্কেই কয়েকটি কথা বলবো। ওনারাও কিন্ত আপনার, আমার মতো একেবারেই মাটির কাছাকাছির মানুষ ছিলেন।

শুরু করি ষাটের দশকে বিই কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ডক্টর বরদানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কথা দিয়ে। বরদা জেঠু, আমাদের সবার প্রিয় জেঠু ছিলেন। উনি ছিলেন আমাদের “গল্প দাদুর” মতো, “গল্প বলা জেঠু”। আমরা ক্লাস টু / থ্রী পড়া বাচ্চারা নানা রকমের গল্প শোনার লোভে ওনার কাছে গিয়ে হাজির হতাম। কিন্তু একটা শর্ত ছিল। পাঁচটা করে পাকা চুল তুলে দিতে হবে। কাঁচা চুল তুললে, আরো চারটে তুলতে হবে। ভালো গল্প শোনার জন্য তাতেই রাজি হয়ে যেতাম। আমাদের কারোর নিজেদের বাড়িতে গল্প বলার দাদু বা দিদা না থাকায় সেই অভাব যৌথ পরিবারের জেঠুর মতো উনিই পূরণ করতেন।

জেঠু বাগান করতে খুব ভালবাসতেন। সাধারণত সব্জির গাছই লাগাতেন। আদালত দাদা বলে একজন মালি’দাদা ছিল। সেই জেঠুর বাগানের গাছের খুব যত্ন নিতো। মালিদাদার কাজ ছিল সার এনে দেওয়া, মাটি কোপানো, বীজ লাগানো, এইসব। এরপর জেঠু নিজেই পাইপে করে গাছে জল দিতেন। মাঝে মাঝে ,কোন সব্জির গাছ কেমন হয়, তার পাতা কেমন হয় সেগুলো আমাদেরকে চেনাতেন। সেই সাথে কোন সব্জি মাটির নীচে, কোনটা উপরে, কোনটা গাছ থেকে ঝোলে এগুলি ছোট বয়সেই চিনে গেছিলাম। কি সুন্দর খেলাচ্ছলে আমাদের প্রকৃতির পাঠ হয়ে যেতো! কালীপুজোর সময় উনি আমাদের সবার জন্য বাজি কিনে আমাদের সাথেই বাজি রোদে গরম করতে দিতেন। ওনার তত্ত্বাবধানে বাজি পোড়ানো হতো। ঘুড়ি ওড়াতেও শেখাতেন। দিনগুলো বেশ মজার সাথেই কাটতো।

এবার আসি আমার বাবা ডঃ শঙ্কর সেবক বড়ালের কথাতে। লাট্টু ঘোরানো ও ঘুড়ি ওড়ানো দুটোই ছিল বাবার খুব পছন্দের খেলা। লেত্তি দিয়ে লাট্টু ঘুরিয়ে ঘুরন্ত লাট্টু তুলে সেটাই হাতের চেটোর মধ্যে নিয়ে ঘোরানো ছিল বাবার খুবই প্রিয় খেলা। শুনেছি ছোটবেলা নেড়া ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে দোতলার ছাদ থেকে ছাইএর গাদাতে পড়ে গিয়ে বরাতজোর বেঁচে গেছিলেন, বেশি চোট লাগে নি। খুব ভাল তাস খেলতেন, কিন্ত সেটা আবার মা একদমই পছন্দ করতেন না। তাই বাবাকে আমরা তাস খেলতে বেশি দেখিনি। তবে আমার শ্বশুরমশাইএর সাথে বসে ভালোই তাস খেলতেন। আমাকে বলতেন “মা কে বলিস না, রেগে যাবে”। মা বলতেন “তাস, পাশা, নেশা তিন কর্মনাশা”। তাই বাড়িতে তাস ঢোকা বন্ধ ছিল।

বাবার আরেক নেশা ছিল কালীপুজোর সময়ে আমাদের সবাইকে নিয়ে তুবড়ি তৈরি করা। ভীষণ ভালো তুবড়ি তৈরী করতেন। নিজেই বড়বাজার থেকে দেখে, বেছে বেছে তুবড়ির খোল কিনে এনে একবালতি জলে ভিজিয়ে, দেখে নিতেন কোন ফুটো আছে কিনা। ফুটো থাকলেই বাতিল। সেই সঙ্গে হিসেবমতন সোডা, গন্ধক, লোহাচূর, ওজন করে নিয়ে আসতেন। বাগানের কুলগাছের ডাল পুড়িযে কাঠকয়লা তৈরি হতো। আমাদের একটা বড লোহার হামান দিস্তায় লোহাচূর, গন্ধক, কাঠকয়লা আলাদা আলাদা গুঁড়ো করে কাগজের প্যাকেটে মুড়ে রাখা হতো। সেই তুবড়ির মশলা তৈরির কাজে সবারই কিছু কিছু অবদান থাকতো। সোড়াটা মা শিলের পিছন দিক দিয়ে বেঁটে গুড়ো করে দিতেন। এরপর পাতলা কাপড় দিয়ে আলাদা আলাদা করে ছাঁকা হতো। তারপর যথাযথ ভাগে মশলা মিশিয়ে তুবড়ির মশলা তৈরির কাজ হতো। তারপর তুবড়ির খোলে মশলা চেপে ভরে দিতাম। সেটা ঠিকমতন না করলে সব মশলা পড়ে যেতো। শেষের কাজটি ছিলো বাগানের থেকে নরম মাটি এনে তুবড়ির মুখ মাটি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া। আর তুবড়ির গর্তর দিকটা ছোট কাগজের টুকরো মযদার লেই এর আঠা দিয়ে ঢাকা দিয়ে দেওয়া হতো। জ্বালানোর সময ফুলঝুরির পিছন দিযে কাগজ ফুটো করে জ্বলন্ত ফুলঝুরি দিযে তুবড়িতে আগুন ধরিয়ে দিতাম। সবটাই হতো বাবার নজরদারিতে। তুবড়ির ফুলকি যতো উপর যেতো ততোই আনন্দ হতো। একটাও তুবড়ির খোল ফাটতো না। আমাদের সাথে বাবাও খুব আনন্দ উপভোগ করতেন।

বাবা রান্না করতেন দারুণ। বিশেষ করে মাংস রান্না। রান্নাঘর ছিল মাযের দায়িত্বে। মা অসুস্থ হলে বাবাকেই রান্না করতে দেখেছি। সেদিন খিদেও বেশি পেতো। খেতাম ও বেশি।
বাবা অসুখের লক্ষণ দেখে খুব ভাল হোমিওপাথি ওষুধও দিতেন। এটাও একটা শখের নেশা ছিল। ছোটবেলায আমাদের বাড়ির বা ক্যাম্পাসের অনেক বাচ্চার ঐ হোমিওপাথি ওষুধ খুব কাজ দিতো। কলেজ স্ট্রিট এর নামী হোমিওপাথি ওষুধ কিং কোম্পানির দোকান থেকে বাবা ওষুধ আনতেন।
বাবার আর নেশা ছিল সিগারেট খাওয়ার। বাবার ছাত্ররা যেমন সিগারেট হাতে বাবার সামনে পরে গেলে হাত পিছনে করে লুকাতো, বাবাও তেমন নিজের মাস্টারমশাইদের সামনে পরে গেলে সিগারেট লুকিয়ে ফেলতো। সেদিকে গুরু শিষ্য একই পরম্পরা।

এবার বলি আরও একজন ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় মাস্টারমশাই এর কথায। ডক্টর শঙ্কর সেনও ছিলেন খুব ছাত্র দরদী মানুষ। মন্ত্রী হলেও ওনার কাছে ছাত্রছাত্রীরাই ছিল আগে তাই অনায়াসেই মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেন। উনি কিন্ত পড়াশোনার বাইরেও অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন। ছোট বাচ্চাদের খুব ভালবাসতেন, মজার মজার গল্প বলতেন। গান ও ভালোই গাইতেন।
খুব ভাল সেলাই করতেন। ভাল সেলাই করার পরিচয় পাই, যখন আমার সদ্যোজাত ছেলেকে নিযে বি ই কলেজের বাড়ি আসি। পাড়ার কাকিমা, মাসিমারা ওর জন্য ছোট ছোট জামা ,সুন্দর সুন্দর কাঁথা তৈরি করে নাতির মুখ দেখতে আসতেন। আমার ছেলে পলাশ ছিল ক্যাম্পাসের প্রথম নাতি। তাই আদর ও বেশি ছিল। বুলুকাকিমা, শঙ্কর কাকু ওঁর জন্য অনেকগুলো পাতলা, নরম সুন্দর সুন্দর জামা নিয়ে এসেছিলেন। কাকিমাই তৈরি করেছিলেন। আর কাকু তাতে ফিতে বাধার ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে দরকার হলে সহজেই জামা পাল্টানো যায। কাকু খুব ভাল এমব্রযডারি কাজও করতে পারতেন।
এরকম ফিতে লাগানো জামা যাদবলাল কাকুর স্ত্রী শ্যামলীদি ও তৈরী করে দিতেন।

খেলার মাঠে অনেক মাস্টারমশাইদেরই দেখা যেতো। টেনিস কোর্টের লনে, ওভালের মাঠে, ব্যাডমিন্টন কোর্টে, সুইমিং পুলে মাস্টারমশাইরা নিয়মিত যেতেন। প্রফেসর রাধাকৃষ্ণ দত্ত (ভুপালকাকুর ছোট ভাই) তো ছেলেদের সাথে রীতিমত বাস্কেটবল, ফুটবল খেলতেন আর সাঁতারেও নামতেন। সাঁতারে ভালো ছিলেন অরুণ শীল কাকু, শান্তিজীবন কাকু, ভুপাল কাকু আর তপেন মৌলিক কাকুও। তবে সাঁতারে সেরা ছিলেন ইলেকট্রিক্যালের নির্মল চন্দ্র কাকু। এনারা সবাই কলেজের এন্যুয়াল সুইমিং কম্পিটিশনে ছেলেদের সাথে পুলে নামতেন। নির্মল কাকু বহুবার স্টেট লেভেলে ওয়াটারপোলো খেলতেন। ওনার দাদা বিমল চন্দ্র, পেশায় ডাক্তার, ১৯৪৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে আর ১৯৫১ এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। এশিয়ান গেমসে উনি দুটো ব্রোঞ্জ মেডেল জিতেছিলেন। ১৯৫৯ সালে টানা ১৩ ঘণ্টা ৫০ মিনিট সাঁতার কেটে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়েছিলেন।

আরও অনেকেই নানান রকমের খেলাতে মাঠে নামতেন। টেনিস খেলতেন প্রিন্সিপাল অতুল চন্দ্র রায়, প্রফেসর পরেশ নাথ চ্যাটার্জি, প্রফেসর দুর্গাদাস ব্যানার্জি, প্রফেসর কল্যাণ ব্যনার্জী, আরো অনেকেই। এখন তো কলেজের টেনিস লনের অবস্থা দেখে চোখে জল এসে যায়। বাডমিন্টনও খেলতেন সবাই। কাকিমা, কাকুদের মিক্সড ডাবলস, সিঙ্গল ম্যাচ প্রতিযোগিতা হতো। অলকা কাকীমা (কেমিস্ট্রির প্রফেসর বসাকের স্ত্রী) তো খুবই ভালো ব্যাডমিন্টন আর টেনিস খেলতেন। আর কলেজের স্পোর্টস, বা বাইরের কলেজের সাথে ম্যাচ, এমনকি কলেজের নিজেদের মধ্যে ইন্টার ইয়ার, ইন্টার হস্টেল, ইন্টার ডিপার্ট্মেন্টের খেলাগুলোতেও প্রফেসর যাদবলাল চক্রবর্তী, প্রফেসর ভূপাল দত্ত, প্রফেসর পিপি দাস, প্রফেসর শোভেন রয়, প্রফেসর তপেন মৌলিক, এবং আরও অনেককেই সবসময়য়ই মাঠে দেখতে পেতাম। প্রফেসর অনিল কুমার চোধুরী হতেন স্পোর্স্টের স্টার্টার। ফুটবলটা খালি আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের গোবিন্দকাকুকেই খেলতে দেখেছি। তবে স্টাফ ফুটবল টিমের পার্মানেন্ট গোলকিপার ছিলেন অটোমবাইল ওয়ার্কশপের অমিয় রায় কাকু।

যাদবকাকুর একটা নেশা ছিল হাত দেখে ভবিষ্যৎবাণী করা। জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। পরীক্ষার ফল, প্রমোশন, বিয়ে ইত্যাদি নানান কারনে ওনার কাছে ছেলেমেয়েরা ভিড় করতো। অনেক সময় দেখেছি লেডিস হস্টেল থেকেও মেয়েরা হাত দেখাতে যেতো কবে বিয়ে হবে জানার জন্য। উনি নাটক ভালোবাসতেন। শুধু কলেজের ছেলে নয, ক্যাম্পাসের বাচ্চাদের নিযেও নাটক করাতেন, পরিচালনা করতেন। একবার “লক্ষণের শক্তিশেল” নাটক করিযেছিলেন। খুব ভাল হয়েছিল।

গান শুনতে সকলেই ভালবাসতেন। তবে গান গাইতেন ও চর্চা করতেন মেটলার্জীর প্রফেসর পঞ্চানন দাস। ভাল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গাইতেন। অনেকেই ওনার কাছে গান শিখতো। স্পোর্টসের দিনে মাইকে ক্লাসিক্যাল সারেগামা গেয়ে উনি মেয়েদের মিউজিক্যাল চেয়ার ইভেন্ট কন্ডাক্ট করতেন। আরেকটা শখ ছিলো ওনার, কুইজ। এটা অবশ্য উনি কলেজের ছাত্রদের সাথেই করতেন। ছাত্রদের দাবীতে উনি ইন্সটিটিউট হলে বেশ কয়েকবার কুইজ শো করেছেন। এমনকি হস্টেলে গিয়েও কুইজ করিয়ে এসেছেন।
প্রফেসর অনিল চৌধুরীর গানের গলাও বেশ ভাল ছিল।

কলেজর রিউনিয়নে, ক্লাবের ফংশানে নাটক, অভিনয়ে নাম ছিল প্রফেসর ভঞ্জ, প্রফেসর যাদবলাল চক্রবর্তী, প্রফেসর প্রদীপ রায়ের ও আরো অনেকের। ওনাদের করা নাটক এককথায় ছিলো অনবদ্য। বিশেষ করে রিউনিয়ন এর সময ছাত্রশিক্ষকদের মিলে নাটকগুলি যে শুধুই অপূর্ব হতো, বা প্রশংসনীয় ছিল, এমন নয়। এই নাটকগুলি অনেকের স্মৃতিতেই বি ই কলেজের ছাত্রশিক্ষক বন্ধনের সাক্ষী হয়ে আছে।

আর একটা ঘটনা না বললেই নয়, তা হল মাস্টারমশাইদের মাছ ধরার নেশা। প্রফেসর পঞ্চানন দাস, প্রফেসর শ্রীমানি, প্রফেসর গোবিন্দ চন্দ্র রায়, ওনারা অসীম ধৈর্য সহকারে নিমঝিলে মাছ ধরতেন। মাছ ধরার প্রতিযোগিতাও হতো।

শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাইদের পডাশোনার বাইরের জগতটাকে সমানভাবে ভালবাসা যতো দেখতাম ততোই ভালো লাগতো। আরো অনেকেরই কথা হয়তো বাদ পরে গেলো। সবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলি, আপনাদের এ ভাবে দেখেছি বলেই নিজেদের তৈরি করতে পেরেছি। আজকের এই প্রতিযোগিতার দিনে আমরা অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলছি। প্রতিযোগিতা সে সমযও ছিল। কিন্ত এতো প্রকটভাবে তার প্রকাশ ছিল না। বর্তমান প্রতিযোগিতা মন্দ কি ভাল জানিনা। আগামীকাল বা সময়ই তার বিচার করবে।

Sahityika Admin

Add comment