সাহিত্যিকা

কাছাকাছি

কাছাকাছি
সমীর কুমার সরকার, ১৯৭৭ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
সুপ্তা এক কাপ চা নিয়ে চিত্তর টেবিলে বসতেই চিত্ত বিরাট এক বিষম খেলো। একটু স্বাভাবিক হতেই সুপ্তা এক গ্লাস জল ধরল ওর মুখে। সুপ্তা বললো, নে, কচুরিটা শেষ কর। চিত্ত কচুরির শেষ টুকরোটা মুখে পুরে জল খেয়ে বেসিনের দিকে উঠে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে ভাবছে, এবার কী করবে, ক্লাসে ফিরে যাবে, না সুপ্তার কাছে গিয়ে বসবে!
চিত্ত আর সুপ্তা একই ইয়ারে পড়ে। চিত্ত সিভিল, আর সুপ্তা আর্কিটেকচার। চিত্ত খুবই ভাল ছেলে। প্রতি বছর ভালো রেজাল্ট করে। স্ট্রাকচারের অঙ্ক থেকে সিভিলের খুঁটিনাটি সব ওঁর নখদর্পনে। আর্কিটেকচারের সাথে সিভিলের অনেক পেপারের মিল থাকায়, আর্কিটেকচারের ছেলেরাও চিত্তর কাছে পড়তে যায়, বিশেষ করে স্ট্রাকচরাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর স্ট্রেংথ অফ মেটেরিয়ালসের মত কঠিন কঠিন পেপারগুলো। মেয়েদেরও ইচ্ছে করে চিত্তর থেকে কঠিন পেপারগুলো বুঝে আসার জন‍্য, কিন্তু চিত্ত কোন মেয়ের সাথে কথা বলে না। ছেলেদের  সাথে ক‍্যান্টিনে বা খেলার মাঠে এমনকি কলেজের গেটেও চিত্তকে দেখা যায় না। সবসময় হোস্টেলেই বই নিয়ে পড়ে থাকে আর হোস্টেলের ক‍্যান্টিনেই খাওয়া দাওয়া করে। কিন্তু যদি কেউ ওর কাছে অঙ্ক বুঝতে যায়, তখন সে ওগুলো করেও দেয়, বুঝিয়েও দেয়। মেয়েরাও চিত্তর সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়, ওর কাছে পড়তে চায়, কিন্তু চিত্ত মেয়েদের সাথে একদমই মেলামেশা করে না। কিন্তু এই লম্বা, সুঠাম গঠনের সুদর্শন ছেলেটাকে দেখলেই সুপ্তার চিত্তচাঞ্চল্য শুরু হয়।
চিত্ত কি পয়সা মিটিয়ে চলে যাওয়ার জন‍্য দাঁড়িয়ে? যদি চলে যায় তাহলে কি ওকে ডাকা ঠিক হবে? কেমন ছেলে রে বাবা? ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে প্রত‍্যেক ছেলেরাই মেয়েদের গা ঘেঁষে থাকার জন‍্য কতরকম চেষ্টা করে, এই তো বিমল, আমার পেছনে কেন যে ঘুরঘুর করে, আমি নিজেও বুঝি না? আমাকে ক‍্যান্টিনে দেখলেই খাওয়ার পয়সাটা দিয়ে দেয়। বাড়ি থেকে আমাকে যে পয়সা দেয় তাতে আমার টানাটানিই হয়, সেটা বিমলের থেকে পুষিয়ে নিই। রাস্তাঘাটে ঘুরি, ‘জ‍্যাঠামশাইয়ে’র দোকানে গিয়ে রাবড়ি, মিষ্টি খাই কিন্তু যখন ওভালে বা লর্ডসে সন্ধ‍্যেবেলায় বসতে বলে, তখন বসি না। ধর্মতলায় ঘুরতে যাওয়ার জন‍্য কতই না জোর করে, আমি ওর সাথে কোথাও যাই না, এমনকি ‘লিপি’তেও না। ওকে আমি একদম পছন্দ করি না। কিন্তু নিজের স্বার্থেই ওকে দেখলেই হাসি আর দুবেলা টিফিনটা ওর খরচেই চালাই।
কিন্তু চিত্ত ভাল ছেলে। ওর সাথে বন্ধুত্ব করতেই আমি রাজি। চিত্তটা কী করছে, আসবে? না চলে যাবে?
এখন তো আমার ক্লাস নেই। পিঠে হাত দিয়ে আমি চাপড়ে দিলাম, জল এনে দিলাম, আমাকে কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে চলে যাওয়া টা কি ঠিক হবে?
– কী রে, এখন কেমন লাগছে?
– ভালো,
– হঠাৎ বিষম খেলি কেন?
– এমনি,
– এমনি? না কারোর কথা ভাবছিলি,
– মানে? কার কথা ভাবব?
– কেউ ভাববার নেই? আশ্চর্য?
– আশ্চর্যের কী আছে? বুঝলাম না।
– আচ্ছা, ছাড় এসব কথা। তুই আজকে ক‍্যান্টিনে খাচ্ছিস কেন?
– সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছিল বলে আর খাওয়ার সময় পাই নি। সেইজন‍্য এখন অফ পিরিয়ডে এসেছি।
একদম যাকে বলে নিরুত্তাপ রেসপন্স। সুপ্তা ভেবে পায় না এর পরে চিত্তর সাথে আর কিভাবে কথা বলবে? চিত্তর ব্যাপারে ছেলেদের থেকেও কোন খবর পায় নি। কোন কথায় সে খুশী হবে, কোন কথায় রাগ করবে এটা জানতে না পারলে ওর সাথে কী নিয়ে কথা বলব?
আর চিত্তও ভেবে উঠতে পারে না সুপ্তার সাথে সে কি বিষয়ে সে কথা বলবে। পড়াশোনার আলোচনার মানেই হয় না। চিত্ত সিনেমাও দেখে না। চিত্ত ভাবছে, সুপ্তাই বলুক। ওদিকে ‘কটকটি সুপ্তা’ আজ চিত্তর সামনে কেমন যেন চুপসে গেছে।
ভোরবেলায় সবার ক্লাস থাকায় ক‍্যান্টিনে ভিড় নেই। বেঞ্চের দুদিকে মুখোমুখি দুজনে বসেছে। সুপ্তাই কথা বলা শুরু করল। “তুই কলেজের পরে কী করিস?”
– হস্টেলে থাকি,
– বাইরে বেরোস না? খেলাধুলা? সিনেমা?
– মাঝে মাঝে বেরোই। মাঠে গিয়ে খেলা করা পোষায় না, আর সিনেমা ভালো লাগে না।
এবার চিত্ত সুপ্তাকে প্রশ্ন করলো, “তুই কী করিস?”
– আমি? আমি আর তোর মতো ঘরে বসে থাকি না। কলেজ থেকে ফিরেই বেরিয়ে পরি। কখনো দেখবি আমরা মেয়েরা ওভালে বসে ছেলেদের ফুটবল খেলা দেখছি, কখনো আবার সেকেন্ড গেটে গিয়ে দু চারজন মিলে কেনাকাটি করি, তারপর যে যার বয় ফ্রেন্ডদের সাথে ঘুরে বেড়াই। তুই তো সাহেব পাড়ায় থাকিস? তোদের পাড়া থেকে ছেলেরা তো আমাদের হোস্টেলে নীচে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রাজুকে চিনিস তো?
– হ‍্যাঁ, আমারই হোস্টেলে থাকে,
– খেয়াল করেছিস, বিকেলে কেমন সে সেজেগুজে এসে স্নেহার সাথে ঘোরে? আর কিছু মেয়ে তো তোদের, মানে, ছেলেদের হোস্টেলেও যায়। দেখিস নি কাউকে?
– দেখেছি, আমাদের ব‍্যাচের দোয়েল আসে।
এবার চিত্ত চুপ করে গেলো। ওকে চুপ থাকতে দেখে সুপ্তাই খুঁচিয়ে দিলো, “আর কাউকে দেখিস নি?”
– হ্যাঁ, সিনিয়ার, জুনিয়ির  মেয়েদেরও দেখি, তবে সবার মুখ চিনি, নাম জানি না।
– কার কার নাম জানিস?
– ছাড় ওসব কথা,
সুপ্তা দেখল চিত্তর ফর্সা মুখটা কেমন লাল হয়ে গেছে। সে সুপ্তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারছে না। বারবার ঘড়ি দেখছে।
– এত ঘড়ি দেখছিস কেন? তোর তো এই ক্লাসটাও হবে না। স‍্যার নেই,
– তুই জানলি কী করে?
– ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে সবদিক খেয়াল না রাখলে চলে? কে ভালো, কে খারাপ, কে কোথায় কী করছে, সব খেয়াল রাখতে হয়। তুই শুনবি? তোর সম্বন্ধে কী জানি?
– আমার সম্বন্ধেও?
সুপ্তার মনে হচ্ছে চিত্ত এবার স্বাভাবিক হচ্ছে। মানে সুপ্তা যেরকমটি চায়। তাহলে আড্ডাটা আরো একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে।
এবার একদল ছেলেমেয়ে ক‍্যান্টিনে ঢুকলো। “আরে, কাকে দেখছি?” বলেই প্রবাল চিত্তর ঘাড়ে এত জোরে একটা চাপড় মারলো, যা দেখে সুপ্তাই ঘাবড়ে গিয়ে বললো, “কি, করছিস কী? এত জোড়ে মারতে হয়?”
সুদেষ্ণাও সুপ্তার সাথে প্রবালকে বললো, এটা ঠিক করলি না।
আজ অনেক মেয়ে এসেছে। সুদেষ্ণা, সুপ্তা, স্নেহা, রুমেলী। চিত্তর খারাপ লাগছে না। কিন্তু চিত্ত এতক্ষণ যদিওবা একটু আধটু কথা বলছিল, এখন লজাই হোক, বা নিজের জড়তাই হোক, সে আর কিছু বলছে না। পাশেই প্রবাল, শোভনরা চা নিয়ে সিগারেট ধরিয়ে সাহেবপাড়ার সিনেমার সবজান্তা আলোচনা শুরু করে দিয়েছে। আলোচনার বিষয়বস্তু চিত্তর ভালো লাগছে না। ব্যপারটা বুঝে সুপ্তা বলল, “চল চিত্ত, ক্লাস শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে।“
সুদেষ্ণা তো অবাক! “আমাদের ক্লাসের তো দেরী আছে। চিত্ত যাচ্ছে যাক! তুই বোস।“
সুপ্তা বহুদিন থেকে চেষ্টা করছে, এই ছ’ফুট লম্বা, ফর্সা, নায়কোচিত রুপের অধিকারী, সর্বোপরি দুর্দান্ত পড়াশোনা করা ছেলেটার সাথে আলাপ করতে, সুন্দর একটা সম্পর্ক তৈরি করতে। আজকে যখন সুযোগ হয়েছে তখন অন্য বন্ধুদের জন‍্য চিত্তকে সে হারাতে চায় না। সে কারোর কথা না শুনে চিত্তকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। চিত্তরও আজ খুব ভালো লাগছে। এই প্রথম ।
সুপ্তা সবার সাথেই কথা বলে। যার জন‍্য ওর নামই হয়ে গেছে ‘কটকটি সুপ্তা’। শঙ্কর সুপ্তাকে একবার বলছিলো, কি রে, কাকে পাকড়েছিস? সুপ্তা শুনে হেসেছে। আর শঙ্কর চিত্তর কানে কানে বলেছিলো, “ছাড়িস না! এরকম কলেজে আর নেই।“ সুপ্তার কানেও কথাটা এসেছিলো।
সেকেন্ড লবি দিয়ে যেতে যেতে সুপ্তা বললো, “একটু দাঁড়া না! তোর তো এখন ক্লাস নেই।“
সুপ্তার শরীর দিয়ে হটাত কেম্ন যেন ঠান্ডা রক্ত বয়ে গেলো। সে আর দাঁড়ালো না, বলল, পরে দেখা হবে।
দুজনেই একই সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে দুজনের ডিপার্টমেন্টে চলে গেল‌।
বিমল রোজকার মতো আজও এসেছে লেডিস হোস্টেলের নীচে। সুপ্তা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলে দিল, আজ সে বেরোবে না। বিমল ওকে নীচে আসতে বললেও সুপ্তা আসছে না। রাজুর সাথে যখন স্নেহা বের হচ্ছে, তখন বিমল স্নেহাকে জিজ্ঞেস করল, সুপ্তার কী শরীর খারাপ? স্নেহা বলল, ঠিক বলতে পারছি না। আজকে ক্লাসেও দেখছিলাম আনমনা ছিল। হোস্টেলে এসেও দেখছি গম্ভীরভাবে চলাফেরা করছে। আমরা খেয়াল করেছি। অনেকবার জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলল না।
– ওর বহরমপুরের বাড়ি থেকে কি কোনো চিঠি এসেছে?
– ঠিক জানি না রে।
রাজু স্নেহা চলে যাওয়ার পরে একে একে ভোঁদর, ইঁদুররাও বেরিয়ে গেল, কিন্তু কটকটিটা নীচে নামল না।
সাতদিন হয়ে যাওয়ার পরেও চিত্তর সাথে দেখা না হওয়ায় এবার ভাবছে সে কী করবে? ওর হোস্টেলে অঙ্ক বোঝার অজুহাতে যাবে? না কি সোমবার কলেজে দেখা করবে। চিত্তর বাড়ি দূরে হওয়ার জন‍্য সে শনিবারে হোস্টেলেই থাকে, আমিও তো শনিবারে বাড়ি যেতে পারি না। তাহলে তো যাওয়াই যেতে পারে! কিন্তু একা যাওয়াটা কী ঠিক হবে? আবার যদি অন‍্য কোন মেয়েকে নিয়ে যাই, তাহলে সে নিজেই যদি চিত্তর সাথে সম্পর্ক তৈরী করে ফেলে? চিত্তটা তো সাদাসিদে লোক। এসব কিছু বোঝে বলে তো মনে হয় না। আমার মনের কথা আমি চিত্তকে জানাব কী করে?
রবিবার সকালে সুপ্তা দশটার সময় তৈরী হয়ে চিত্তর হস্টেলের দিকে যাচ্ছে। সাথে লুকানো দু লাইনের একটা চিঠি। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে ক্লক টাওয়ার পার করে উল্ফের সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বরুণের সাথে দেখা হয়ে গেলো। বরুণটা বড্ড ফাজিল। ছেলে মেয়ে সব ওর কাছে সমান। মুখে কিছুই আটকায় না। কথা শুরু ও শেষের মধ‍্যে এমন সব কথা থাকে যেগুলো সভ‍্য সমাজে উচ্চারণ করা যায় না। সুপ্তার রাস্তা আটকিয়ে একের পর এক সে বাজে কথা বলে সময় নষ্ট করে দিলো। কোনোরকমে বরুণের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে এসে পড়ল কলেজের বড় রাস্তায়, এখান থেকে সোজা গিয়ে রিচার্ডের সামনে দিয়ে গেলেই চিত্তর হোস্টেলে যাওয়া যাবে।
– কোথায় যাচ্ছো?
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে ওদের আর্কির এক প্রফেসর।
– স‍্যার, একটু গেটের বাইরে যাবো,
– চলো, আমি ঐদিকেই যাচ্ছি।
সুপ্তার গড়িমসি দেখে স‍্যার বললেন, আমি এগোচ্ছি, কেমন? তুমি পরে এসো।
সুপ্তা পারল না চিত্তর হোস্টেলে যেতে। সে ফিরে গেল নিজের ঘরে।
সন্ধ‍্যেবেলায় বিমল বাড়ি থেকে সোজা এসেছে সুপ্তার হোস্টেলে। আজকে সে দেখা করল বিমলের সাথে। মনে মনে ভেবে নিয়েছে যে চিত্তর সাথে বন্ধুত্ব হলেও সে বিমলের সাথে যোগাযোগ রাখবে নাহলে ওর মাস চালাতে অসুবিধা হবে। বিমল জিজ্ঞেস করল, “কালকে কী হয়েছিল?”
– সেরকম কিছু হয় নি। শরীরটা খারাপ লাগছিল, সেইজন‍্য তোর সাথে দেখা করি নি,
– আজকে কেমন আছিস?
– দেখতেই তো পারছিস?
– চল তাহলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসি।
সুপ্তাও ভাবল মনটা হাল্কা করার জন‍্য হাঁটাই যাক।
প্রত‍্যেক শনিবারে বেশীরভাগ ছেলেরা বাড়ি চলে যাওয়ার জন‍্য হোস্টেলটা ফাঁকা হলে, চিত্তর পড়াশোনা ভালো হয়, কিন্তু এবার একদম পড়তে পারলো না। সারাদিন একা একা কিভাবে যে সময় কেটে গেল বুঝে উঠতে পারছে না। বিকেলবেলায় শঙ্করদা এসে যদি দরজা না ধাক্কাতো তাহলে সে বুঝতেই পারত না যে সন্ধ‍্যে হয়ে গেছে, অথচ সে কিন্তু ঘুমায় নি। শঙ্করদার ক‍্যান্টিনের খাবার খেয়ে আবার ঘরের মধ‍্যে বসে আছে। লাইটটা পর্যন্ত জ্বালালো না। সাতটার সময় গৌতম বাড়ি থেকে ফিরে সোজা চিত্তর ঘরে ঢোকে। আজকে নীচের থেকে দোতলার ঘর অন্ধকার দেখে গৌতম ভাবল সে ঘরে নেই। চিত্তর পাশের ঘরেই গৌতম থাকে। সে চিত্তর ঘরের দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল। অন‍্য বন্ধুরাও এসে গেল। চিত্তর রুমমেট দুজন সকালে আসে।
যখন রাত দশটা হয়ে গেল, তখনও চিত্তর ঘর বন্ধ দেখে গৌতম বারান্দায় এসে দেখল, চিত্তর ঘরে কোনো তালা নেই অথচ ঘর অন্ধকার। সে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে ও বন্ধুর নাম ধরে ডাকছে। গৌতমের সাথে সুবীর, বিমানরাও দরজা ধাকাচ্ছে। চিত্ত দরজা খুলতেই সবাই জিজ্ঞেস করল, কি রে শরীর ভালো আছে তো? চিত্ত হেসে বলল, কটা বাজে রে? তারপর নিজেই ঘড়ি দেখে লজ্জা পেয়ে ওদের সাথে ডাইনিং হলে গেল।
আজকে কিছুই পড়তে পারে নি। চিত্তর সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ‍্যেস থাকলেও আজকে অনেক সকালে উঠে তৈরী হয়ে গেছে, তখনও শঙ্করদার ক‍্যান্টিন খোলার সময় হয় নি। সকাল সাতটা থেকে ক্লাস। আজকে একটার পর একটা ক্লাস থাকায় কলেজ ক‍্যান্টিনেও যেতে পারবে না। এমনিতে সে ক‍্যান্টিনে যায় না কিন্তু ওর জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে সেটার জন‍্য ওকে মাঝেমধ‍্যে ক‍্যান্টিনে যেতেই হবে।
সেদিন সকালে শঙ্করদার ক‍্যান্টিন থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতেই গৌতম, সুবীররা বলছে, এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছিস কেন?
– একটু দরকার আছে।
কলেজের সেকেন্ড লবিতে চিত্ত দাঁড়িয়ে আছে। এখনও কোনো ছেলেমেয়ে আসে নি। এত তাড়াতাড়ি কেউ আসেও না। চিত্তও কোনোদিন এই সাতসকালে আসে নি। আজকে এসেছে। দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্তা ওর নিজের সময়েই আসছে। সাথে অনেকগুলো মেয়ে। ওরা একসাথেই কলেজে আসে, একসাথে চলাফেরা করে, শুধু নিজের নিজের পার্টনারের সাথে ঘোরার সময় আলাদা থাকে। ফার্স্ট লবির কাছে আসতেই সুপ্তা চিত্তকে দেখতে পেয়ে হোঁচট খেতেই রুমেলী বলল, কী রে চটিটা ছিঁড়ে গেল নাকি?
কয়েকদিন ধরে দুজনের দেখা সাক্ষাত হচ্ছে না। সুপ্তাও বিমলকে খুব একটা সময় দিচ্ছে না। একটা না একটা অজুহাত দিয়ে বিকেল বেলায় বিমলের সাথে ঘোরা বন্ধ করে দিয়েছে। বিমল রোজ নিয়মমত লেডিস হোস্টেলে আসে, কোনোদিন সুপ্তা নীচে এসে বলে যে আজ শরীরটা ভাল নেই আবার কোনোদিন বলে sessional টা এখনও complete হয় নি, সেজন‍্য বের হতে পারবে না। বিমল ফিরে যায়। কোনো সন্দেহ হয় না। কলেজে ভর্তির কয়েক মাস পর থেকেই ওদের সম্পর্কটা গড়ে উঠেছে। বিমল অনেকবার সুপ্তাকে প্রপোজ করার চেষ্টা করলেও সুপ্তা এড়িয়ে গেছে তবুও বিমলের মনে কোনো দুঃখ হয় নি। সুপ্তা যেভাবে ওর সাথে কলেজে মেশে, বিকেলে ঘুরতে বেরোয়, তাতে বিমল একেবারে নিশ্চিত যে সুপ্তা হয়ত পরিষ্কার করে কিছু না বললেও সে তার প্রতি অনুরক্ত, আকৃষ্ট।
কটকটির মধ‍্যে স্বভাবসিদ্ধ চপলতা দেখা যাচ্ছে না। আজকাল ক‍্যান্টিনেও যায় না। অবসর সময়ে ডিপার্টমেন্টেই থাকে। আর্কির ফাইনাল ইয়ারের ছেলে মেয়েদের এত বেশী ড্রইংয়ের চাপ থাকে সেজন‍্য জুনিয়াররা ওদের ড্রইং করে দেয়। এই নিয়মটা অতীতকাল থেকেই ‘বি ই কলেজে’ চলে আসছে। প্রফেসাররাও জানেন। জুনিয়াররা কলেজে যেমন সিনিয়রদের সাহায‍্য করে সেভাবে তারা ছেলেদের হোস্টেলে গিয়েও ড্রইং করে দিয়ে আসে। সুপ্তা অবশ‍্য আজ পর্যন্ত ছেলেদের হোস্টেলে যায় নি। ইঁদুর ভোঁদররা তো সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকেই এই কাজ করে। কলেজে এই কাজকে সবাই ‘ঘোড়া খাটা’ বলে।  এবার সুপ্তাও ঘোড়া খাটার ইচ্ছে জানাতেই অনেকেই ওকে ‘ঘোড়ী’ করার কথা বলল, কেন কি সুপ্তা খুব ভালো ড্রইং করে। ছেলেরা বেশী করে ওকে চাইছে কারণ ড্রইং ছাড়াও সুপ্তা পাশে থাকলে মনটা চনমন করবে, বাইরে কোথাও যেতে মন চাইবে না, প্রজেক্টের কাজও খুব ভালভাবে এগোবে। সে শ্রাবণীদির সাথে কাজ শুরু করাতে ছেলের দল মনঃক্ষুণ্ণ হলো। সুপ্তা এখন নিজের কাজ ছাড়া শ্রাবণীদির কাজ করে বলে বিমলের সাথে একদম বের হয় না।
চিত্ত রোজ ঘরের মধ‍্যে যোগব‍্যয়াম করে। একদিন বিকেলে ব‍্যয়াম করতে করতে অন‍্যমনস্ক হয়ে যায়। ডান পায়ে টান লাগে। আস্তে আস্তে পা ফুলে যাওয়ার জন‍্য নীচে ডাইনিং হলে যেতে পারল না। শঙ্করদা খাবার দিয়ে গেল। বাইরের ওষুধের দোকান থেকে ক্রেপ ব‍্যান্ডেজ আনিয়ে ও ব‍্যথা নিরসনের জন‍্য pain killer এনেও ব‍্যথা না কমার জন‍্য কলেজে যেতে পারল না। সুপ্তার সাথে সেই লবিতে দেখার পরে আর দেখা হয় নি।
স্নেহা, রুমেলী এমনকি শ্রাবণীদি পর্যন্ত সুপ্তাকে বলছে ক‍্যান্টিনে যেতে। কিন্তু সুপ্তা গেল না। এখন শ্রাবণীদি সুপ্তাকে প্রায়ই খাওয়ায় কেনকি সে ওর ঘোড়ীর কাজ করছে। সেজন‍্য বিমলের সাথে যে কারণে সে মিশত তার অনেকটা পুষিয়ে যাচ্ছে। এদিকে বিমল বুঝতে পারছে না, সুপ্তা কি সত‍্যিই ব‍্যস্ত, না তার সাথে সম্পর্ক রাখতে চাইছে না। যদি ওদের আর্কিটেকচারে পড়ার চাপই থাকে তাহলে রাজকুমারের সাথে স্নেহা কী করে রোজ ঘুরছে? রুমেলী, ইঁদুররাও রোজ সন্ধ‍্যেবেলায় ঘুরছে, ক‍্যান্টিনে আড্ডা মারছে, সিনেমা দেখতে মেট্রো, গ্লোবে যাচ্ছে, চাইনিজ খেতে পিপিং এ যাচ্ছে, এমনকি সেদিন রাজুতো স্নেহাকে নিয়ে ‘ট্রিঙ্কাস’ এ ঘুরে এল, তাহলে সুপ্তার কী হলো?
ক‍্যান্টিন থেকে সবাই ফিরে দেখছে সুপ্তা ড্রইং করছে।
দোয়েল বলল, সুপ্তা জানিস, চিত্ত কলেজে আসতে পারে নি?
– কেন?
– কালকে যোগব‍্যয়াম করার সময় ওর পায়ে লেগে যাবার পর থেকেই পা ফুলতে শুরু করেছে। সারারাত চূণ হলুদ লাগিয়েছে, পেন কিলার খেয়েছে, ক্রেপ ব‍্যান্ডেজ রেখেও ব‍্যথা কমে নি। পা ফুলে ঢোল হয়ে গেছে,
– তোকে কে বলল?
– ক‍্যান্টিনে সবাই আলোচনা করছিল,
– রাজু আর সুবীর ওর জন‍্য ওষুধপত্র এনে দিয়েছে,
– এখন কোথায় আছে?
– হোস্টেলে।
সুপ্তা এমনিতেই মন খারাপ করে থাকে, এখন আরও বেশী আনমনা হয়ে গেল। সে কী করে চিত্তর হোস্টেলে যাবে? কাকে নিয়ে যাবে?কী করে ওর খবর নেবে?
বিকেলবেলায় যথারীতি বিমল এসেছে। আজকেও সুপ্তা যাবে না বলতেই বিমলের রাগ হয়ে গেল। সে বলছে, তুই কেন বেরোতে চাইছিস না, বল তো?
– দ‍্যাখ, আমাদের sessional এর বড্ড চাপ,
– শুধু তোরই চাপ? স্নেহা, রুমেলীর চাপ নেই?
– ওরা রাত জেগে করতে পারে। আমি রাত জাগতে পারি না।
বিমল কিছু না বলে ফিরে যেতেই সুপ্তা ঘরে এসে নিজের কাজ করছে। স্নেহা ফিরে আসার পরে জানতে পারল যে কালকে চিত্ত সকালের ক্লাসে আসতে পারে।
কলেজের ক্লাস শুরু হয় সকাল সাতটায়। আজকে সাড়ে ছটার সময় সুপ্তা বেরিয়ে গিয়ে ফার্সট লবির সামনে দাঁড়িয়ে চিত্তর আসার দিকে নজর রেখেছে। চিত্তকে পা টেনে টেনে কলেজের দিকে আসতে দেখেই তাড়াতাড়ি হেঁটে ওকে ধরে ধরে সেকেন্ড লবিতে আনল। এরপরে রাস্তা থেকে লবির বারান্দায় উঠতে পারছে না দেখে সুপ্তা চিত্তর বাঁহাতটা নিজের কাঁধের উপর রেখে চিত্তকে বলল উঠতে। সুপ্তার কাঁধে ভর করে লবিতে উঠে এখন যাচ্ছে সিঁড়ির দিকে। একতলা থেকে দোতলায় উঠতে চিত্তর কষ্টের থেকে আনন্দই হচ্ছে বেশী। এবার তিনতলায় যেতে হবে। চিত্ত তাকিয়ে আছে সুপ্তার দিকে। সুপ্তার তাকানোর মধ‍্যে চিত্ত খুঁজে পেল এক নির্বাক আহ্বান। এবার যাবে তিনতলায়। চিত্ত নিজেই স্বচ্ছন্দে কাঁধে হাত দেওয়ার পরে সুপ্তা চিত্তর কোমরে হাত দিল। দুজনে পৌঁছে গেল তিনতলায় চিত্তর ক্লাসে। ঘটনাটা অনেকের নজরে এলো। আর্কির মেয়েরাও এই সিঁড়ি দিয়ে ওঠার মধ‍্যে রহস‍্য খুঁজতে শুরু করে দিল।
আজকে খুব চটপট করে সুপ্তা ক্লাসের কাজ করে এগারোটা বাজার সাথে সাথেই সিভিলের ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সে সবার সাথে কথা বলে, মজা করে বলে কলেজের সব ক্লাসের ছেলেমেয়েরাই ওর সাথে গল্প করে। এখানেও সিভিলের ছেলেদের সাথে ওর কথা হলেও সে খেয়াল রাখছে চিত্তর দিকে। চিত্ত আস্তে আস্তে সিঁড়ির কাছে আসতেই সুপ্তা বলল, সাবধানে ধরে নাম। সুপ্তার ইচ্ছে করছে ওকে ধরে নামিয়ে দিতে, কিন্তু এতগুলো ছেলের মাঝে বলতেও পারছে না, চল্ নামিয়ে দিই।
যেহেতু সবাই ওকে কটকটি বলে, সেজন‍্য ওর কথা বলতে কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু চিত্ত মেয়েদের সাথে কথা বলে না বলে, সেজন‍্য ওর সাথে কথা বলার আগে চারদিকটা দেখে নিতে হবে। এটা চিত্তর জন‍্যই করতে হবে। আবার নিজের জন‍্যও। যদি কোনোরকম ব‍্যবহারে চিত্ত অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে এই সকাল পর্যন্ত যতটুকু সে এগোতে পেরেছে সেটা হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে। অনেক ভেবেচিন্তে সে চিত্তর পেছন পেছন নামছে।
– চিত্ত, নামতে অসুবিধা হচ্ছে? নে, হাত ধর্।
চিত্ত এই ডাকটাই শুনতে চাইছিল। কালবিলম্ব না করে হাতটা ধরল। শক্ত করে ধরল। ছেলেদের হাত যে এত শক্ত হয়, সুপ্তা জানত না। বিমলকে কোনোদিন ও ছুঁয়ে দেখে নি। সুপ্তার ভাল লাগছে। সুপুরুষ চিত্ত!
ছেলেদের হোস্টেলে আজ চিত্তকে নিয়ে হৈ হৈ পড়ে গেছে। যে ছেলে মেয়েদের সাথে কথা বলে না, মেয়েদের থেকে শত যোজন দূরে থাকে, সে কিনা কলেজের সব থেকে সুন্দরী, চোখমুখ খাসা, নিঁখুত শারীরিক গঠন তার কাঁধে হাত দিয়ে সিঁড়ি চড়েছে আবার সবার সামনে সেই বহরমপুরের বাদশাহী শাহজাদির হাত ধরে নেমেছে। সবাই আজকে ডাইনিং হলে চিত্তকে ঘিরে হুল্লোড় করছে। এই খবরটা শুধু চিত্তর হোস্টেলেই নয়, কলেজের সব হোস্টেলেই আলোচনা হচ্ছে, এমনকি মেয়েরাও সুপ্তাকে নিয়ে তাদের হোস্টেলে মেতে উঠেছে। তৃপ্তি নামে একটা জুনিয়ার মেয়ে বলছে, সুপ্তাদি, তুমি কী করে এই অসম্ভব কাজটা করলে? বলো না? একটু টিপস্ দাও না?
– তোরা বড্ড ফাজিল ! দিদির সাথেও ফাজলামো করছিস?
– দিদি বলেই তো শিখতে চাইছি। ছোটরা তো বড়দের কাছ থেকেই শেখে। বলো না? কি করে তুমি হিমালয়ের বরফ গলালে?
বিমল রাগে ফুঁসছে। ওদের হোস্টেলেও আজকে চিত্ত সুপ্তাকে নিয়ে খুব আলোচনা হয়েছে।
বিকেলবেলায় বিমল লেডিস হোস্টেলে গিয়ে দেখে সাদা শালোয়ারের সাথে একটা অত‍্যন্ত সুন্দর সুতোর কাজের সাথে জরি মেশানো কমলা রঙের কামিজে সুপ্তাকে স্বর্গের পরীর মতো লাগছে। বিমল মুগ্ধ হয়ে গেল। মাথাভর্তি রাগ নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সুপ্তা আর দোয়েল বের হচ্ছে। বিমল বলল, তোরা কোথাও যাচ্ছিস?
দোয়েল বলল, সাহেব পাড়ায়,
– কেন?
দোয়েল বললো, চিত্তকে দেখতে,
– চিত্তকে এত দেখার কি আছে?
– তুই জানিস না, চিত্তর পায়ে লেগেছে,
– জানি তো!
– সেইজন‍্যই তো যাচ্ছি। আমাদের ব‍্যাচের একটা ছেলে, হাঁটতে পারছে না, তবু দেখলাম না কোনো ছেলে ওকে কলেজে নিয়ে আসছে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠা বা নামার সময়ও তোদের কাউকে দেখি নি একটু গিয়ে ওকে ধরতে,
– আমি কি ওর হোস্টেলে থাকি, না কি সিভিল নিয়ে পড়ি?
দোয়েল এবার বলল, সাহায্য করতে গেলে কি ওর হোস্টেলেই থাকতে হবে? সুপ্তা কি চিত্তর হোস্টেলে থাকে, না চিত্তর ডিপার্টমেন্টে পড়ে? তাহলে ও কি করে চিত্তকে সাহায্য করল? সিভিলের ছেলেদের তো দেখলাম, কেউ চিত্তকে নামতে হাত বাড়িয়ে পর্যন্ত দিল না। সবাই দৌড়ে দৌড়ে নেমে যাচ্ছে। তোদের কথা আর বলিস না।
হস্টেলে চিত্ত খালি গায়ে, পায়জামাটা হাঁটুর উপরে গুটিয়ে সার্ভের বইটা পড়ছে। বিকেলবেলায় হোস্টেলের সব ছেলেরাই বাইরে থাকে। চিত্তর মতো কয়েকজন বেরোয় না। এখন চিত্তর দোতলাতে কেউ নেই। দোয়েল বলল, কী করছিস?
চিত্ত হকচকিয়ে উঠে জামাটা নিতে গিয়ে পায়ে ব‍্যথার জন‍্য পড়ে যাওয়ার মুখে সুপ্তা ধরে ফেলল, দড়ির উপর থেকে দোয়েলই জামাটা দিল।
– বাঃ, ঘরটা তো বেশ পরিষ্কার রেখেছিস! শুনেছি ছেলেদের ঘরে চারদিকে সিগারেটের ছাই আর বোতলের ছড়াছড়ি থাকে, তোর ঘরে তো কিছুই দেখছি না।
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে দোয়েল চুপ করল। অন‍্যদিকে ‘কটকটি সুপ্তা’ মাথা নীঁচু করে চিত্তর পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “পা টা তো এখনও ফুলে আছে। ওষুধ খেয়েছিস?”
– চা টা লাগবে? শঙ্করদা, তুমি এখনো আছো? ওদের চা দাও। আর কি আছে?
– তুমি যাও তো শঙ্করদা। চায়ের সাথে কেক ও বাসনা বিস্কুট দাও। আর এই জলের বোতলটা ভরে দিও।
শঙ্করদা চা, বিস্কুট,কেক দিয়ে গেল। ওরা ফার্স্ট গেট থেকে সিঙারা মিষ্টি এনেছে। তিনজনে মিলে খেতে খেতে গল্প করছে। আজকে দোয়েল আর চিত্তই কথা বলছে, সুপ্তা শুনছে।
আস্তে আস্তে ছেলেরা হোস্টেলে ফিরে চিত্তর ঘরে ওদের দেখে দলবেঁধে এসে গল্প করছে। ওরা সবাই সবাইকে চেনে বলে কোনো অসুবিধাই হলো না। রাত সাড়ে নটার সময় সুপ্তারা ফিরে গেল।
পরের দিনও সুপ্তা আগেই এসে গেছে। আজকে আর দূরে ফার্স্ট লবিতে দাঁড়ায় নি। সেকেন্ড লবিতেই আছে। চিত্তকে আস্তে আস্তে এগোতে দেখে সুপ্তা প্রায় চোদ্দ নম্বর হোস্টেলের কাছে গিয়ে ওর হাত ধরে নিয়ে এসে একেবারে ক্লাসে পৌঁছে দিল এবং বলে দিল, চিত্ত যেন একা একা স়িঁড়ি দিয়ে না নামে। সে এসে
নামিয়ে দেবে।
বিমল এখন বুঝতে পারছে যে সুপ্তা বিমলকে অবহেলা করছে। আজ সে ক্লাসে না গিয়ে ক‍্যান্টিনে বসে আছে। সুপ্তার কাছে জানতে চাইবে সে কেন ওকে এড়িয়ে যাচ্ছে। কেন সুপ্তা চিত্তর হোস্টেলে গিয়েছিল? কেন ওকে হাত ধরে ক্লাসে নিয়ে যাচ্ছে?
বিকেলবেলায় বিমলের সাথে একপ্রস্থ কথা কাটাকাটি হয়ে গেলো বিমল আজকে জোর করছে ওর সাথে বেরোবার জন‍্য। সুপ্তা শ্রাবণীদির ড্রইং করার কথা বলে হোস্টেলে ঢুকে গেল।
এবার রাত্রি এগারোটায় বিমল সাথে আরো তিনজন ছেলে চিত্তর হোস্টেলে এসে চিত্তকে ধমকাচ্ছে। বিমল চিত্তকে বলল, তোর সাথে সুপ্তার কী সম্পর্ক?
চিত্ত বলল, সুপ্তা আমার একজন বন্ধু!
এতদিন তো তোকে দেখি নি ওর সাথে কথা বলতে,
হ‍্যাঁ, এই কয়েকদিন হলো ওর সাথে কথাবার্তা হয়,
এমনই কথাবার্তা হয় যে সে একদম তোর হোস্টেলে চলে এসেছে?
আমার পায়ে লেগেছে বলে আমাকে দেখতে এসেছে।
পাশ থেকে অতীন বলল, তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করে ফেলছিস,
চিত্তর রাগ হয়ে গেল। সে অতীনকে বলছে, কী বাড়াবাড়ি হয়েছে?
এই যে ওরা হোস্টেলে এসেছে আর তুই ওদের সাথে গল্প করলি?
কেন, গল্প করলে কী হয়েছে?
মেয়েরা কেন তোর ঘরে এসেছে?
অনেকে মেয়েই তো ছেলেদের ঘরে আসে,
অতীন এবার শাসানির সুরে বলল,অনেকের সাথে সুপ্তার ব‍্যাপার আলাদা।
চীৎকারের আওয়াজ শুনে গৌতম, সুবীররা এসে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে?
বিমল বলছে, সুপ্তা কেন ওর ঘরে এসেছে?
সুবীর বলল, চিত্তকে দেখতে এসেছে,
ওকে তো কলেজেই দেখেছে, তাও কেন এখানে এসেছে?
সেটা চিত্ত কি করে বলবে?
কেন বলবে না? ছেলেদের হোস্টেলে মেয়েরা আসলে বলবে না?
কী বলছিস তুই? আমাদের হোস্টেল মেয়েরা আসে না?
যে আসে আসুক! সুপ্তা আসবে না,
সেটা তুই সুপ্তাকে বল, চিত্তকে ধমকাচ্ছিস কেন?
আমি তো ওকেও বলবই! কিন্তু চিত্তও যেন সুপ্তাকে বলে ওর ঘরে না আসতে।
এখন চিত্ত বলল, তোর কথামতো আমাকে চলতে হবে নাকি?
অতীন বলছে, তোকে বিমল যা বলল, তাই করবি। চিত্ত বলল,আমার কাছে বহু ছেলে আসে অঙ্ক করতে, কিছু বুঝতে, আমি কাউকেও না করি না,
এবার বিমল হাত পা ছু়ড়ে চিত্তকে বলছে, যদি তোকে আর কোনোদিন ওর সাথে কথা বলতে দেখি তাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।
গৌতম বলছে, চিত্ত কার সাথে কথা বলবে, কে ওর ঘরে আসবে, এসব কি তুই ঠিক করে দিবি?
বিমল বলল, দরকার পড়লে তাই করতে হবে।
চিত্তর ঘরে এখন অনেক ছেলে এসে গেছে। ওরা সবাই বলল, যদি চিত্তর কোনো ক্ষতি করিস তাহলে আমরাও তোকে ছেড়ে দেব না। আর একটা কথা শোন্, সুপ্তাও আমাদের বন্ধু, ওরও কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করিস না, ফল ভালো হবে না।
সুবীর, গৌতম চিত্তকে বলল, একদম ঘাবড়াবি না। তোর যেমনভাবে ইচ্ছে সেইভাবেই সুপ্তার সাথে মিশবি। আমরা আছি তোদের সাথে।
পরের দিন যখন সুপ্তা চোদ্দ নম্বর হোস্টেলের কাছে এসে চিত্তর হাত ধরল, তখন চিত্ত তাকে সব কথা বলল। এই কথাগুলো শুনে সুপ্তা জিজ্ঞেস করল, তুই কি আমার সাথে থাকবি, না ভয় পেয়ে বন্ধুত্ব নষ্ট করবি?
চিত্তর কাছ থেকে সদুত্তর পেয়ে বলল, আজ থেকে রোজ তোর ঘরে আসব এবং একা একা আসব। তোর কোনো আপত্তি নেই তো?
চিত্ত বুঝে উঠতে পারছে না যে কি বলবে।
চিত্তকে চুপ থাকতে দেখে বলল, জানিস, বেন্ডিং মোমেন্টের অঙ্কগুলো করতেই পারি না। শুনেছি, তুই ঐসব অঙ্কগুলো অনায়াসে করতে পারিস এবং ইয়ারের অনেক ছেলেই তোর কাছে এসে স্ট্রেনথ অফ মেটেরিয়াল ও এ্যাপ্লায়েড মেকানিক্সের অঙ্কগুলো বুঝে যায়, আমরা মেয়েরাও অনেকদিন ভেবেছি তোর কাছে যাই, কিন্তু তোর গম্ভীর ভাবের জন‍্য পারি নি। এখন যখন তুই আমার সাথে খোলামেলা কথা বলছিস, তখন তোর কাছে যেতে নিশ্চয়ই আপত্তি নেই?
সবসময় আসবি। তবে বিমলের থেকে সাবধানে থাকিস,
ওসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই কি ভাবছিস, আমি বিমলকে ভালবাসি? ঐরকম একটা ছেলেকে ভালবাসা যায়?
এখন চিত্তর সাথে সুপ্তার সম্পর্কটা সবাই জেনে গেছে। বিমল আর লেডিস হোস্টেলে যায় না। সুপ্তা চিত্ত রোজ না ঘুরলেও প্রায় বিকেলে একসাথে ঘোরে। চিত্ত আর্কি ডিপার্টমেন্টে যায়, এখানেই সুপ্তার সাথে অন‍্য মেয়েদের পড়ায়। আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টে চারটের পরেও ছেলে মেয়েরা তাদের প্রজেক্টের কাজ, সেশনালের কাজ করে, সেজন‍্য অনেকেই সেখানে থাকে। চিত্তকেও বিকেলে হোস্টেলে পাওয়া না গেলেই, আর্কি ডিপার্টমেন্টে পাওয়া যায়।
অনেকদিন হয়ে গেল, দুজনে ঘনিষ্ঠও হয়েছে, কিন্তু এখনও কেউ মুখফুটে কিছু বলে নি। সুপ্তা ভাবল, চিত্তর কলেজ থেকে বের হতে একবছর বাকি। চিত্তর ছ’মাস পরে সুপ্তা পাশ করবে, কারণ সিভিলের ডিগ্রী পাঁচ বছরে পাওয়া যায়, কিন্তু আর্কিতে সাড়ে পাঁচ বছর লাগে। চিত্তর সাথে মিশে সে যা বুঝেছে যে ও তাকে ভালবাসে কিন্তু মুখচোরা স্বভাবের জন‍্য হয়তো কোনোদিনই বলতে পারবে না সেজন‍্য সুপ্তাকেই উদ‍্যোগ নিতে হবে।
রাতে সুপ্তাকে ডিপারটমেন্টে অঙ্ক বোঝাচ্ছে। আজকে সুপ্তা কিছুতেই বুঝতে পারছে না। শেষে সুপ্তাই বলল, এখন আর হবে না। তুই আমার এই খাতাটা নিয়ে যা আর অঙ্কগুলো ক‍রে কাল সকালে দিয়ে দিস।
সুপ্তাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে নিজের ঘরে গেল। এবার সুপ্তার অঙ্ক করার জন‍্য খাতাটা খুলেই একটা ছোট অথচ সুন্দর চিঠি পেয়ে আর কিছু করতে পারল না।
সকালবেলায় সুপ্তা ভয়ে ভয়ে সেকেন্ড লবিতে দাঁড়িয়ে আছে। চিত্ত ওর হাতে খাতা দিয়ে ওপরে উঠে গেল। সুপ্তা চিত্তর দিকে তাকিয়ে থেকে হতাশ হয়ে ডিপার্টমেন্টে গিয়ে আলতো করে খাতা খুলতেই চমকে গেল। অঙ্ক খাতাতেই লেখা, ‘রাজি’, সন্ধ‍্যেবেলায় তৈরী থাকিস’।

Sahityika Admin

Add comment